জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে রাজধানীতে আয়োজিত এক বিক্ষোভ সমাবেশে সরকারের বিরুদ্ধে কড়া সমালোচনা করেছেন একজন শ্রমিক নেতা। তাঁর অভিযোগ, সরকার একদিকে জনগণকে দুই হাজার টাকার ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, আর অন্যদিকে বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে সেই একই জনগণের পকেট থেকে প্রকৃতপক্ষে দশ হাজার টাকার বেশি কেটে নেওয়ার ব্যবস্থা করছে।
রোববার বেলা ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে এই মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে পরিবহন শ্রমিকদের একটি জাতীয় সংগঠন। সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শ্রমিক কল্যাণমূলক একটি ফেডারেশনের সভাপতি বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত সাত মাসে তিনবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষ, শ্রমিক ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর ওপর। তাঁর ভাষায়, এতে তাঁদের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন পরিবহন শ্রমিকদের সংগঠনের সভাপতি, এবং এ সময় সংগঠনের অন্য কেন্দ্রীয় নেতারাও বক্তব্য রাখেন।
সরকারের সমালোচনা করে ওই শ্রমিক নেতা বলেন, মাত্র সাত মাস ক্ষমতায় থাকার যুক্তি দিয়ে জনগণের স্বার্থবিরোধী একের পর এক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। জ্বালানি তেলের দাম কেন বাড়ানো হলো এবং কার স্বার্থে বাড়ানো হলো, তার স্পষ্ট জবাব সরকারকে জনগণের কাছে দিতে হবে বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, নির্বাচনের আগে জনগণকে ফ্যামিলি কার্ড এবং কৃষকদের কৃষক কার্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সরকার জনগণের মৌলিক সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তাঁর মন্তব্য, দুই হাজার টাকার ফ্যামিলি কার্ডের আড়ালে আসলে জনগণের পকেট থেকে দশ হাজার টাকা কেটে নেওয়ার একটি কৌশল বাস্তবায়ন করা হচ্ছে—দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানির দাম বাড়িয়ে সামান্য সহায়তার বিপরীতে জনগণের ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
কৃষি খাতে এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের কৃষিকাজে ডিজেলের ব্যবহার ব্যাপক, বিশেষ করে সেচ ও পরিবহনে। ডিজেলের দাম বাড়লে কৃষির উৎপাদন খরচ সরাসরি বেড়ে যায়, যা কৃষকের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে এবং শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব গিয়ে পড়ে সাধারণ ভোক্তার ওপরও। তিনি সতর্ক করেন, উৎপাদন খরচ বাড়লেও কৃষক যদি তাঁর ফসলের ন্যায্য মূল্য না পান, তাহলে ধীরে ধীরে কৃষিকাজের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁর দাবি অনুযায়ী, শুধু ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণেই কৃষকদের প্রতিবছর কয়েক হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করতে হতে পারে।
কৃষিতে সারের সংকট নিয়েও সরকারের কড়া সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, একদিকে কৃষকদের জন্য বিশেষ কার্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, আবার অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সার বিক্রির ডিলারশিপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে সার নিয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে ওঠা এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া ‘সাত মাসের শিশু’ সংক্রান্ত বক্তব্যের কড়া জবাব দিতে গিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ কখনো কোনো শিশুর হাতে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেয়নি। যদি নিজেদের শিশু বলেই বর্ণনা করা হয়, তাহলে সেই যুক্তিতে ক্ষমতায় আসার প্রশ্নটিও সামনে আসে বলে তিনি প্রশ্ন তোলেন। তাঁর মতে, জনগণ সরকারকে একটি নির্দিষ্ট ম্যান্ডেট দিয়েছে, এবং সেই ম্যান্ডেটের অর্থ হলো জনগণের অধিকার ও সমস্যাগুলোর প্রতি জবাবদিহি নিশ্চিত করা। দীর্ঘদিন ধরে জনগণের সমস্যাকে উপেক্ষা করে সরকার চালানো সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
জ্বালানি তেলের দাম অবিলম্বে কমানোর দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে থাকলে তার সুফল অবশ্যই দেশের জনগণকে দেওয়া উচিত, এবং এ জন্য অবিলম্বে দেশের বাজারেও তেলের দাম কমানো প্রয়োজন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে রিকশাচালক, পরিবহন শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, হোটেল কর্মচারী, দোকান কর্মচারী এবং পোশাকশ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে গেছে, কিন্তু তাঁদের আয় সেই তুলনায় বাড়েনি।
সমাবেশ থেকে জ্বালানি তেলের দাম কমানো, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আনা, দুর্নীতি ও দলীয়করণ বন্ধ করা এবং শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রার মান বিবেচনায় নেওয়ার দাবি তোলা হয়। শ্রমিক নেতা সতর্ক করে বলেন, দরিদ্র মানুষের ওপর এমন চাপ চলতে থাকলে তাঁরা রাস্তায় নামতে বাধ্য হবেন, এবং দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণাও দেন তিনি।

