সরকার গঠনের পর জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনার প্রতিশ্রুতি ছিল অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার। তবে দায়িত্ব গ্রহণের তিন মাসের বেশি সময় পার হলেও দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে প্রত্যাশিত উন্নতি এখনো স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান নয় বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক, মানবাধিকারকর্মী এবং অপরাধবিষয়ক গবেষকরা। সাম্প্রতিক সময়ে হত্যা, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও গণপিটুনির একাধিক ঘটনায় জনমনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অপরাধ দমন এবং জননিরাপত্তা জোরদারে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানও পরিচালিত হয়েছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। কিন্তু এসব উদ্যোগের পরও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধ পুরোপুরি ফিরে আসেনি বলে সংশ্লিষ্ট মহলের পর্যবেক্ষণ।
রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় সংঘটিত কয়েকটি আলোচিত অপরাধ সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে শিশু ও নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা জনসাধারণের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গত মে মাসে রাজধানীর পল্লবী এলাকায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। একই সময়ে বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, গ্যাং-সংঘর্ষ এবং ব্যক্তিগত বিরোধকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও আলোচনায় আসে।
পুলিশের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি বছরের মার্চ ও এপ্রিল মাসে হত্যার সংখ্যা আগের দুই বছরের একই সময়ের তুলনায় বেশি। ডাকাতির ঘটনা কিছুটা কমলেও তা এখনও কয়েক বছর আগের অবস্থানের চেয়ে উঁচু পর্যায়ে রয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যদিও কিছু সূচকে সামান্য উন্নতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, তবুও পরিস্থিতিকে সন্তোষজনক বলা যাচ্ছে না বলে মত সংশ্লিষ্টদের।
গণপিটুনির ঘটনাও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। বিভিন্ন সময় সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব এখনও দেখা যায়নি। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম চার মাসেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে এবং বহু মানুষের প্রাণহানি হয়েছে।
এদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজির অভিযোগও সামনে এসেছে। বিভিন্ন এলাকায় প্রভাব বিস্তার এবং আর্থিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকার অপরাধীদের তালিকা তৈরি করে বিশেষ অভিযান শুরু করলেও এখন পর্যন্ত তার দৃশ্যমান ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনের মতে, নতুন সরকারের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। মানুষ ভেবেছিল রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে দ্রুত উন্নতি হবে। কিন্তু বাস্তবে এখনও বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ও অপরাধের ঘটনা ঘটছে, যা উদ্বেগের কারণ।
তিনি মনে করেন, পূর্ববর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পুলিশ বাহিনীর যে সাংগঠনিক দুর্বলতা তৈরি হয়েছিল, তা পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। তবে অল্প সময়ের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সংকট সমাধান করাও সহজ নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন যে সাম্প্রতিক কয়েকটি বড় অপরাধ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়নি। যদিও তারা দাবি করছেন, অধিকাংশ আলোচিত ঘটনার মূল অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও সংঘবদ্ধ অপরাধের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, কর্মকর্তাদের বদলি, মনোবলসংক্রান্ত সমস্যা এবং গোয়েন্দা তৎপরতার সীমাবদ্ধতা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলেছে। ফলে অপরাধ প্রতিরোধ ও দ্রুত প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রে কিছু দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধুমাত্র অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না; একই সঙ্গে পুলিশি সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আইন প্রয়োগ এবং জনআস্থা পুনর্গঠনও জরুরি।
দায়িত্ব গ্রহণের শতদিন পার হওয়ার পর সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে উঠেছে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নয়ন। কারণ অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে নিরাপত্তা পরিস্থিতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তাই জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ফল দেখানো এখন সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

