বাংলাদেশে তামাক শুধু একটি অভ্যাসের বিষয় নয়; এটি এখন জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং নীতিনির্ধারণের বড় সংকট। প্রতি বছর তামাকজনিত রোগে বিপুলসংখ্যক মানুষ মারা যাচ্ছেন, অসংখ্য পরিবার চিকিৎসা ব্যয়ের চাপে পড়ছে, আর দেশের অর্থনীতি হারাচ্ছে উৎপাদনশীল জনশক্তি। অথচ প্রতি বছর বাজেটের আগে তামাকপণ্যে কর বাড়ানোর দাবি ওঠে, সরকারও বিভিন্ন সময়ে কর বাড়ায়। তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়—কর বাড়ানো সত্ত্বেও তামাক ব্যবহার কেন প্রত্যাশিতভাবে কমছে না?
তামাক অ্যাটলাসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২০০,০০০ মানুষ তামাকজনিত অসুস্থতায় মারা যান। সংখ্যাটি যদি দৈনন্দিন হিসাবে দেখা হয়, তাহলে দাঁড়ায় প্রতিদিন ৫৪৮ জন, প্রতি সপ্তাহে ৩,৮০০ জনের বেশি এবং প্রতি মাসে ১৬,৬০০ জনেরও বেশি মৃত্যু। অর্থাৎ দেশের প্রায় প্রতি পাঁচটি মৃত্যুর একটির সঙ্গে ধূমপান বা ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারের সম্পর্ক রয়েছে। শুধু মৃত্যুই নয়, ক্যানসার, হৃদ্রোগ, শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি নানা অসুস্থতার কারণে লাখো মানুষ কষ্ট পাচ্ছেন।
এই ক্ষতি শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক নয়; এর বড় অর্থনৈতিক মূল্যও আছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে তামাকের কারণে স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়, উৎপাদনশীলতা হ্রাস এবং পরিবেশগত ক্ষতি মিলিয়ে বছরে প্রায় ৮৭০ বিলিয়ন টাকা অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। অন্যদিকে ২০২৪ সালে তামাক শিল্প থেকে সরকারের মোট কর-আয় ছিল প্রায় ৪১০ বিলিয়ন টাকা। অর্থাৎ তামাক থেকে যে রাজস্ব আসে, তামাকের কারণে সৃষ্ট ক্ষতি তার দ্বিগুণেরও বেশি। এই তুলনা স্পষ্ট করে যে তামাককে শুধু রাজস্বের উৎস হিসেবে দেখলে বড় জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা আড়ালে থেকে যায়।
তামাক নিয়ন্ত্রণে কর বৃদ্ধি বিশ্বজুড়ে একটি কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃত। কারণ দাম বাড়লে বিশেষ করে তরুণ, নিম্ন আয়ের মানুষ এবং নতুন ব্যবহারকারীদের মধ্যে তামাক ব্যবহার কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বহুদিন ধরেই বলছে, তামাকপণ্যের ওপর উচ্চ কর আরোপ জনস্বাস্থ্য রক্ষার অন্যতম সাশ্রয়ী ও কার্যকর উপায়। সংস্থাটির সুপারিশ হলো, সিগারেটের খুচরা মূল্যের অন্তত ৭৫ শতাংশ কর হওয়া উচিত। ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৪০টির বেশি দেশ এই মানদণ্ড পূরণ করেছে বা অতিক্রম করেছে। এসব দেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, সঠিকভাবে কর কাঠামো সাজানো গেলে তামাক ব্যবহার কমানো সম্ভব।
শ্রীলঙ্কা এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ধারাবাহিক ও শক্তিশালী কর বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশটি সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া সিগারেটের খুচরা মূল্যের প্রায় ৭৭ শতাংশ কর হিসেবে নির্ধারণ করেছে। এর ফলে সিগারেটের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে যেতে শুরু করেছে এবং গত এক দশকে সিগারেট ব্যবহার আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৩ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ কর শুধু বাড়ানো হয়নি; কর এমনভাবে বসানো হয়েছে যাতে সিগারেট সত্যিই কম সাশ্রয়ী হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তামাক কর বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি। এর প্রধান কারণ করের পরিমাণ নয়, বরং কর কাঠামোর দুর্বলতা। বাংলাদেশে বর্তমানে সিগারেটের ওপর মূল্যভিত্তিক সম্পূরক শুল্ক, ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর এবং ১ শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হয়। সিগারেটের জন্য চারটি আলাদা মূল্যস্তর রয়েছে। মোট করের হার নিম্নস্তরের ব্র্যান্ডে প্রায় ৬৮ শতাংশ থেকে উচ্চমূল্যের ব্র্যান্ডে প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত। কাগজে-কলমে এই হার অনেক বেশি মনে হলেও বাস্তবে কাঠামোটি ধূমপায়ীদের জন্য বিকল্প পথ খুলে দেয়।
সমস্যাটি হলো, সব সিগারেট এক দামে বা এক করনীতির আওতায় নেই। যখন উচ্চমূল্যের সিগারেটের দাম বাড়ে, তখন অনেক ধূমপায়ী সিগারেট ছাড়েন না; বরং তুলনামূলক সস্তা স্তরের ব্র্যান্ডে চলে যান। ফলে কর বাড়লেও মোট ব্যবহার খুব বেশি কমে না। বরং বাজারের বড় অংশ সস্তা সিগারেটের দখলে থেকে যায়। তামাক কোম্পানিগুলোও এই সুযোগ কাজে লাগায়। তারা কম দামের নতুন পণ্য বাজারে আনে, যাতে ভোক্তারা পুরোপুরি বাজার ছাড়ার বদলে সস্তা বিকল্পে অভ্যস্ত হন।
বাংলাদেশে প্রায় ৯০ শতাংশ ধূমপায়ী নিম্নমূল্যের সিগারেট ব্যবহার করেন। এই তথ্যই দেখায়, বর্তমান কর কাঠামো তামাক ব্যবহার কমানোর বদলে সস্তা সিগারেটের বাজারকে টিকিয়ে রাখছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণেও একই প্রবণতা দেখা যায়। ২০০৬-০৭ অর্থবছরে নিম্নস্তরের সিগারেটের বাজার অংশ ছিল ২৫ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে ৭৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ প্রায় দুই দশকে সস্তা সিগারেট বাজারের প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছে।
এখানেই বাংলাদেশের তামাক করনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। কর বাড়ানো হলেও সিগারেটের প্রকৃত সাশ্রয়যোগ্যতা যথেষ্ট কমেনি। ২০২৫ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নিম্নমূল্যের সিগারেটের সাশ্রয়যোগ্যতার বিচারে ১৬২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১২তম। সহজভাবে বললে, বাংলাদেশে সস্তা সিগারেট এখনো খুব সহজলভ্য। একটি কলার দামের সঙ্গে একটি গোল্ড লিফ সিগারেটের দাম প্রায় তুলনীয়। কিন্তু শ্রীলঙ্কায় একই ব্র্যান্ডের একটি সিগারেটের দাম একটি কলার চেয়ে প্রায় ২০ গুণ বেশি। এই তুলনা বোঝায়, করের হার বেশি দেখালেই যথেষ্ট নয়; পণ্যটি মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে যাচ্ছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।
বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের হারও উদ্বেগজনক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি, ৩৫.৩ শতাংশ। তুলনায় ভারতে এই হার ২৮.৬ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ১৯.১ শতাংশ। এই পার্থক্য দেখায়, শুধু কর বাড়ানো নয়, করের ধরন, মূল্যস্তরের ব্যবধান, বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং সস্তা পণ্যের সহজলভ্যতা—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি।
বর্তমান বহুস্তরভিত্তিক করব্যবস্থা তামাক নিয়ন্ত্রণের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে তামাক শিল্পের জন্য সুবিধাজনক হয়ে উঠেছে। কারণ এতে ধূমপায়ী হারিয়ে যায় না; তারা এক স্তর থেকে আরেক স্তরে চলে যায়। উচ্চমূল্যের সিগারেটের ব্যবহার কমলেও নিম্নমূল্যের সিগারেটের বাজার বাড়ে। এতে কোম্পানির বিক্রি চলতে থাকে, সরকার কিছু রাজস্ব পায়, কিন্তু জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি কমে না। তাই এই করনীতি রাজস্ব সংগ্রহে কিছু ভূমিকা রাখলেও তামাক ব্যবহার কমানোর ক্ষেত্রে দুর্বল।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলছেন, বাংলাদেশে সিগারেটের বহুস্তরভিত্তিক কর কাঠামো বদলানো দরকার। এর বদলে সরল, একক এবং নির্দিষ্ট করব্যবস্থা চালু করা হলে সস্তা ও দামি সিগারেটের ব্যবধান কমে যাবে। তখন ধূমপায়ীদের জন্য সস্তা ব্র্যান্ডে নেমে যাওয়ার সুযোগ কম থাকবে। কর বাড়লে সব ধরনের সিগারেটই একসঙ্গে কম সাশ্রয়ী হবে। এতে নতুন ব্যবহারকারী তৈরি হওয়া কমবে, তরুণদের মধ্যে ধূমপানের প্রবণতা কমতে পারে এবং পুরোনো ধূমপায়ীদের মধ্যেও ছাড়ার চাপ তৈরি হবে।
বাংলাদেশ ২০৪০ সালের মধ্যে ধূমপানমুক্ত দেশ হওয়ার অঙ্গীকার করেছে। কিন্তু এই লক্ষ্য পূরণ করতে হলে শুধু ঘোষণা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বাস্তবসম্মত, কঠোর এবং জনস্বাস্থ্যকেন্দ্রিক কর সংস্কার। তামাক করকে শুধু রাজস্ব আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে দেখলে হবে না; এটি হতে হবে জীবন বাঁচানোর নীতি। সিগারেট যতদিন সস্তা থাকবে, ততদিন কর বৃদ্ধি কাগজে সফল হলেও বাস্তবে ব্যর্থ থেকে যাবে।
তামাক নিয়ন্ত্রণের মূল প্রশ্ন তাই কর বাড়ানো নয়, কর কীভাবে বাড়ানো হচ্ছে। যদি কর কাঠামো এমন হয় যে ধূমপায়ী সহজেই সস্তা বিকল্পে চলে যেতে পারেন, তাহলে সেই কর জনস্বাস্থ্য রক্ষা করতে পারবে না। বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন করব্যবস্থা, যা তামাকপণ্যের সাশ্রয়যোগ্যতা কমাবে, সস্তা সিগারেটের বাজার সংকুচিত করবে এবং তামাক কোম্পানির কৌশলগত সুবিধা বন্ধ করবে।
তামাকের কারণে প্রতিবছর যে প্রাণহানি, রোগভোগ ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে, তা প্রতিরোধযোগ্য। এখন দরকার নীতির দুর্বল জায়গাগুলো স্বীকার করা এবং সাহসী সংস্কারের পথে হাঁটা। কারণ তামাক করের প্রকৃত উদ্দেশ্য শুধু সরকারি কোষাগার পূরণ নয়; এর বড় উদ্দেশ্য মানুষের জীবন রক্ষা, পরিবারকে অসুস্থতার বোঝা থেকে বাঁচানো এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিকোটিনের আসক্তি থেকে দূরে রাখা।

