দেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবার মান যাচাইয়ে কেনা অত্যাধুনিক পরিমাপ ব্যবস্থা চার বছরেও কার্যকর কোনো চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে পারেনি। কল ড্রপ, ভয়েস কোয়ালিটি, ইন্টারনেট গতি ও নেটওয়ার্ক কভারেজ মূল্যায়নের জন্য জার্মান প্রযুক্তির এই সিস্টেমে প্রায় ২১ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এর ভিত্তিতে অপারেটরদের সেবার মান নিয়ে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।
২০২২ সালের নভেম্বরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এই পরিমাপ ব্যবস্থা উদ্বোধন করা হয়। তখন নিয়ন্ত্রক সংস্থা আশা করেছিল, এটি দেশের মোবাইল সেবার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে মানোন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে। তবে বাস্তবতায় মাঠপর্যায়ে একাধিক পরীক্ষা হলেও ফলাফল বিশ্লেষণ ও চূড়ান্তকরণে বড় ধরনের জটিলতা দেখা দেয়।
বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত ড্রাইভ টেস্টে ঢাকা ও আশপাশের এলাকা ছাড়াও একাধিক জেলায় নেটওয়ার্কের মান যাচাই করা হয়। পরীক্ষায় কল সেটআপ, কল ড্রপ, ভয়েস মান, ডেটা গতি ও কভারেজসহ অন্তত ৪০টি সূচক বিশ্লেষণ করা হয়। তবে এসব পরীক্ষার ফলাফল ও মোবাইল অপারেটরদের নিজস্ব তথ্যের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য পাওয়া যায়, যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মতবিরোধ চলছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের বৃহৎ মোবাইল অপারেটরগুলোর মধ্যে কেউ কেউ কয়েকটি সূচকে মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে ইন্টারনেট সেবা ও নেটওয়ার্ক কভারেজের ক্ষেত্রে একাধিক অপারেটরের দুর্বলতা ধরা পড়ে। একই সময়ে কিছু এলাকায় কল ড্রপ এবং সংযোগ স্থাপনে বিলম্বও লক্ষ্য করা হয়। তবে অপারেটররা এসব ফলাফলকে প্রশ্নবিদ্ধ করে নিজেদের পরীক্ষার সঙ্গে অমিলের কথা জানায়।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সঠিক ও গ্রহণযোগ্য ফলাফলের জন্য একটি সমন্বিত মানদণ্ড তৈরির কাজ চলছে। অপারেটরদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি অভিন্ন পদ্ধতি নির্ধারণের চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো বিভ্রান্তি না থাকে।
দেশজুড়ে বিভিন্ন পরীক্ষায় দেখা যায়, শহর ও গ্রামীণ উভয় এলাকায় নেটওয়ার্ক মানে তারতম্য রয়েছে। কোথাও কোথাও দুর্বল সিগন্যাল, ঘন ঘন কল ড্রপ এবং ভেতরের অংশে নেটওয়ার্ক না পাওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। বিশেষ করে কিছু এলাকায় ফোর-জি সেবার মান প্রত্যাশার তুলনায় কম বলে পরীক্ষায় উঠে আসে।
সর্বশেষ পরীক্ষাগুলোর ফলাফলে দেখা যায়, কল ড্রপের হার নির্ধারিত মানের তুলনায় বেশি ছিল। একই সঙ্গে ভয়েস ও ডেটা সেবার মান নিয়েও অসামঞ্জস্য পাওয়া গেছে। তবে এই ফলাফলের ব্যাখ্যা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
অন্যদিকে ব্যবহারকারীরা দীর্ঘদিন ধরে মোবাইল সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছেন। ঘন ঘন কল বিচ্ছিন্ন হওয়া, দুর্বল সংযোগ এবং ধীরগতির ইন্টারনেটকে তারা দৈনন্দিন সমস্যার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বিশেষ করে নগর এলাকার ব্যবহারকারীরা ঘরের ভেতরে নেটওয়ার্ক না পাওয়ার অভিযোগ বেশি করছেন।
ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, বিপুল ব্যয়ে কেনা এই প্রযুক্তি দীর্ঘ সময়েও কার্যকর ফল না দিতে পারা প্রশাসনিক ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়। তাদের মতে, সেবার মান উন্নয়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়েছে, দ্রুতই ড্রাইভ টেস্টের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং ওয়েবসাইটে তা উন্মুক্ত করা হতে পারে। তবে এর আগে সব পক্ষের সঙ্গে সমন্বিত পদ্ধতি চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।

