জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি মন্ত্রীর পুরোনো দুর্নীতি মামলা, সম্পদবৃদ্ধি ও সন্তানদের বিদেশে পড়াশোনার ব্যয়ের প্রসঙ্গ টেনে স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশের দাবি জানান। একই সঙ্গে তিনি সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যাংক হিসাব তলবের প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এখন পর্যন্ত এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
হাসনাত আবদুল্লাহ এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠকের দায়িত্বেও আছেন। শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে নিজের যাচাইকৃত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে তিনি দীর্ঘ একটি পোস্ট দেন। সেখানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের অতীত মামলা ও সম্পদের হিসাব নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন তোলেন তিনি। পোস্টে তিনি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিষয়টি খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান।
পোস্টে হাসনাত উল্লেখ করেন, ২০০৭ সালে এক কোটি টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে সালাহউদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা করে। তাঁর দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে ঢাকার বিশেষ আদালত ওই মামলায় সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। একই সঙ্গে এক কোটি টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা অনাদায়ে আরও এক বছরের কারাদণ্ডের আদেশ ছিল। ঘুষের টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশও দেওয়া হয়। অভিযোগ ছিল, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর আকতার হোসেন লিমিটেডের মালিক মীর জহির হোসেনের কাছ থেকে সরকারি কাজের সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে এই অর্থ নেওয়া হয়েছিল।
হাসনাতের দাবি, ২০০৮ সালে আরেকটি দুর্নীতি মামলায় সালাহউদ্দিনের মোট ১৩ বছরের সাজা হয়। অবৈধভাবে চার কোটি টাকার সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে ১০ বছর ও ৩ বছরের দুটি সাজা মিলিয়ে এই মেয়াদ দাঁড়ায়। এ ছাড়া চকরিয়ায় মাছের ঘের দখলের দুটি মামলাও ছিল। হাসনাত বলেন, বিএনপি ক্ষমতা ছাড়ার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭ সালে মামলাগুলো হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ঘের দখলের দুটি মামলা থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সালাহউদ্দিন খালাস পান। ওই রায়ের পর তিনি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে দাবি করেছিলেন।
হাসনাতের মতে, বিএনপির বর্তমানের অনেক মন্ত্রীই অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুর্নীতির মামলা থেকে খালাস পেয়েছেন। তাঁরা তখন দুদকের মামলাকে রাজনৈতিক হয়রানি বলে দাবি করতেন। অথচ এখন বিএনপির শাসনামলে দুদকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অন্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এ প্রসঙ্গে তিনি বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) মাধ্যমে সালমান মুক্তাদিরের ব্যাংক হিসাব চাওয়ার উদাহরণ টানেন। হাসনাত বলেন, রাষ্ট্র যে কারও ব্যাংক হিসাব চাইতেই পারে। কিন্তু সরকারের বিরুদ্ধে কথা বললে হিসাব তলব করা হলে তা উদ্বেগজনক। তিনি দাবি করেন, রাষ্ট্রীয় কল্যাণের জন্যই যদি এ ধরনের তলব হয়, তাহলে প্রত্যেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীর ব্যাংক হিসাব তলব করা হোক।
সম্পদের হিসাব নিয়ে হাসনাত নির্বাচনী হলফনামার তথ্য উল্লেখ করেন। তাঁর বর্ণনায়, প্রায় ২০ বছর আগে সালাহউদ্দিন গুলশানের অন্যতম দামি আবাসন প্রকল্প প্লাটিনাম রেসিডেন্সে একটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টের মালিক হন। গুলশানে তাঁর আরও বাড়ি ও সম্পদ আছে বলেও আলোচনা রয়েছে। সাজার কারণে ২০০৮ সালে সালাহউদ্দিন নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি, তাঁর স্ত্রী হাসিনা আহমদ প্রার্থী হন। হলফনামা অনুযায়ী, ওই বছর এই দম্পতির মোট সম্পদ ছিল ৬ দশমিক ৩ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে তা বেড়ে হয় ১২ দশমিক ৭ কোটি এবং ২০২৫ সালে ৩০ কোটি টাকা।
হাসনাতের প্রশ্ন, একজন সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন যিনি, তাঁর পক্ষে এত সম্পদ গড়া কীভাবে সম্ভব হলো। তাঁর দাবি, সালাহউদ্দিন ৮৫তম বিসিএস ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা ছিলেন। ১৯৯৬ সালে সিনিয়র সহকারী সচিব পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার সময় তাঁর মাসিক বেতন-ভাতা ছিল বড়জোর ৬ হাজার টাকা। হাসনাতের হিসাবে, মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় তা বর্তমানের ৪০ হাজার টাকার চেয়েও কম। তিনি আরও বলেন, ২০ বছর আগেও গুলশানে ফ্ল্যাটের দাম ছিল বর্গফুটপ্রতি অন্তত সাড়ে ৩ হাজার টাকা। সেই হিসাবে তিন হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাটের দাম তখনই কোটি টাকার বেশি ছিল।
হাসনাত আরও দাবি করেন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রতিমন্ত্রী থাকায় সালাহউদ্দিনের ব্যবসা করার সুযোগ ছিল না। পরের দুই বছর তিনি কারাগারে ছিলেন। এরপর বিএনপি বিরোধী দলে ছিল। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালেও দলটি বিরোধী দলে ছিল। তাই প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পরের কয়েক বছরে গুলশানে সম্পদের মালিক হওয়ার উৎস কী, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি।
সন্তানদের বিদেশে পড়াশোনার প্রসঙ্গও এনেছেন হাসনাত। তাঁর ভাষ্য, জানা যায়, সালাহউদ্দিনের সন্তানেরা পশ্চিমা উন্নত দেশে পড়াশোনা করেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে বিদেশে উচ্চশিক্ষার এই বিপুল ব্যয়ের অর্থের উৎস কী ছিল এবং তা বৈধভাবে বিদেশে কীভাবে পাঠানো হয়েছে, সে প্রশ্ন রাখেন তিনি। সম্পদের কতটা আয় থেকে, কতটা উত্তরাধিকারসূত্রে এবং কতটা বিনিয়োগ থেকে এসেছে, তার স্বচ্ছ ব্যাখ্যা আছে কি না, তা-ও জানতে চান। ঘোষিত আয়, সম্পদবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে অসামঞ্জস্য আছে কি না, তা জনস্বার্থে খতিয়ে দেখার দাবি করেন তিনি।
পোস্টের শেষ অংশে হাসনাত একটি প্রস্তাব দেন। তাঁর মতে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এমপি-মন্ত্রীদের নিকটাত্মীয় ও আত্মীয়স্বজনের ব্যাংক হিসাবও প্রতিবছর রাষ্ট্রীয় স্বার্থে তলব করা উচিত। তিনি বলেন, এই প্রক্রিয়া তাঁকে দিয়েই শুরু হোক। তিনি আরও উল্লেখ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা দায়িত্ব গ্রহণের আগে ও পরের সম্পদের হিসাব নিজেরাই প্রকাশ করে গেছেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সেই সৎ সাহস দেখাতে পারে কি না, সেটিই দেখার বিষয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এই পোস্টের কয়েকটি স্তর আলাদা করে দেখা দরকার। প্রথমত, পোস্টে উল্লিখিত সব তথ্য হাসনাতের নিজের বক্তব্য। এর স্বাধীন যাচাই এই প্রতিবেদনে নেই। মামলা, সাজা ও খালাসের বিবরণ আদালতের নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। কোনো অভিযোগই আদালতে প্রমাণিত না হলে তা অভিযোগই থাকে। আর যে মামলা থেকে কেউ খালাস পেয়েছেন, সে বিষয়ে আইনি অবস্থান ভিন্ন।
দ্বিতীয়ত, সম্পদের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তোলা জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহির একটি বৈধ অংশ। নির্বাচনী হলফনামা প্রকাশ্য দলিল। তাতে সম্পদ ৬ দশমিক ৩ কোটি থেকে ৩০ কোটিতে ওঠার তথ্য আছে। তবে সম্পদবৃদ্ধি মানেই অবৈধ আয় নয়। জমি-ফ্ল্যাটের মূল্যবৃদ্ধি, উত্তরাধিকার বা বৈধ ব্যবসা থেকেও তা হতে পারে। এ কারণেই স্বচ্ছ ব্যাখ্যা ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবির গুরুত্ব আছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জবাব ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সংগত নয়।
তৃতীয়ত, পোস্টের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নীতিগত দিক ব্যাংক হিসাব তলবের প্রশ্ন। হাসনাতের যুক্তি, রাষ্ট্র হিসাব চাইতে পারে, কিন্তু সরকারবিরোধী কণ্ঠের বিরুদ্ধে বেছে বেছে তা করা হলে সেটি উদ্বেগের। এ ধরনের অভিযোগ সত্য কি না, তা বলা কঠিন। তবে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ মানদণ্ড ছাড়া এমন তলব রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ধারণা তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে দুর্নীতি দমনের জন্য আর্থিক তথ্য যাচাই বৈধ ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া। তাই কোন মানদণ্ডে কার হিসাব চাওয়া হচ্ছে, তা প্রকাশ্য হওয়া জরুরি।
চতুর্থত, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও বিবেচ্য। হাসনাত বিরোধী শিবিরের নেতা, আর অভিযুক্ত পক্ষ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ফলে পোস্টটির রাজনৈতিক মাত্রা আছে, যদিও উত্থাপিত প্রশ্নগুলো জবাবদিহির বৃহত্তর আলোচনারই অংশ। হাসনাতের নিজের হিসাব প্রকাশের প্রস্তাবও আলোচনায় আসতে পারে। নিকটাত্মীয়দের ব্যাংক হিসাব প্রতিবছর তলবের প্রস্তাব বাস্তবায়নে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রশ্নও জড়িত। সেটি আইনি কাঠামো ও সুরক্ষা ছাড়া সম্ভব নয়।
এখন নজর থাকবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা তাঁর দল বিএনপির প্রতিক্রিয়ার দিকে। অভিযোগগুলোর তথ্যগত জবাব এলে বিতর্কের স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যাবে। দুদক বা অন্য কোনো সংস্থা বিষয়টি নিয়ে পদক্ষেপ নেয় কি না, সেটিও দেখার বিষয়। তবে তদন্ত শুরু হলেও তা কতটা নিরপেক্ষ হবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাবে। সবশেষে, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সম্পদের হিসাব নিয়মিত ও প্রকাশ্যে যাচাইয়ের একটি স্থায়ী ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলেই এ ধরনের বিতর্ক রাজনৈতিক তর্কের বদলে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির পথে এগোতে পারে।
সূত্র: ইত্তেফাক

