ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে মেট্রোরেলের প্রয়োজন নিয়ে বড় কোনো বিতর্ক নেই। যানজট, কর্মঘণ্টা নষ্ট, জ্বালানি অপচয় এবং নগরজীবনের প্রতিদিনের চাপ কমাতে দ্রুতগামী গণপরিবহন এখন সময়ের দাবি। কিন্তু প্রয়োজনীয় একটি প্রকল্প যখন অস্বাভাবিক ব্যয়ের কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তখন বিষয়টি শুধু পরিবহন পরিকল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি, ঋণনীতি, জনগণের করের টাকা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর চাপের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। সরবরাহ করা মূল প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার নতুন দুই মেট্রোরেল পথে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ধরা হচ্ছে আগের উত্তরা–মতিঝিল পথের চেয়েও দ্বিগুণের বেশি।
আগের মেট্রোরেল পথ এমআরটি–৬, অর্থাৎ উত্তরা থেকে মতিঝিল অংশ নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছিল ১,৫৭৪ কোটি টাকা। অথচ পরিকল্পিত এমআরটি–১, যা কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর হয়ে পূর্বাচল পর্যন্ত যাবে, এবং এমআরটি–৫ উত্তর, যা হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত বিস্তৃত হবে—এই দুই পথে প্রতি কিলোমিটারে সম্ভাব্য ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ৩,৬১৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ আগের পথের তুলনায় ব্যয় শুধু কিছুটা বাড়েনি, বরং এমন মাত্রায় বেড়েছে যা স্বাভাবিক ব্যাখ্যার বাইরে চলে যায়।
এখানে মূল উদ্বেগ হলো, এই ব্যয় শেষ পর্যন্ত কে বহন করবে। কোনো বিদেশি ঋণ প্রকল্পের টাকা প্রকৃত অর্থে উপহার নয়। ঋণের অর্থ দিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও তা পরিশোধ করতে হয় রাষ্ট্রকে, আর রাষ্ট্র সেই দায় মেটায় জনগণের কর, ভাড়া, শুল্ক ও অন্যান্য রাজস্ব থেকে। ফলে নির্মাণ ব্যয় যত বেশি হবে, ভবিষ্যতে মেট্রোরেলের ভাড়া, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং ঋণ পরিশোধের চাপ তত বেশি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
বাংলাদেশের বড় অবকাঠামো প্রকল্পের একটি বড় অংশ বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীল। এসব ঋণদাতা সংস্থাকে অনেক সময় উন্নয়ন সহযোগী বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে প্রশ্ন থেকে যায়, এই সহযোগিতা কতটা গ্রহণকারী দেশের স্বার্থে, আর কতটা ঋণদাতা দেশের ব্যবসা, প্রযুক্তি ও ঠিকাদারি বাজার সম্প্রসারণের জন্য। কারণ অনেক প্রকল্পে দেখা যায়, ঋণদাতা দেশের প্রতিষ্ঠানই পরিকল্পনা করে, সম্ভাব্যতা যাচাই করে, পরামর্শ দেয়, দরপত্রের শর্ত তৈরি করে এবং শেষে সেই দেশের প্রতিষ্ঠানই কাজ পায়। এতে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়ার আশঙ্কা খুবই বেশি।
ঢাকার মেট্রোরেল প্রকল্পে জাইকার অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, ঋণ ও দরপত্রের শর্ত এমনভাবে সাজানো হচ্ছে, যাতে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কাজ পাওয়া সহজ হয় এবং অন্য দেশের প্রতিযোগীরা কার্যত পিছিয়ে পড়ে। যদি সত্যিই এমন হয়, তাহলে সেটি মুক্ত প্রতিযোগিতার নীতির সঙ্গে যায় না। কারণ প্রকল্পের প্রকৃত ব্যয় জানার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র। প্রতিযোগিতা সীমিত হলে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সুযোগও কমে যায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এমআরটি–১–এর দরপত্রে সুড়ঙ্গ নির্মাণে “ওয়ান-পাস জয়েন্ট” পদ্ধতি ব্যবহারের শর্ত রাখা হয়েছে, যা জাপানি ঠিকাদারদের জন্য সুবিধাজনক বলে মনে করা হচ্ছে। একইভাবে সেতু নির্মাণে নির্দিষ্ট ধরনের জাপানি ইস্পাত ব্যবহারের শর্তের কথাও বলা হয়েছে, যা জাপানের মাত্র তিনটি কোম্পানি উৎপাদন করে। অন্য দেশের সমমানের ইস্পাত ব্যবহার করতে চাইলে জাপান সড়ক সমিতির অনুমোদন নিতে হবে। এসব শর্ত কাগজে-কলমে প্রযুক্তিগত মনে হলেও বাস্তবে এগুলো প্রতিযোগিতা সীমিত করতে পারে।
এই ধরনের শর্তের ফলে দরপত্র আন্তর্জাতিক হলেও অংশগ্রহণ কার্যত সীমিত হয়ে পড়ে। যখন শেষ পর্যন্ত মাত্র দুই বা তিনটি জাপানি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে থাকে, তখন প্রকৃত বাজারমূল্য যাচাই করা কঠিন হয়ে যায়। এতে দর কমানোর চাপ কমে, আর প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ বড় প্রকল্পে সামান্য ব্যয়বৃদ্ধিও হাজার হাজার কোটি টাকার দায় তৈরি করতে পারে।
খরচের তুলনা করলে উদ্বেগ আরও স্পষ্ট হয়। ঢাকার এমআরটি–৬–এ প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে ১,৫৭৪ কোটি টাকা। অন্যদিকে ভারতে অনুরূপ উড়াল মেট্রো নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা এবং পাতাল মেট্রো নির্মাণে সর্বোচ্চ প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে তুরস্কে প্রতি কিলোমিটারে ৬৭২ কোটি টাকা, আইভরি কোস্টে ৪৪৮ কোটি টাকা, দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে ৭৮৪ কোটি টাকা এবং থাইল্যান্ডের ব্যাংককে ৭৪০ কোটি টাকা ব্যয়ের তুলনা এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে ঢাকার নতুন পথে প্রতি কিলোমিটারে ৩,৬১৮ কোটি টাকা ব্যয় অত্যন্ত অস্বাভাবিক মনে হয়।
ভারতের উদাহরণ এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভারতও বিদেশি ঋণে অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। কিন্তু তারা এমন শর্ত সাধারণত মেনে নেয় না, যা স্থানীয় বা অন্য প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত করে। বিহারের পাটনায় জাইকার অর্থায়নে মেট্রোরেলের পাতাল অংশ ভারতীয় ঠিকাদাররা প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকায় নির্মাণ করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, একই ধরনের অর্থায়ন কাঠামোর মধ্যে ভারতে যদি এত কম ব্যয়ে কাজ করা যায়, তাহলে বাংলাদেশে ব্যয় এত বেশি কেন হবে?
জাইকার পক্ষ থেকে উচ্চ ব্যয়ের পক্ষে একটি যুক্তি হলো, মান ভালো হলে ভবিষ্যতে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কম হয়। সাধারণভাবে এই যুক্তি একেবারে অগ্রহণযোগ্য নয়। ভালো মানের নির্মাণ অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ভালো মান নিশ্চিত করতে গিয়ে ব্যয় কি আট গুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে? আবার যদি মানই প্রধান যুক্তি হয়, তাহলে এমআরটি–৬–এ যে ত্রুটি ও দুর্বলতার কথা উঠে এসেছে, তা কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে?
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের একটি প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, উত্তরা–মতিঝিল মেট্রোরেলে ৪৫টি ত্রুটি ও ঘাটতি চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি সংকেত ও দূরযোগাযোগ ব্যবস্থায়, ১৬টি বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায়, ১০টি বেসামরিক প্রকৌশল অংশে এবং ৯টি ট্রেন ও সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থায়। আরও বলা হয়েছে, ১৬টি স্টেশনের ৮৯টি স্থানে পানি চুইয়ে পড়ার সমস্যা দেখা গেছে। এমন তথ্য থাকলে শুধু “উচ্চ ব্যয় মানেই উচ্চ মান”—এই যুক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
শুধু তা-ই নয়, ট্রেন নির্দিষ্ট স্থানে ঠিকভাবে না থামা, ডিপো এলাকায় রেলে মরিচা ধরা, সংবেদকজনিত সমস্যা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ত্রুটি, স্বয়ংক্রিয় টিকিট বিক্রয় যন্ত্রের সমস্যা এবং শক্তি সংরক্ষণ ব্যবস্থার অকার্যকারিতার কথাও উঠে এসেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা হলো, নকশাগত ত্রুটি ও নিম্নমানের ভারবহন প্যাডের কারণে ফার্মগেট এলাকায় একটি ভারবহন প্যাড খুলে পড়ে একজন পথচারীর মৃত্যু হয়েছে। এমন ঘটনা নির্মাণমান নিয়ে আরও গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
অন্যদিকে জাইকা ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে প্রকল্পের পরিধি বৃদ্ধি, টাকার মান কমে যাওয়া এবং নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়ার কথাও বলতে পারে। এসব কারণ বাস্তব হতে পারে। তবে এগুলো যাচাই করার জন্য দরপত্রে প্রকৃত প্রতিযোগিতা থাকা জরুরি। কারণ মুদ্রার মান কমা বা নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়া শুধু জাপানি প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, সব দেশের ঠিকাদারের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। প্রতিযোগিতা ছাড়া বোঝা কঠিন, প্রকৃত ব্যয় কত হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের জন্য মেট্রোরেল নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয়। কিন্তু প্রয়োজনীয়তার অজুহাতে অযৌক্তিক ব্যয় মেনে নেওয়া ঠিক নয়। উন্নয়ন প্রকল্পের লক্ষ্য হওয়া উচিত জনস্বার্থ রক্ষা, জনদুর্ভোগ কমানো এবং অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করা। যদি একটি প্রকল্প জনগণের জন্য সুবিধা তৈরি করলেও তার ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেশি হয়, তাহলে সেই সুবিধার সঙ্গে ঋণের বোঝাও যুক্ত হয়।
এখানে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বড় দায়িত্ব হলো ঋণচুক্তি, দরপত্রের শর্ত, ব্যয় হিসাব এবং প্রযুক্তিগত যুক্তি জনগণের সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা। বিদেশি ঋণদাতা সংস্থার প্রতি কৃতজ্ঞতা থাকতে পারে, কিন্তু সেই কৃতজ্ঞতার কারণে অস্বাভাবিক শর্ত মেনে নেওয়া যায় না। কারণ ঋণের টাকা শেষ পর্যন্ত জনগণই পরিশোধ করবে।
মেট্রোরেলের মতো বড় প্রকল্পে স্থানীয় বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, অর্থনীতিবিদ এবং স্বাধীন পর্যালোচকদের মতামত গুরুত্ব পাওয়া উচিত। শুধু ঋণদাতা দেশের পরামর্শক বা ঠিকাদারের ওপর নির্ভর করলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। প্রকল্পের ব্যয়, মান, দরপত্র, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ ভাড়া—সবকিছুই জাতীয় স্বার্থের আলোকে বিচার করতে হবে।
শেষ কথা হলো, ঢাকার মেট্রোরেল দরকার, কিন্তু যেকোনো দামে নয়। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা জনগণের জীবন সহজ করে এবং অর্থনীতির ওপর অযৌক্তিক চাপ তৈরি করে না। যদি দরপত্রে প্রকৃত প্রতিযোগিতা না থাকে, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ না হয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা না থাকে, তাহলে উন্নয়নের নামে জনগণের অর্থ বিদেশি বাণিজ্যিক স্বার্থের দিকে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। তাই এখনই প্রশ্ন তোলা জরুরি—মেট্রোরেল নির্মাণ হবে, কিন্তু সেটি কি জনগণের স্বার্থে, নাকি অস্বাভাবিক ব্যয়ের বোঝা চাপিয়ে?

