নিজের চোখের সামনে ছেলের বন্ধুকে বজ্রপাতে মরতে দেখার শোক থেকে এক অসাধারণ উদ্যোগ নিয়েছেন চট্টগ্রামের আনোয়ারার আবদুল ছবুর। বজ্রপাতে প্রাণহানি ঠেকাতে তিনি এ পর্যন্ত ২১ হাজার তালবীজ রোপণ করেছেন। পুরো খরচ নিজের পকেট থেকে মেটাচ্ছেন। লক্ষ্য ৩০ হাজার বীজ লাগানো। একসময় এলাকার অনেকে তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করলেও এখন তরুণেরাই তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন।
আবদুল ছবুরের বয়স প্রায় ৪০ বছর। বাড়ি আনোয়ারা উপজেলার উপকূলীয় রায়পুর ইউনিয়নের গহিরা এলাকায়। চট্টগ্রাম নগরে তাঁর একটি মোটর ওয়ার্কশপ আছে। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। সংসারে আছেন স্ত্রী ও তিন ছেলে। অর্থাৎ তিনি কোনো বিত্তবান ব্যক্তি নন, নিজের উপার্জনের একটি অংশই এই কাজে ব্যয় করছেন।
এই উদ্যোগের সূচনা হয়েছিল একটি বিয়োগান্ত ঘটনা থেকে। ২০২১ সালের ১৫ অক্টোবর বিকেলে সমুদ্রসৈকতে ফুটবল খেলছিল একদল কিশোর। এর মধ্যে ছিল ছবুরের ছেলেও। হঠাৎ দমকা হাওয়া ও বৃষ্টি শুরু হলে ছেলেকে আনতে সৈকতে যান তিনি। সেখানেই তাঁর চোখের সামনে বজ্রপাতে মারা যায় ছেলের বন্ধু ফোরকান। ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যায় তাঁর ছেলে।
ছবুর বলেন, ওই ঘটনার পর তিনি ও তাঁর ছেলে দুজনই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। ফোরকানের মৃত্যুর দৃশ্য কিছুতেই ভুলতে পারছিলেন না তিনি। তখন থেকেই বজ্রপাত নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। একপর্যায়ে জানতে পারেন, তালগাছ বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক। সেখান থেকেই সিদ্ধান্ত নেন, নিজের ইউনিয়নের প্রতিটি সড়কের পাশে তালবীজ লাগাবেন। গত বছর থেকে কাজটি শুরু করেছেন তিনি।
গত রোববার বিকেলে রায়পুরের দোভাষী বাজার থেকে বাইন্যার দিঘি সড়কে গিয়ে দেখা যায়, তিনি তালবীজ রোপণে ব্যস্ত। তাঁর সঙ্গে ছিলেন এলাকার প্রায় আটজন স্বেচ্ছাসেবী। কেউ মাটিতে গর্ত খুঁড়ছিলেন, কেউ বীজ বসাচ্ছিলেন। একজন মানুষের একক ভাবনা এভাবেই একটি ছোট সামাজিক উদ্যোগে রূপ নিয়েছে।
বীজ সংগ্রহ থেকে রোপণ পর্যন্ত সব খরচ ছবুর নিজেই বহন করেন। তিনি চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন ফলের আড়ত এবং গাজীপুরের কয়েকটি নার্সারি থেকে বীজ কেনেন। প্রতিটি বীজের দাম পড়ে তিন থেকে পাঁচ টাকা। হাজার হাজার বীজের হিসাবে এটি বড় অঙ্কের খরচ, যা একজন সাধারণ ব্যবসায়ীর জন্য কম নয়।
গত বছর তিনি চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন আড়ত থেকে ১৩ হাজার বীজ কিনে লাগান। কিন্তু রোপণের সঠিক নিয়ম জানা না থাকায় প্রায় অর্ধেক বীজ থেকে চারা গজায়নি। ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এ বছর তিনি সঠিক পদ্ধতিতে বীজ লাগানোর চেষ্টা করছেন। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে কাজ শুরু করে এর মধ্যে আট হাজার বীজ রোপণ করেছেন। গত বছরের ১৩ হাজার ও এ বছরের আট হাজার মিলিয়ে মোট রোপণের সংখ্যা এখন ২১ হাজার।
এখানে একটি বিষয় লক্ষ করার মতো। উদ্যোগ যত আন্তরিকই হোক, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ছাড়া তা পুরো ফল দেয় না। বীজ ঠিকমতো না গজানো তারই উদাহরণ। কৃষি বিভাগ বা স্থানীয় প্রশাসন যদি এ ধরনের উদ্যোক্তাকে কারিগরি পরামর্শ দেয়, তাহলে একই খরচে অনেক বেশি চারা বেঁচে থাকবে।
ছবুরের ভাবনা শুধু তালগাছেই থেমে নেই। তিনি জানান, চলতি বছর রায়পুর ইউনিয়নে তালগাছের পাশাপাশি ঔষধি গাছও লাগাবেন। শুরুর দিকের কথা মনে করে তিনি বলেন, তখন অনেকে অনেক কথা বলত। এখন এলাকার তরুণ ও কিশোরেরাও সহায়তা করছে। সব খরচ নিজে বহন করে হলেও এ ধরনের উদ্যোগ চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান তিনি।
ছবুরের এই কাজকে প্রশংসা করেছেন স্থানীয় কর্মকর্তারা। আনোয়ারা উপজেলার উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা সরওয়ার আলম বলেন, বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে তালগাছ বিশেষভাবে কার্যকর। তাঁর মতে, তালগাছ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই সড়কের পাশে ও এলাকায় যত বেশি তালগাছ লাগানো যায়, ততই ভালো।
আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মহিন উদ্দিনও উদ্যোগটির প্রশংসা করেন। তিনি একে একটি অসাধারণ কাজ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, পরিবেশের পাশাপাশি জীবন রক্ষায়ও তালগাছের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। ভালো কাজে সবাই এগিয়ে এলে সমাজে পরিবর্তন আসবেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তবে এ নিয়ে বিশেষজ্ঞের মত কিছুটা সতর্ক। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক অলক পাল বলেন, তালগাছ বজ্রপাত নিরোধে কার্যকর, এটি বৈজ্ঞানিকভাবে খুব বেশি প্রমাণিত নয়। তবে এর উচ্চতা ও গঠনের কারণে একে বজ্রপাত নিরোধে সহায়ক বলে মনে করা হয়। তাঁর পর্যবেক্ষণে, সাধারণত সড়কের ধারে তালগাছ লাগানো হয়। বৃষ্টি বা বজ্রপাতের লক্ষণ দেখা দিলে মানুষ সেখানে আশ্রয় নিতে পারে। যেসব এলাকায় তালগাছ আছে, সেখানে বজ্রপাতে মৃত্যু কম হতে দেখা যায়। এ কারণে প্রাকৃতিকভাবে এটি সহায়ক ভূমিকা রাখে বলে তিনি মনে করেন।
এই বক্তব্য থেকে দুটি বিষয় পরিষ্কার হয়। প্রথমত, তালগাছ বজ্রপাত ঠেকিয়ে দেয়, এমন দাবির পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো নেই। দ্বিতীয়ত, গাছের উচ্চতার কারণে এটি বজ্রপাতের একটি প্রাকৃতিক গ্রহণকেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে পারে, যা বসতির ওপর আঘাতের ঝুঁকি কিছুটা কমাতে পারে। তাই একে একমাত্র সমাধান না ভেবে বহুমুখী প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখাই বাস্তবসম্মত।
এখানে একটি নিরাপত্তার কথা মনে রাখা জরুরি। বজ্রপাতের সময় খোলা জায়গায় একা দাঁড়ানো উঁচু গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া সাধারণভাবে বিপজ্জনক বলে বিবেচিত হয়। তাই গাছ লাগানোর পাশাপাশি বজ্রপাত থেকে নিরাপদ থাকার সচেতনতাও দরকার। যেমন ঝড়-বৃষ্টির লক্ষণ দেখলে পাকা ভবনে আশ্রয় নেওয়া, খোলা মাঠ বা জলাশয় থেকে সরে আসা এবং বজ্রপাতের সময় ধাতব জিনিস থেকে দূরে থাকা। উপকূলীয় এলাকায় যেখানে খোলা প্রান্তর ও সৈকত বেশি, সেখানে এই সচেতনতা আরও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে বজ্রপাত এখন একটি গুরুতর প্রাকৃতিক দুর্যোগ। প্রতিবছর বহু মানুষ প্রাণ হারান, যাঁদের একটি বড় অংশ কৃষক ও খোলা জায়গায় কাজ করা মানুষ। এ অবস্থায় সরকারি উদ্যোগ ও আগাম সতর্কতার পাশাপাশি এমন ব্যক্তিগত ও সামাজিক পদক্ষেপ গুরুত্ব বহন করে। ছবুরের উদ্যোগ দেখিয়েছে, ব্যক্তিগত শোক চাইলে সমষ্টির কল্যাণের শক্তিতে রূপ নিতে পারে।
সব মিলিয়ে ছবুরের কাজটি শুধু গাছ লাগানোর গল্প নয়। এটি একজন বাবার অসহায়ত্ব থেকে দায়িত্ববোধে উত্তরণের গল্প, যেখানে একটি মৃত্যুর স্মৃতি হাজারো তালগাছের সম্ভাবনায় বদলে যাচ্ছে। এখন প্রয়োজন এই উদ্যোগকে বৈজ্ঞানিক পরামর্শ, প্রশাসনিক সহায়তা ও স্থানীয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে আরও টেকসই করা। তাহলে ৩০ হাজার তালগাছের এই সবুজ সারি আগামী দিনে রায়পুরের মানুষের জন্য একটি বাড়তি নিরাপত্তার ছায়া হয়ে উঠতে পারে।

