বাংলাদেশে এপ্রিল সাধারণত গরম, খরা আর তাপপ্রবাহের মাস হিসেবে পরিচিত। বছরের সবচেয়ে উষ্ণ সময়ের একটি এই মাসে কৃষকরা সাধারণত বৃষ্টি নয়, বরং তাপের চাপের কথা ভাবেন। কিন্তু ২০২৬ সালের এপ্রিল সেই চেনা ধারণাকে বড়ভাবে বদলে দিয়েছে। মাসজুড়ে অস্বাভাবিক বৃষ্টি, উজানের ঢল, নদী–নালা উপচে পড়া এবং পানিনিষ্কাশনের দুর্বলতায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষি বড় ধাক্কা খেয়েছে। সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে হাওরাঞ্চলের বোরো ধান।
হাওরের কৃষকের জীবন অনেকটাই এক ফসলের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে বোরো ধানই তাদের সারা বছরের খাদ্য, আয় এবং ঋণ পরিশোধের প্রধান ভরসা। তাই ফসল কাটার ঠিক আগে পানি ঢুকে গেলে ক্ষতি শুধু জমিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব পড়ে পুরো পরিবারের জীবনে। সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো হাওর জেলাগুলোতে এবার সেই বাস্তবতাই দেখা গেছে।
সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার পাগনার হাওর এলাকার লক্ষ্মীপুর গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলামের অভিজ্ঞতা যেন পুরো হাওরাঞ্চলের সংকটকে সামনে আনে। তিন বছর আগে বাঁধ ভেঙে তাঁর ফসল নষ্ট হয়েছিল। এবার বাঁধ ভাঙার আগেই বৃষ্টির পানি ও জলাবদ্ধতা তাঁর জমির ধান ডুবিয়ে দিয়েছে। আগে হাওরের মানুষ প্রধানত বাঁধ ভাঙাকে ভয় পেত। কিন্তু এবার দেখা গেল, বাঁধ না ভাঙলেও ফসল নিরাপদ নয়। কারণ পানি জমে থাকলে পাকা ধানও রক্ষা করা যায় না।
এবারের বিপর্যয়ের বিশেষ দিক হলো, ফসল কাটার সময়ের ঠিক আগে বৃষ্টি শুরু হয়। অনেক কৃষক ধান কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কেউ কেউ কয়েক দিন অপেক্ষা করছিলেন যেন ধান আরও ভালোভাবে পাকে। কিন্তু এপ্রিলের শেষ ভাগের অতিবৃষ্টি তাদের সেই অপেক্ষাকে ক্ষতিতে পরিণত করেছে। পানির নিচে দাঁড়িয়ে ধান কাটতে হয়েছে অনেককে। কোথাও পাকা ধান ডুবে গেছে, কোথাও কাটা ধান শুকানোর সুযোগ পায়নি, আবার কোথাও জমির পানি নামেনি বলে শ্রমিক নামানোই কঠিন হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের পর দেশে এপ্রিল মাসে এত বৃষ্টি হয়নি। অর্থাৎ গত ৯ বছরের মধ্যে এবারের এপ্রিল সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের মাস হিসেবে সামনে এসেছে। অথচ এপ্রিল দেশের সবচেয়ে উষ্ণ মাস। এ মাসে গড় তাপমাত্রা থাকে ৩৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু ২০২৬ সালের এপ্রিলে সর্বোচ্চ ও গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় যথাক্রমে শূন্য দশমিক ৬ ডিগ্রি এবং শূন্য দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম ছিল।
গরমের মৌসুমের শুরুতেই আবহাওয়া অধিদপ্তর পূর্বাভাস দিয়েছিল, অন্তত এপ্রিলে তাপ ততটা তীব্র হবে না। বাস্তবেও দেখা গেছে, ২২ এপ্রিল রাজশাহীতে এক দিন সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠেছিল। ২০২৪ সালে যেখানে প্রায় পুরো এপ্রিলজুড়ে তাপপ্রবাহ ছিল, সেখানে সদ্য বিদায়ী এপ্রিলে তাপপ্রবাহ ছিল বিচ্ছিন্নভাবে। মাসের শুরুতে তাপপ্রবাহ শুরু হলেও দুই দিনের মধ্যে তা কমে যায়। এরপর প্রথম সপ্তাহেই বৃষ্টি শুরু হয়। দ্বিতীয় সপ্তাহের পর আবার তাপপ্রবাহ দেখা দিলেও তা প্রায় সাত দিনের মতো স্থায়ী হয় এবং সারা দেশে ছড়ায়নি। সর্বোচ্চ ২২টি জেলায় তাপপ্রবাহ ছিল। মাসের শেষ দিকে আবার বৃষ্টি শুরু হয়, যার প্রভাব মে মাসের প্রথম তিন দিনেও থেকে যায়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এপ্রিল মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৫ শতাংশের বেশি বৃষ্টি হয়েছে। রাজশাহী বিভাগ ছাড়া সব বিভাগেই বেশি বৃষ্টি হয়েছে। বরিশাল বিভাগে বৃষ্টি হয়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে ১৬৯ শতাংশের বেশি। ঢাকা বিভাগে প্রায় ৮০ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। এই অতিরিক্ত বৃষ্টিই কৃষির জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, প্রাক্বর্ষা ও বর্ষা–পরবর্তী সময়ে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়া এখন নতুন প্রবণতা হিসেবে দেখা যাচ্ছে। এর পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব রয়েছে। অর্থাৎ সমস্যা আর শুধু কোনো একটি বছরের বিচ্ছিন্ন আবহাওয়া নয়; বরং কৃষি পরিকল্পনার জন্য এটি দীর্ঘমেয়াদি সতর্কবার্তা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন শাখার তথ্য অনুযায়ী, হাওরের সাত জেলায় চলতি মৌসুমে ৪ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৩ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। এর মধ্যে ৭১ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। তবে ৪৬ হাজার হেক্টর জমি পানিতে ডুবে গেছে। এই সাত জেলা হলো সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
তবে কৃষকদের সঙ্গে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, সরকারি হিসাবের তুলনায় প্রকৃত ক্ষতি আরও বেশি হতে পারে। কারণ মাঠপর্যায়ে ক্ষতির হিসাব করতে সময় লাগে। কোথাও ধান আংশিক নষ্ট হয়েছে, কোথাও পুরো জমি ডুবেছে, আবার কোথাও কাটা ধান বৃষ্টিতে নষ্ট হয়েছে। এসব ক্ষতি একসঙ্গে হিসাব করা সহজ নয়।
শুধু সুনামগঞ্জেই কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, বৃষ্টিতে ১৮ হাজার হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর আগে আরও ২ হাজার হেক্টর ফসলের ক্ষতি হয়েছিল। সেই হিসাবে অন্তত ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতি শুধু অর্থের অঙ্ক নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষকের ঋণ, খাদ্যনিরাপত্তা, শ্রমিক ব্যয় এবং আগামী মৌসুমের প্রস্তুতি।
এই পরিস্থিতি হাওর রক্ষার প্রচলিত ধারণাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। সুনামগঞ্জে প্রতিবছর ফসল রক্ষায় বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে শতকোটি টাকা ব্যয় হয়। সাধারণত হাওরের ফসল বাঁচানোর আলোচনায় বাঁধকেই প্রধান সমাধান হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এবারের ঘটনা দেখাল, শুধু বাঁধ দিয়ে হাওরের কৃষি রক্ষা করা যাবে না। কারণ এবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্মিত বা সংস্কার করা কোনো বাঁধ ভাঙেনি। তবু ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
এর বড় কারণ জলাবদ্ধতা ও পানিনিষ্কাশনের সংকট। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার জানিয়েছেন, হাওরের তলদেশ এবং নদী–নালা পলি পড়ে ভরাট হয়ে গেছে। অনেক জায়গায় স্থাপনা তৈরি হওয়ায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে অতিবৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারেনি। পানি দাঁড়িয়ে থাকায় জমির ধান নষ্ট হয়েছে।
এই বাস্তবতা হাওরের ভূপ্রকৃতি পরিবর্তনের দিকেও দৃষ্টি টানে। সড়ক, বসতবাড়ি, পাকা স্থাপনা ও বিভিন্ন মানবসৃষ্ট পরিবর্তনের কারণে হাওরের প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ আগের মতো নেই। আগে পানি আসত, আবার সরে যেত। এখন অনেক স্থানে পানি আটকে যাচ্ছে। ফলে হাওর কৃষির ঝুঁকি শুধু উজানের ঢল বা বাঁধ ভাঙার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; জলাবদ্ধতা এখন নতুন বড় বিপদ।
কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবদুস সাত্তার মণ্ডলের মতে, হাওরের ভূপ্রকৃতি বদলে গেছে এবং এর অনেকটাই মানুষের তৈরি পরিবর্তনের ফল। তাই হাওরে প্রচলিত কৃষি ও চিরাচরিত ফসল নির্বাচনে পরিবর্তন আনতে হবে। কোন ধরনের কৃষি এই বদলে যাওয়া পরিবেশে টিকে থাকতে পারবে, তা গবেষক, কৃষিবিদ ও সংশ্লিষ্টদের নতুন করে ভাবতে হবে। শুধু কৃষির ওপর নির্ভর না করে হাওর অর্থনীতিতে অকৃষি খাতকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
এবারের অতিবৃষ্টির ক্ষতি শুধু হাওরের বোরো ধানে সীমাবদ্ধ থাকেনি। দক্ষিণাঞ্চলের মুগ ডাল, বাদাম, সূর্যমুখী, মরিচ, মিষ্টি আলু এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সবজি ও ফলবাগানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অর্থাৎ অকাল বৃষ্টি কৃষির বহু খাতকে একসঙ্গে আঘাত করেছে।
পটুয়াখালীতে মুগ ডাল একটি লাভজনক ফসল। এ বছর সেখানে ৫১ হাজার হেক্টর জমিতে মুগ ডাল চাষ হয়েছে। ৬ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে বাদাম এবং তিন হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে সূর্যমুখী হয়েছে। কিন্তু ২৬ তারিখ থেকে টানা বৃষ্টিতে অনেক কৃষকের বাদাম খেত পচে গেছে। মুগ ডাল কয়েক দফায় তোলা হয়। সাধারণত ২০ এপ্রিলের পর থেকেই তোলা শুরু হয়। কিন্তু ঠিক সেই সময়েই বৃষ্টি শুরু হওয়ায় প্রায় সব জমির মুগ ডাল কিছু না কিছু ক্ষতির মুখে পড়েছে।
বরগুনাতেও ক্ষতির চিত্র বড়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রবি মৌসুমে জেলায় মোট ৭০ হাজার ২৭৯ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের ফসলের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ৪৮ হাজার ৭৬০ হেক্টর জমিতে মুগ ডাল, ৮০১ হেক্টরে চিনাবাদাম, ১ হাজার ৩৬০ হেক্টরে মরিচ এবং ৫৯৪ হেক্টরে মিষ্টি আলু ছিল। ভারী বৃষ্টিতে ৫ হাজার ২৬০ হেক্টর মুগ ডাল, ১০২ হেক্টর মরিচ, ৫৭ হেক্টর মিষ্টি আলু এবং ১২২ হেক্টর বাদাম নষ্ট হয়েছে।
খাগড়াছড়িতেও টানা বৃষ্টিতে কৃষি ক্ষতির মুখে পড়েছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রায় ২২১ হেক্টর জমির পাকা বোরো ধান, ৬৩ হেক্টর সবজি এবং ৫৪৮ হেক্টর ফলবাগান ক্ষতির মুখে পড়েছে। গাইবান্ধায় বৃষ্টি ও কালবৈশাখীর প্রভাবে প্রায় ২১২ হেক্টর জমির ধানগাছ শুয়ে গেছে। সাতক্ষীরা সদর, কলারোয়া ও তালা উপজেলাতেও অতিবৃষ্টিতে ধানের ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
সব মিলিয়ে এবারের এপ্রিল কৃষির জন্য একটি সতর্কবার্তা রেখে গেল। সবচেয়ে উষ্ণ মাসে অস্বাভাবিক বৃষ্টি, হাওরে জলাবদ্ধতা, দক্ষিণাঞ্চলে ডাল ও বাদামের ক্ষতি, পাহাড়ি এলাকায় ফলবাগানের ক্ষতি—সব মিলিয়ে কৃষি পরিকল্পনার প্রচলিত সময়সূচি নতুন করে ভাবার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের কৃষি দীর্ঘদিন ধরে মৌসুমি ছন্দের ওপর নির্ভর করে এগিয়েছে। কখন বৃষ্টি হবে, কখন তাপপ্রবাহ হবে, কখন ধান কাটা হবে—এসবের একটি অভিজ্ঞতানির্ভর হিসাব কৃষকেরা জানতেন। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সেই হিসাব আর আগের মতো স্থির নেই। যে সময় গরম থাকার কথা, সে সময় অতিবৃষ্টি হচ্ছে। যে সময় ধান কাটার কথা, সে সময় জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। এতে কৃষক শুধু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না; পুরো খাদ্যব্যবস্থাও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
এখন জরুরি হলো ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত সহায়তা দেওয়া, প্রকৃত ক্ষতির নির্ভরযোগ্য হিসাব করা এবং হাওরাঞ্চলের জন্য শুধু বাঁধনির্ভর পরিকল্পনা থেকে বেরিয়ে আসা। নদী–নালা খনন, পানিনিষ্কাশনের পথ পুনরুদ্ধার, হাওরের ভেতরে অপরিকল্পিত স্থাপনা নিয়ন্ত্রণ এবং আগাম সতর্কবার্তা আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ফসলের জাত, আবাদ সময়, কাটার কৌশল এবং বিকল্প জীবিকার পরিকল্পনাও নতুনভাবে সাজাতে হবে।
এবারের ক্ষতি দেখিয়ে দিল, হাওরের সংকট আর শুধু বাঁধ ভাঙার গল্প নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, অতিবৃষ্টি, পলি জমে তলদেশ ভরাট, পানিনিষ্কাশনের বাধা এবং কৃষি পরিকল্পনার দুর্বলতা মিলেই এখন নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। এই বাস্তবতা বুঝে ব্যবস্থা না নিলে আগামী বছরগুলোতে একই ধরনের বিপর্যয় আরও ঘন ঘন দেখা দিতে পারে।

