দেশের উচ্চশিক্ষার মান, গবেষণার সক্ষমতা এবং জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়নের চিত্র স্পষ্ট হয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক অবস্থানের মাধ্যমে। বর্তমান বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয় র্যাঙ্কিং এখন শুধু মর্যাদার বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, প্রযুক্তি, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বৈশ্বিক বিশ্ববিদ্যালয় র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় এখনো কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি।
কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিং ২০২৬ অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৫৮৪তম। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ৭৬১ থেকে ৭৭০-এর মধ্যে। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় অবস্থান করছে ৯৫১ থেকে ১০০০-এর মধ্যে। দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় এরও নিচের স্তরে, অর্থাৎ ১২০০ বা তার পরের অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে শীর্ষ দশ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠানগুলো আধিপত্য ধরে রেখেছে। ভারতের আইআইটি ও আইআইএসসির মতো প্রতিষ্ঠানও বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় শক্ত অবস্থান তৈরি করছে।
র্যাঙ্কিং নির্ধারণে গবেষণার মান, গবেষণা উদ্ধৃতি, একাডেমিক সুনাম, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, আন্তর্জাতিকীকরণ, কর্মসংস্থান সক্ষমতা এবং উদ্ভাবনী কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব সূচকের প্রায় সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পিছিয়ে রয়েছে।
এর প্রধান কারণ হিসেবে গবেষণার দুর্বলতা সবচেয়ে বেশি সামনে আসে। বিশ্ববিদ্যালয় মূলত জ্ঞান সৃষ্টির কেন্দ্র হলেও দেশে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে গবেষণা এখনো প্রান্তিক পর্যায়ে। পর্যাপ্ত বাজেটের অভাব, আধুনিক গবেষণাগারের সংকট, আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রবেশাধিকার সীমিত থাকা এবং গবেষণাবান্ধব পরিবেশের ঘাটতি বড় বাধা। পাশাপাশি শিক্ষকরা অতিরিক্ত ক্লাস, পরীক্ষা ও প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত থাকায় গবেষণার সময় কমে যাচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা, প্রকাশনা ও উদ্ভাবনের সংখ্যা সীমিত।
বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা ও উদ্ভাবনকে কেন্দ্র করে এগিয়েছে। হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড, এমআইটি এবং ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর কেবল পাঠদান নয়, গবেষণার মাধ্যমে বিশ্ব নেতৃত্ব দিচ্ছে। বিপরীতে দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো মুখস্থনির্ভর ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা বিদ্যমান। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃজনশীলতা ও সমালোচনামূলক চিন্তার চেয়ে সনদ অর্জনের প্রতিযোগিতা বেশি দেখা যায়।
দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও মানের ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি রয়েছে। বর্তমানে ৫৭টি সরকারি, ১১৬টি বেসরকারি এবং ২টি আন্তর্জাতিকসহ মোট ১৭৫টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। তবে এই বিস্তার মানসম্মত শিক্ষায় কাঙ্ক্ষিত উন্নতি আনতে পারেনি। অনেক প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক, গবেষণা সুবিধা এবং মৌলিক একাডেমিক পরিবেশের অভাব রয়েছে।
শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ একটি চ্যালেঞ্জ। উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগ হয় কঠোর প্রতিযোগিতা ও গবেষণাভিত্তিক মানদণ্ডে। আন্তর্জাতিক প্রকাশনা, গবেষণা দক্ষতা ও একাডেমিক অবদান সেখানে প্রধান বিবেচ্য। কিন্তু দেশে অনেক ক্ষেত্রে এই মানদণ্ড পুরোপুরি অনুসরণ করা হয় না। ফলে একাডেমিক উৎকর্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব ও অদক্ষতাও মানোন্নয়নের পথে বড় বাধা। দীর্ঘদিন ধরে সেশনজট, শিক্ষক রাজনীতি, প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব এবং দলীয় প্রভাব শিক্ষার পরিবেশকে দুর্বল করেছে। একাডেমিক স্বাধীনতা ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনের অভাবও স্পষ্ট।
আন্তর্জাতিকীকরণের ক্ষেত্রেও পিছিয়ে রয়েছে দেশ। বিদেশি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা খুবই কম। আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা, যৌথ প্রকল্প এবং বৈশ্বিক একাডেমিক নেটওয়ার্কে অংশগ্রহণ সীমিত। ফলে বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে শক্ত সংযোগ তৈরি হয়নি।
পাঠ্যক্রমও সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্য বিশ্লেষণ, রোবোটিক্স, সাইবার নিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তনভিত্তিক শিক্ষায়। কিন্তু দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম এখনো পুরোনো কাঠামোতে সীমাবদ্ধ। শিল্পখাতের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ না থাকায় শিক্ষার্থীদের বাস্তব দক্ষতা কমে যাচ্ছে এবং উচ্চশিক্ষিত বেকারত্ব বাড়ছে।
শিক্ষাখাতে বাজেটের সীমাবদ্ধতাও বড় সমস্যা। আন্তর্জাতিক সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী শিক্ষা খাতে বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন হলেও দেশে গবেষণা ও উচ্চশিক্ষায় বরাদ্দ তুলনামূলক কম। শুধু অবকাঠামো নয়, আধুনিক গবেষণাগার, ডিজিটাল লাইব্রেরি এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ জরুরি।
তবে আশার দিকও রয়েছে। কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে অগ্রগতি করছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাভিত্তিক সূচকেও কিছু প্রতিষ্ঠান ভালো অবস্থান তৈরি করেছে। এটি প্রমাণ করে পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে পরিবর্তন সম্ভব।
এখন প্রয়োজন বাস্তবমুখী সংস্কার। গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো, শিক্ষক নিয়োগে মেধা ও গবেষণাকে অগ্রাধিকার দেওয়া, প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং পাঠ্যক্রম আধুনিকীকরণ—এই পদক্ষেপগুলো জরুরি। বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় রাতারাতি তৈরি হয় না। চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ভারতের অভিজ্ঞতা বলছে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, গবেষণায় গুরুত্ব এবং শিক্ষাগত সংস্কারের মাধ্যমেই পরিবর্তন সম্ভব।
বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে যাওয়া শুধু মর্যাদার বিষয় নয়; এটি দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই এখনই সময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সনদনির্ভর কাঠামো থেকে জ্ঞান ও উদ্ভাবনের কেন্দ্রে রূপান্তর করার। অন্যথায় বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি আরও বাড়বে।
- ড. মো. আবু তালেব: অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

