বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ পানি অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত গঙ্গা বা পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সামনে এসেছে। প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা, পরিবেশগত প্রভাব, নদী ব্যবস্থাপনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও নদী গবেষক অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। তাঁর মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগে যেসব মৌলিক বিষয় নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়া প্রয়োজন ছিল, সেগুলোর অনেকটাই এখনো অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে।
সম্প্রতি পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের পটভূমি নিয়ে প্রকাশিত একটি লেখার প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুই সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বক্তব্যের জবাব দিয়েছেন তিনি। সেখানে তিনি দাবি করেন, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা পেশাগত পরিচয়কে সামনে আনার পরিবর্তে প্রকল্পের যৌক্তিকতা ও সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে তথ্যভিত্তিক আলোচনা হওয়া উচিত।
অধ্যাপক নজরুল ইসলামের মতে, দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পটিকে ‘গঙ্গা ব্যারাজ’ নামে পরিচিত করা হলেও এখন ‘পদ্মা ব্যারাজ’ নামে উল্লেখ করা হচ্ছে। নাম পরিবর্তনের কারণ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, প্রকল্পের সর্বশেষ সম্ভাব্যতা প্রতিবেদনে ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তিকে প্রকল্প বাস্তবায়নের অন্যতম প্রেরণা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক নদীর পানিবণ্টন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘ কনভেনশনকে সামনে এনে অনেক যুক্তি উপস্থাপন করা হলেও বাংলাদেশ এখনো সেই কনভেনশনে স্বাক্ষর বা অনুসমর্থন করেনি। ফলে বাস্তবতার সঙ্গে এসব যুক্তির কতটা সামঞ্জস্য রয়েছে, সেটিও আলোচনার দাবি রাখে।
সম্ভাব্যতা সমীক্ষা নিয়ে বিতর্কের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, অতীতের বেশ কয়েকটি গবেষণা মূলত ব্যারাজের স্থান নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হয়েছিল। তাঁর দাবি, প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নথিতেও একই ধরনের তথ্য রয়েছে। তাই এ বিষয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির সুযোগ নেই।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হচ্ছে প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়া। অধ্যাপক নজরুল ইসলামের অভিযোগ, প্রায় ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকার এই বৃহৎ প্রকল্প সম্পর্কে জনগণের সামনে পর্যাপ্ত তথ্য উন্মুক্ত করা হয়নি। তিনি বলেন, যদি সত্যিই জনপরামর্শ, তথ্য প্রকাশ এবং পরিবেশগত মূল্যায়নের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা প্রতিবেদন সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য হওয়া উচিত ছিল।
তাঁর মতে, এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সংসদীয় আলোচনা, উন্মুক্ত মতবিনিময় এবং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মানুষের মতামত গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রকল্পটির প্রভাব কেবল একটি নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব দেশের বিস্তৃত নদী ব্যবস্থার ওপরও পড়তে পারে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলাবদ্ধতা সমস্যার প্রসঙ্গেও তিনি ভিন্নমত তুলে ধরেন। বিশেষ করে ভবদহ অঞ্চলে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতার পেছনে শুধু পানির স্বল্পতাকে দায়ী না করে নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহে তৈরি হওয়া বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতাকে বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নির্মিত অসংখ্য অবকাঠামো নদীর সঙ্গে নদীর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে, ফলে বর্ষাকালেও অনেক শাখা নদী প্রয়োজনীয় পানি পায় না।
তিনি দাবি করেন, দেশের বিভিন্ন নদীর মুখে নির্মিত স্লুইসগেট, বাঁধ এবং অন্যান্য কাঠামোর কারণে নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে পলি জমে নদী ভরাট হয়েছে, পানি চলাচল কমেছে এবং জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বেড়েছে। তাঁর মতে, কেবল ড্রেজিং করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বরং প্রথমে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি প্রশ্ন হলো ব্যারাজ নির্মাণের পর পানির বণ্টন ব্যবস্থা। সম্ভাব্যতা প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, শুষ্ক মৌসুমে উজানের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা নদীতে অতিরিক্ত পানি সরবরাহ করা হলে ভাটির অংশে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁর মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নের পর ভাটির এলাকায় নদীর আকার-আকৃতি, প্রবাহ, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, নদীর একটি অংশে পানি ধরে রেখে অন্য অংশে সরিয়ে নেওয়ার ফলে ভাটিতে চর জাগা, নদীপথ পরিবর্তন, তীরভাঙন এবং নাব্যতা সংকটের মতো সমস্যা তৈরি হতে পারে। এসব প্রভাব শুধু পদ্মা নদীতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব আড়িয়াল খাঁসহ দক্ষিণাঞ্চলের বহু নদী পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অধ্যাপক নজরুল ইসলামের মতে, মেঘনা অববাহিকা এবং উপকূলীয় অঞ্চলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে লবণাক্ততার বিস্তার, বদ্বীপ অঞ্চলের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা এবং পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। অথচ এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, কেবল ব্যারাজের মাধ্যমে পানির স্তর বৃদ্ধি করলেই কি নদীর শাখা-প্রশাখাগুলোতে কাঙ্ক্ষিত প্রবাহ নিশ্চিত হবে? তাঁর মতে, নদীর মুখগুলো যদি বিভিন্ন বাধার কারণে বন্ধ বা সংকুচিত অবস্থায় থাকে, তাহলে পানি স্তর বাড়ালেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া নাও যেতে পারে।
পলি জমার বিষয়টিকেও তিনি বড় উদ্বেগ হিসেবে দেখছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, উজানে বিভিন্ন বাঁধ ও ব্যারাজ নির্মাণের পরও গঙ্গা নদী বিপুল পরিমাণ পলি বাংলাদেশে বহন করে আনে। নতুন ব্যারাজ নির্মাণের ফলে এই পলি ব্যবস্থাপনা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। এতে নদীতল উঁচু হওয়া, তীরভাঙন বৃদ্ধি এবং বন্যার ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এসব কারণে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগে আরও গভীর পর্যালোচনা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তাঁর সুপারিশ হলো, পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা প্রতিবেদন জনসাধারণের জন্য প্রকাশ করা, জাতীয় পর্যায়ে উন্মুক্ত আলোচনা আয়োজন করা এবং ভিন্নমতকে গুরুত্ব দেওয়া।
পাশাপাশি তিনি দেশের নদীগুলোকে সব ধরনের কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা থেকে মুক্ত করার ওপর জোর দেন। তাঁর মতে, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা গেলে বর্ষার পানি নিজেই পলি সরিয়ে নাব্যতা বাড়াবে এবং জলাবদ্ধতার মতো সমস্যাও অনেকাংশে কমে যাবে।
তিনি আরও মনে করেন, গঙ্গার শুষ্ক মৌসুমের পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে। সামনের বছরগুলোতে গঙ্গা পানি বণ্টন ইস্যু আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে তিনি মনে করেন।
সব মিলিয়ে, দেশের অন্যতম ব্যয়বহুল পানি প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত গঙ্গা বা পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে এখনো বহু প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যায়নি। প্রকল্পের সম্ভাব্য সুফল ও ঝুঁকি নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলার আগে বাস্তবায়নে অগ্রসর হওয়া উচিত কি না, সেই বিতর্কই এখন নতুন করে সামনে এসেছে।

