জাতীয় সংসদে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার পেছনের একাধিক কারণ তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানিয়েছেন, অর্থনৈতিক চাপ, বিনিয়োগে ধীরগতি, আমদানি–রপ্তানি কমে যাওয়া এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনজনিত অস্থিরতা রাজস্ব ঘাটতির প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে।
সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, চলতি ও গত অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জন ব্যাহত হয়েছে নানা অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত কারণে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরগতি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকার কিছু বেশি। অন্যদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা, তবে এপ্রিল পর্যন্ত লক্ষ্য অনুযায়ী অগ্রগতি হয়নি।
অর্থমন্ত্রী জানান, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের কারণে অর্থনীতিতে সাময়িক স্থবিরতা তৈরি হয়। এর ফলে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয় এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমে গতি কমে যায়। উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থায় এই প্রভাব সরাসরি কর আদায়ে পড়ে।
তিনি আরও বলেন, বিনিয়োগে মন্দা, শিল্প উৎপাদন কমে যাওয়া, অনেক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং আমদানি–রপ্তানিতে পতন রাজস্ব আয়ের ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে। কিছু ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসও কর আহরণ কমিয়ে দিয়েছে।
সংসদে তুলে ধরা তথ্যে বলা হয়, কিছু নির্দিষ্ট পণ্যের আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, বিশেষ করে উচ্চ শুল্কহারযুক্ত পণ্যের ক্ষেত্রে এই হ্রাস আরও বেশি। জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যে কর ছাড় এবং নীতিগত পরিবর্তনও রাজস্ব প্রবাহ কমানোর একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
অর্থমন্ত্রী আরও জানান, ব্যবসা ও সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন ঘটায় অনেক প্রতিষ্ঠান নিয়মিত কর পরিশোধ করতে পারেনি। একই সঙ্গে মূসক ও সম্পূরক শুল্ক প্রদানকারী বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় রাজস্ব আয় কমে যায়।
তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরে কিছু কাঠামোগত সংস্কার ও অটোমেশন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। কর ফাঁকি রোধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে, যার ফলে বছরের শেষ ভাগে কিছুটা উন্নতির আশা করা হচ্ছে।
সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সঞ্চয়পত্রসহ বিভিন্ন মাধ্যমে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একই সঙ্গে ট্রেজারি বিল, বন্ড এবং ইসলামিক সুকুকের মাধ্যমে গৃহীত ঋণের পরিমাণও বড় অঙ্কে দাঁড়িয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আরও জানান, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক তিনটি তহবিল থেকে অর্থ সহায়তা পাচ্ছে। এসব উৎস থেকে এখন পর্যন্ত কয়েকশ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পাওয়া গেছে, যা বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজস্ব ঘাটতির মূল কারণ শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং কাঠামোগত দুর্বলতাও এতে ভূমিকা রাখছে। তাদের মতে, কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং আমদানি–রপ্তানিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা ছাড়া এই ঘাটতি কমানো কঠিন হবে।
সব মিলিয়ে সংসদে অর্থমন্ত্রীর দেওয়া ব্যাখ্যায় স্পষ্ট হয়েছে যে, একাধিক অর্থনৈতিক ও নীতিগত কারণে দেশের রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

