ঢাকা শহরে ব্যাটারিচালিত রিকশা ঘিরে গড়ে ওঠা অনানুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ও অর্থ আদায়ের নেটওয়ার্ক সরকার পরিবর্তনের পরও পুরোপুরি ভাঙেনি বলে এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এই খাতে দৈনন্দিন কোটি কোটি টাকার অনিয়মিত লেনদেন ও চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক বলয় সক্রিয় থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের সংখ্যা কয়েক বছরে দ্রুত বেড়েছে। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী এখন এই সংখ্যা ২০ লাখের বেশি হতে পারে, যেখানে কয়েক বছর আগেও তা প্রায় অর্ধেক ছিল। দ্রুত এই বিস্তারের পেছনে রয়েছে কম খরচে আয়ের সুযোগ, কিন্তু একই সঙ্গে তৈরি হয়েছে নিয়ন্ত্রণহীন একটি কাঠামো।
এই কাঠামোর মধ্যে গ্যারেজ মালিক, লাইনম্যান, স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী এবং বিভিন্ন পর্যায়ের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। চালকদের অভিযোগ, তারা নিয়মিতভাবে বিভিন্ন নামে দৈনিক বা মাসিক অর্থ দিতে বাধ্য হন। এর বিনিময়ে কিছুটা হলেও রাস্তায় চলাচলের সুযোগ মেলে।
অনেক চালক জানান, ভিআইপি সড়কসহ প্রধান সড়কে চলাচল নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে তা পুরোপুরি কার্যকর নয়। ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে ‘সমঝোতা’ বা জরিমানার নামে অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ডাম্পিংয়ে আটকানো রিকশা ছাড়াতে বড় অঙ্কের খরচ হয় বলে চালকদের দাবি।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, এই খাতে একটি বহুস্তরীয় অর্থনৈতিক চক্র কাজ করছে। নিচের স্তরে রয়েছে চালকরা, মাঝখানে গ্যারেজ মালিক ও লাইনম্যান এবং উপরের স্তরে রয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী। এই কাঠামোর মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতবদল হয় বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করেছে।
গ্যারেজ ও চার্জিং পয়েন্টগুলোকে এই ব্যবস্থার কেন্দ্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখানে টোকেন, স্টিকার বা পরিচয়পত্রের মতো ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। চালকদের অভিযোগ, নির্দিষ্ট টোকেন না থাকলে তাদের হয়রানি, জরিমানা বা রিকশা আটকের ঝুঁকিতে পড়তে হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত জনবান্ধব গণপরিবহনের ঘাটতি এই অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করেছে। ফলে একটি সমান্তরাল অর্থনীতি গড়ে উঠেছে, যা আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার বাইরে থেকেও কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
এ বিষয়ে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন বলছে, এই খাতের ওপর নির্ভর করে দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে। তবে তাদের অভিযোগ, এই ব্যবস্থার কারণে শ্রমিকরা প্রায়ই শোষণ, চাপ এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন।
কিছু চালক জানিয়েছেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নিয়ন্ত্রণকারীদের চেহারা বা গোষ্ঠী বদলালেও অর্থ আদায়ের ধরনে বড় পরিবর্তন হয়নি। শুধু নিয়ন্ত্রণের হাতবদল হয়েছে, কাঠামো একই রয়ে গেছে।
অন্যদিকে, কিছু স্থানীয় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পর্যায়ের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগ নিয়ে সরাসরি প্রমাণ পাওয়া কঠিন, তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় একটি নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামোর উপস্থিতি বিভিন্ন পক্ষই স্বীকার করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা এখন শুধু পরিবহন নয়, একটি নগর অর্থনীতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু নীতিমালা, নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো না থাকায় এটি অনানুষ্ঠানিক খাত হিসেবেই রয়ে গেছে।
তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সমাধান না হলে এই ধরনের সিন্ডিকেট নির্ভর ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে এবং নগর ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়াবে। তারা পরিকল্পিত নগর পরিবহন, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং স্বচ্ছ লাইসেন্সিং ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়েছেন।
সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, ঢাকার ব্যাটারিচালিত রিকশা খাত এখন একদিকে জীবিকার বড় উৎস, অন্যদিকে নগর ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার পরিবর্তন হলেও এই খাতের নিয়ন্ত্রণ কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন না আসায় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—এই অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি কতদিন এভাবে চলবে।

