রাজধানীর পল্লবীর একটি আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাট থেকে এক নারীর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা নগরজীবনের নিঃসঙ্গতা ও পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার বাস্তবতাকে আবারও সামনে এনে দিয়েছে। কয়েক দিন ধরে কারও সঙ্গে যোগাযোগ না থাকলেও বিষয়টি নজরে না আসায় মৃত্যুর পর দীর্ঘ সময় তিনি ফ্ল্যাটেই পড়ে ছিলেন বলে ধারণা করছে পুলিশ।
নিহত নারী সেলিনা আফরোজ, বয়স ৫৫ বছর। তিনি রাজধানীর পল্লবী এলাকার একটি ফ্ল্যাটে একাই বসবাস করতেন। তার স্বামী ও দুই সন্তান দীর্ঘদিন ধরে কানাডায় অবস্থান করছেন। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের ধারণা, কয়েক দিন আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। তবে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন অপেক্ষা করতে হবে।
পুলিশ জানিয়েছে, বুধবার স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে পল্লবীর একটি বহুতল ভবনের ফ্ল্যাটে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখা যায়, মরদেহে পচন ধরেছে। পরে আইনগত প্রক্রিয়া শেষে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় সূত্র থেকে জানা গেছে, প্রায় এক যুগ আগে তিনি বিদেশ থেকে দেশে ফিরে আসেন। এরপর পৈতৃক সম্পত্তি হিসেবে পাওয়া ফ্ল্যাটে একাই বসবাস শুরু করেন। স্বামী ও সন্তানরা বিদেশে থাকলেও তিনি আর সেখানে ফিরে যাননি। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কারণে দীর্ঘদিন ধরেই তিনি একা জীবনযাপন করছিলেন বলে জানা গেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, পরিবারের এক সদস্যের সঙ্গে গত মে মাসের শেষ সপ্তাহে তার সর্বশেষ যোগাযোগ হয়েছিল। এরপর কয়েক দিন ধরে ফোনে যোগাযোগ না হলেও প্রথমদিকে বিষয়টি নিয়ে তেমন উদ্বেগ তৈরি হয়নি। পরে দীর্ঘ সময় কোনো সাড়া না পাওয়ায় খোঁজ নিতে গিয়ে ঘটনার বিষয়টি সামনে আসে।
পুলিশ বলছে, ঘটনাস্থলে আপাতত কোনো সন্দেহজনক আলামত পাওয়া যায়নি। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হবে। প্রয়োজন হলে আরও তদন্তও করা হবে।
এই ঘটনা শুধু একটি মৃত্যুর খবর নয়; বরং দ্রুত পরিবর্তিত নগরজীবনের এক কঠিন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। রাজধানীতে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন, যারা পরিবার-পরিজন থেকে দূরে একা বসবাস করেন। আত্মীয়স্বজন বা প্রতিবেশীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ না থাকলে অসুস্থতা কিংবা দুর্ঘটনার মতো পরিস্থিতি অনেক সময় দীর্ঘ সময় অজানাই থেকে যায়।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, বড় শহরে পারিবারিক বন্ধন শিথিল হওয়া, বিদেশে স্থায়ী হওয়া সন্তানদের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং একক পরিবার ব্যবস্থার বিস্তারের কারণে প্রবীণ ও মধ্যবয়সী অনেক মানুষ নিঃসঙ্গ জীবন কাটাচ্ছেন। তাদের একটি অংশ জরুরি পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়ার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হন।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীতে একা বসবাসকারী ব্যক্তিদের মৃত্যুর পর কয়েক দিন কিংবা এক সপ্তাহ পর্যন্ত মরদেহ পড়ে থাকার একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। এসব ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ, পারিবারিক দায়িত্ববোধ এবং প্রতিবেশী সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একা বসবাসকারী ব্যক্তি, বিশেষ করে প্রবীণ নারী-পুরুষদের জন্য নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়ার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। পরিবার, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ এমন অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি দ্রুত শনাক্ত করতে সহায়তা করতে পারে।
পল্লবীর এই মর্মান্তিক ঘটনাও সেই একই প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে—ব্যস্ত নগরজীবনে মানুষ কি ধীরে ধীরে এতটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে যে মৃত্যুর পরও কয়েক দিন কারও নজরে আসে না? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তাও নতুন করে অনুভূত হচ্ছে।

