ঢাকার তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন ২৮ বছর বয়সী কামরুন নেছা (ছদ্মনাম)। প্রায় সাত বছরের সংসারজীবন তার। দুই সন্তানের মা তিনি। সংসারের ব্যয় এবং সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালাতে বাধ্য হয়েই তাকে পোশাক কারখানায় কাজ নিতে হয়েছে।
কামরুন নেছার কাজের দিন প্রায়ই দশ ঘণ্টারও বেশি দীর্ঘ হয়। ভোরে বাসা থেকে বের হয়ে অনেক সময় গভীর রাতে ফিরতে হয় তাকে। নির্ধারিত সময়ের পরও একাধিক দিন অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হয়। দীর্ঘ সময় কাজ শেষে ক্লান্ত শরীরে বাসায় ফিরলেও সেখানে অপেক্ষা করে ভিন্ন এক বাস্তবতা।
তিনি জানান, বিয়ের শুরুতে সংসার মোটামুটি ভালোই চলছিল কিন্তু স্বামীর সীমিত আয়ে সংসারের চাপ বাড়তে থাকে। তখন তিনি কাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। শুরুতে স্বামী এতে রাজি ছিলেন না, পরে পরিস্থিতির কারণে সম্মতি দেন। প্রথম সন্তানের পর খরচ বাড়ে এবং দুই বছর পর দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের পর সেই চাপ আরও বেড়ে যায়।
কারখানায় কাজ শুরু করার পর থেকেই স্বামীর আচরণে পরিবর্তন আসতে থাকে বলে অভিযোগ করেন কামরুন নেছা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে কথাকাটাকাটি, এরপর মানসিক নির্যাতন এবং ধীরে ধীরে শারীরিক সহিংসতা শুরু হয়। তিনি আরও জানান, স্বামী প্রায়ই নেশাগ্রস্ত অবস্থায় বাসায় ফেরেন এবং তার কাছ থেকে টাকা নেন।
আইনি সহায়তা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, কখনো থানায় যাওয়া হয়নি, আদালতের শরণাপন্নও হননি। এমনকি পুরো বিষয়টি পরিবারের কাছেও খোলামেলা বলতে পারেননি। তার ভয়, সংসার ভেঙে গেলে সন্তানদের ভবিষ্যৎ কী হবে, আর চাকরি হারালে কোথায় যাবেন।
তিনি বলেন, “প্রায় প্রতিদিনই আমাকে মারধর করে। আমার বাচ্চারা দেখে কাঁদে কিন্তু আমি কোথায় যাব? ডিভোর্স দিলে আমার সন্তানদের কী হবে?” একবার বিষয়টি পরিবারকে জানালেও তাকে ধৈর্য ধরার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, “সব মেয়ের জীবনেই কষ্ট থাকে, সহ্য করলে ঠিক হয়ে যাবে।” কামরুন নেছা বলেন, “এই চাকরি না থাকলে হয়তো সংসারই চালাতে পারতাম না কিন্তু চাকরি থাকলেও আমি স্বাধীন নই।”
অনেকবার পালিয়ে যাওয়ার কথাও ভেবেছেন তিনি। তবে সমাজের ভয়, সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং ‘মানুষ কী বলবে’—এই চিন্তাগুলো তাকে আটকে রেখেছে। শেষ পর্যন্ত তিনি একই ছাদের নিচে, একই ধরনের সহিংসতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
কামরুন নেছার এই জীবনগল্প বাংলাদেশের বৃহত্তর বাস্তবতারই একটি প্রতিচ্ছবি। যেখানে পারিবারিক সহিংসতা শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, বরং অর্থনৈতিক নির্ভরতা, সামাজিক কাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি কাঠামোগত সংকট।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, অন্তরঙ্গ সঙ্গীর সহিংসতার ঝুঁকির দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় আফগানিস্তানের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি দুই নারীর একজন জীবনের কোনো না কোনো সময়ে শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের ‘নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ’ও একই ধরনের উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। এতে বলা হয়, ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রায় ৭০ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছেন। এর মধ্যে ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ শারীরিক, ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ যৌন, ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ মানসিক নির্যাতন এবং ৫০ দশমিক ১ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন। তবে এসব ঘটনার বড় একটি অংশ কখনো প্রকাশ পায় না। জরিপ অনুযায়ী, ৬৪ শতাংশ নারী তাদের অভিজ্ঞতার কথা কাউকে জানান না। আর মাত্র ৭ দশমিক ৪ শতাংশ নারী আইনি পদক্ষেপ নেন।
এই নীরবতার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। অর্থনৈতিক নির্ভরতা, সামাজিক লজ্জা এবং পরিবার ভেঙে যাওয়ার ভয়—সব মিলিয়ে নারীরা অনেক সময় নির্যাতনের সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন না। আর্থিকভাবে স্বাধীন না হওয়া এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মাহমুদা খাতুন বলেন, “যখন পরিবারের ভেতরে বৈষম্য স্বাভাবিক হয়ে যায়, তখন সহিংসতাও আর ব্যতিক্রম থাকে না। এটি দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়ায়।”
বাংলাদেশে বিয়ে, তালাক, ভরণপোষণ ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিষয়গুলো একক কোনো দেওয়ানি আইনে পরিচালিত হয় না। বরং ধর্মভিত্তিক ব্যক্তিগত আইন এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণ করে, যা অনেক ক্ষেত্রে নারীর অধিকারকে সীমিত করে দেয়। মুসলিম পারিবারিক আইনে বিয়ে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক এবং দেনমোহর স্ত্রীর আইনগত অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। তবে বাস্তবে অনেক নারীই সেই অধিকার পুরোপুরি পান না বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে মুসলিম নারীরা ‘খুলা’ চাইতে পারেন বা আদালতের মাধ্যমে তালাকের আবেদন করতে পারেন। কিন্তু এই প্রক্রিয়া দীর্ঘ, জটিল এবং সামাজিকভাবে নিরুৎসাহিত। ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ অনুযায়ী তালাকের ক্ষেত্রে নোটিশ, সালিশ এবং নির্ধারিত অপেক্ষার সময় অনুসরণ বাধ্যতামূলক। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব প্রক্রিয়া অনেক সময় নির্যাতিত নারীর জন্য অতিরিক্ত মানসিক ও সামাজিক চাপ তৈরি করে।
১৯৮৫ সালের পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ অনুযায়ী নারীরা ভরণপোষণ, সন্তানের অভিভাবকত্ব এবং পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ পেলেও বাস্তবে আর্থিক, সামাজিক এবং প্রক্রিয়াগত বাধার কারণে খুব কম নারীই আদালতের শরণাপন্ন হন। উত্তরাধিকার আইনেও বৈষম্যের চিত্র স্পষ্ট। মুসলিম নারীরা সম্পত্তির অংশ পেলেও তা পুরুষদের তুলনায় কম। সামাজিক চাপের কারণে অনেক নারী সেই সীমিত অধিকারও ভোগ করতে পারেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতার নিশ্চয়তা থাকলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যক্তিগত আইন বাস্তবে সেই সমতার পরিসর সীমিত করে দেয়।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও লিঙ্গ বৈষম্য সূচকে (এসআইজিআই) পরিবারভিত্তিক বৈষম্যের সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ৮১ দশমিক ৯। যদিও এই সূচক সরাসরি সহিংসতা পরিমাপ করে না, তবে এটি উত্তরাধিকার বৈষম্য, তালাকের সীমাবদ্ধতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর সীমিত ক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক নির্ভরতার বাস্তবতাকে তুলে ধরে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কাঠামোগত বৈষম্যই সহিংসতার ভিত্তি তৈরি করে।
পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এবং পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ১৯৮৫ থাকলেও বাস্তবে এসব আইনের প্রয়োগ সীমিত। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, বৈষম্যমূলক পারিবারিক ও সম্পত্তি আইন অনেক নারীকে নির্যাতনের সম্পর্কেই আটকে রাখে। কারণ সম্পর্ক ছাড়লে তারা চরম অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, “পারিবারিক সহিংসতাকে এখনও অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখা হয়, আইনি অপরাধ হিসেবে নয়। ফলে অধিকাংশ ঘটনা আদালত পর্যন্ত পৌঁছায় না। অনেক সময় পুলিশি সমঝোতা নারীদের আবার একই সহিংস পরিবেশে ফিরিয়ে দেয়।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, “আইনি সুরক্ষা থাকলেও সামাজিক চাপ ও আর্থিক অনিশ্চয়তার কারণে অধিকাংশ নারী আদালতে যেতে চান না।” তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশে তালাক এখনও শুধু আইনি বিষয় নয়, সামাজিক কলঙ্ক হিসেবেও দেখা হয়। ফলে গুরুতর নির্যাতনের মধ্যেও অনেক নারী আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।” ইসলামী আইন নারীর উত্তরাধিকার, ভরণপোষণ ও মর্যাদার অধিকার স্বীকার করে এবং পারিবারিক সহিংসতাকে সমর্থন করে না। তবে ধর্মীয় নীতি ও সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়ে গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মাহমুদা খাতুন বলেন, “সমস্যা ধর্মে নয়, বরং সমাজে ধর্মের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগে। সামাজিক রীতিনীতিই অনেক সময় নারীর অধিকারকে দুর্বল করে দেয়।”
ঢাকার মালিবাগের সালমা আক্তারের (ছদ্মনাম) জীবনের গল্পও একই বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। বিয়ের পর তিনি পড়াশোনা ছেড়ে সংসারে মন দেন। এখন তিনি এক কন্যাসন্তানের মা। স্বামীর ব্যবসায় লোকসানের পর সংসারে অশান্তি বাড়তে থাকে।
তিনি বলেন, “প্রথমে গালাগালি, পরে বাইরে যাওয়া বন্ধ করা, ফোন চেক করা, বাবার বাড়ি যেতে না দেওয়া—এরপর শুরু হয় মারধর।” গুরুতর আহত হলেও তিনি কখনো থানায় অভিযোগ করেননি। তার ভাষায়, “মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে চুপ থেকেছি। ভাবতাম, ডিভোর্স হলে ওর জীবন নষ্ট হবে। এখন বুঝি, এই পরিবেশেই ও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।” বিশেষজ্ঞদের মতে, পারিবারিক সহিংসতার সবচেয়ে গভীর প্রভাব পড়ে শিশুদের ওপর।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট আনিকা চৌধুরী বলেন, সহিংস পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুরা দীর্ঘমেয়াদে ভয়, উদ্বেগ, আক্রমণাত্মক আচরণ এবং মানসিক বিচ্ছিন্নতায় ভোগে। তিনি বলেন, “অনেক শিশু সহিংসতাকে সম্পর্কের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে ভাবতে শুরু করে, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই চক্রকে অব্যাহত রাখে।” বাংলাদেশে পারিবারিক সহিংসতা টিকে আছে মূলত তিনটি কারণে—অর্থনৈতিক নির্ভরতা, সামাজিক কলঙ্ক এবং দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োগ।
অর্থনৈতিক নির্ভরতা নারীদের নির্যাতনের সম্পর্ক ছাড়তে বাধা দেয়, সামাজিক কাঠামো অভিযোগ বা বিচ্ছেদকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখে, আর আইন থাকলেও বিচারপ্রক্রিয়া ধীর ও জটিল।
অধ্যাপক মাহমুদা খাতুন বলেন, “পরিবারের ক্ষমতার কাঠামো এখনও মূলত পুরুষকেন্দ্রিক। সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক স্বীকৃতিতে নারীর ভূমিকা সীমিত।” তিনি যোগ করেন, “নারীদের এখনও এমনভাবে বড় করা হয় যেন যেকোনো মূল্যে সংসার টিকিয়ে রাখাই তাদের দায়িত্ব—এমনকি সেই সংসারে সহিংসতা থাকলেও।”

