একসময় প্রশাসনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত পদগুলোর একটি ছিল জনপ্রশাসন সচিবের আসন। ক্ষমতা, প্রতিপত্তি আর প্রভাবের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে এটি ছিল শীর্ষ কর্মকর্তাদের স্বপ্নের পদ। কিন্তু এখন সেই ‘হট সিট’ যেন পরিণত হয়েছে ‘কাঁটার সিংহাসনে’। প্রশাসনের তৃতীয় ক্ষমতাধর পদটি নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না অনেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
নগ্ন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, তদবিরের চাপ, বদলি-পদোন্নতি নিয়ে বাণিজ্যের অভিযোগ এবং ব্যক্তিগত ‘ইমেজ সংকট’—সব মিলিয়ে অন্তত সাতজন সচিব এই পদ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। অথচ এক সময় এই পদ পেতে চলত কোটি টাকার দৌড়ঝাঁপ আর অদৃশ্য তদবির।
কে হচ্ছেন পরবর্তী জনপ্রশাসন সচিব?
জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় এই প্রশ্ন এখন সচিবালয় ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। নির্বাচনী সময়ে মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক রদবদলে জনপ্রশাসন সচিবের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই রাজনৈতিক দলগুলোও নিজেদের ‘পছন্দের আমলাকে’ বসাতে পর্দার আড়ালে তদবির চালাচ্ছে। তিনটি বড় দল এখন এই পদে প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে নেমেছে।
গত ২১ সেপ্টেম্বর সরিয়ে দেওয়া হয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মো. মোখলেস উর রহমানকে। তাঁকে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ একটি দপ্তরে বদলি করা হলেও ১৫ দিন পেরিয়ে গেছে, এখনো নিয়োগ দেওয়া হয়নি নতুন সচিব।
সরকার সূত্র জানায়, বেশ কয়েকজন সিনিয়র সচিবকে প্রস্তাব দেওয়া হলেও তাঁরা রাজি হননি। মোখলেস উর রহমানের হঠাৎ বদলির পেছনের বিতর্ক এবং প্রশাসনে তৈরি ‘খারাপ নজির’ অনেককেই নিরুৎসাহিত করেছে।
এক এক করে সাত সচিবের অস্বীকৃতি
সরকার প্রথমে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদকে প্রস্তাব দেয়। কিন্তু তিনি জনপ্রশাসনের দায়িত্ব নিতে অপারগতা জানান। পরে সড়ক পরিবহন বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হককে বলা হয়, তিনিও প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. নাসিমুল গনিকে বিবেচনা করা হয়, কিন্তু তিনিও ‘ঝামেলা’ আশঙ্কায় রাজি হননি। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদও একইভাবে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন।
তালিকায় ছিলেন প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়াও। তিনিও অনীহা জানান। স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব রেজাউল মাকছুদ জাহেদীকেও বিবেচনায় আনা হলেও তাঁর রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা নিয়ে আপত্তি ওঠে।
গৃহায়ন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলামের নামও আসে আলোচনায়। কিন্তু রাজনৈতিক আপত্তি ও ব্যক্তিগত অনাগ্রহে তিনিও বাদ পড়েন। সবশেষ বিকল্প হিসেবে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সচিব মো. সাইফুল্লাহ পান্নাকে দায়িত্ব দেওয়ার চিন্তা চলছে। তিনি বিসিএস ১১তম ব্যাচের কর্মকর্তা। ধারণা করা হচ্ছে, চলতি সপ্তাহেই তাঁকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
কেন অনীহা সচিবদের?
জনপ্রশাসন সচিব হতে না চাওয়ার কারণ নিয়ে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে চাননি। সচিবালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে জনপ্রশাসনে নিয়োগ হয়েছে চুক্তিভিত্তিক ভিত্তিতে। ড. মোখলেস উর রহমানকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দিয়ে নিয়োগ দেওয়া হলেও মাত্র ১৩ মাসের মাথায় তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়—যা প্রশাসনের ইতিহাসে বিরল ঘটনা।
তাঁর মেয়াদকালে সচিব নিয়োগে অনিয়ম, দীর্ঘদিন পদ শূন্য থাকা, ডিসি পদে যুগ্ম সচিবদের বহাল রাখা, কাজের গতি কমে যাওয়া—এসব অভিযোগ প্রশাসনে অসন্তোষ সৃষ্টি করে। যদিও মোখলেস উর রহমান এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
‘অস্থির সময়’, ‘ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব’
কর্মকর্তাদের ভাষায়, এখন সময় অত্যন্ত অস্থির। আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন। জনপ্রশাসন সচিবকে এখন প্রতিদিন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে, বদলি ও নিয়োগের চাপ সামলাতে হবে। প্রভাবশালী মহলের তদবির মানতে না পারলে তাঁকে ঘিরে তৈরি হবে অভিযোগ ও বিতর্ক।
এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “এই মুহূর্তে জনপ্রশাসন সচিব হওয়া মানে নিজেকে অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকিতে ফেলা। কেউ বদনাম নিতে চাচ্ছেন না।”
প্রশাসনের কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এমন পরিস্থিতিতে কাউকে জোর করে দায়িত্ব দিলেও তিনি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন না। এতে আরও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে জনপ্রশাসনে।
এপিডি অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. এরফানুল হক বলেন, “এটা ঊর্ধ্বতনরা জানেন। আমার কাছে কোনো তথ্য নেই।”
জনপ্রশাসনে রুটিন দায়িত্বে থাকা সচিব ড. আবু শাহীন মো. আসাদুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

