দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সরবরাহ ঘাটতি রয়েছে বাজারে। দাম বেড়ে দ্বিগুণের কাছাকাছি পর্যন্ত হয়েছে। তা–ও পাওয়া যাচ্ছে না এলপিজি সিলিন্ডার। দুই দফা দুর্ঘটনায় এক সপ্তাহ ধরে ঢাকায় ব্যাহত হচ্ছে প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ। রান্নার চুলা জ্বালাতে হিমশিম খাচ্ছে মানুষ। চাহিদার চেয়ে কম সরবরাহ পাওয়ায় এখন চুলা থেকে সিএনজির স্টেশন—সবখানেই সংকট।
চলমান এলপিজি সংকট নিয়ে গতকাল শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করেছে বাংলাদেশ এলপিজি অটো গ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, মাসে এলপিজির চাহিদা গড়ে ১ লাখ ৪০ হাজার টন। এর মধ্যে পরিবহন খাতে চাহিদা ১৫ হাজার টন। গত মাস থেকে তারা চাহিদার চেয়ে অনেক কম সরবরাহ পাচ্ছে। এতে অনেক গ্যাস স্টেশনের ব্যবসা বন্ধ হওয়ার পথে।

সংবাদ সম্মেলনে ‘এলপিজি সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পরিবহন খাতে’ শিরোনামে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, সারা দেশের পরিবহনব্যবস্থা, ভোক্তাস্বার্থ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে চলমান এলপিজি সংকট। সংকটের কারণে দেশের প্রায় সব এলপিজি অটো গ্যাস স্টেশন কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেড় লাখের বেশি এলপিজিচালিত গাড়ির ওপর। গাড়ির মালিক ও চালকেরা জ্বালানি না পেয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে ঘুরেও গ্যাস পাচ্ছেন না।
প্রায়ই গ্যাসের চাপ কম থাকে। তাই বিকল্প হিসেবে এলপিজির চুলা ব্যবহার করতে হয়। এখন লাইনে গ্যাস নেই, এলপিজি সিলিন্ডারও পাওয়া যাচ্ছে না। একদিন হোটেল থেকে এনে খেয়েছেন। গতকাল বাধ্য হয়ে বিদ্যুৎ–চালিত চুলা কিনেছেন।মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা কামরুন্নেছা রুহী

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের সভাপতি মো. সিরাজুল মাওলা। এ সময় সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো. হাসিন পারভেজ উপস্থিত ছিলেন। সংগঠনটি বলছে, যানবাহন খাতে মাত্র ১০ শতাংশ এলপিজি অটো গ্যাস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি পুরোপুরি সরবরাহ করা হচ্ছে না। প্রতি মাসে এ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে অনুরোধ করে তারা। বর্তমান পরিস্থিতিতে এলপিজি অটো গ্যাস স্টেশনের মালিকেরা চরম ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে রয়েছেন। দীর্ঘদিন গ্যাস স্টেশন বন্ধ থাকায় কর্মচারীদের বেতন, ব্যাংকঋণের কিস্তি এবং দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয় বহন করা তাঁদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। সংকট সমাধানে অবিলম্বে এলপিজি আমদানি স্বাভাবিক ও পর্যাপ্ত করার জন্য জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করার অনুরোধ করেছেন তাঁরা।
এলপিজির ৮০ শতাংশ ব্যবহার হয় রান্নার কাজে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় ১২ কেজির সিলিন্ডার। এর নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা। বাজারে এখন আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। যদিও এ দাম দিয়েও ভোক্তা সিলিন্ডার পাচ্ছে না। ইতিমধ্যে আমদানি বাড়াতে ব্যবসায়ীদের দাবি মেনে নিয়েছে সরকার। ব্যবসায়ীরা আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে সরবরাহ স্বাভাবিক হতে আরো দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা কামরুন্নেছা রুহী বলেন, প্রায়ই গ্যাসের চাপ কম থাকে। তাই বিকল্প হিসেবে এলপিজির চুলা ব্যবহার করতে হয়। এখন লাইনে গ্যাস নেই, এলপিজি সিলিন্ডারও পাওয়া যাচ্ছে না। একদিন হোটেল থেকে এনে খেয়েছেন। গতকাল বাধ্য হয়ে বিদ্যুৎ–চালিত চুলা কিনেছেন।
৪ জানুয়ারি আমিনবাজারে পাইপলাইন ছিদ্র হওয়ায় এক সপ্তাহ ধরে কম চাপে গ্যাস পাচ্ছে ঢাকাবাসী। এর মধ্যে গতকাল রাজধানীর মিরপুর রোডে গণভবনের সামনে পাইপলাইনে একটি ভালভ ফেটে গিয়ে ভোগান্তি বাড়ায়। মেরামতের জন্য আশপাশের আরও কয়েকটি ভালভ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ভাল্ভ দিয়ে পাইপলাইন গ্যাসের প্রবাহ নিশ্চিত করা হয়। প্রয়োজনে বাড়ানো বা কমানো যায়। এটি বিতরণ লাইনের বিভিন্ন নির্দিষ্ট পয়েন্টে থাকে।
গতকাল বিকেলে ক্ষতিগ্রস্ত ভালভ পরিবর্তন করে নতুন ভালভ বসানো হয়েছে। এরপর ওই এলাকার পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ শুরু করেছে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি। এরপর ধীরে ধীরে গ্যাসের চাপ বাড়তে শুরু করে বলে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছে তিতাস। দিনভর গ্যাসের মারাত্মক স্বল্পচাপ নিয়ে ভোগান্তিতে পড়েন ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, নিউমার্কেট, হাজারীবাগ, গাবতলীসহ সংলগ্ন এলাকার মানুষ।
তিতাস সূত্র বলছে, শীতের সময় তাপমাত্রার কারণে গ্যাসের চাপ কমে যায়। এর সঙ্গে দুর্ঘটনার কারণে সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। আমিনবাজারে পাইপলাইনের ছিদ্র মেরামত করা হলেও পাইপলাইনে ঢুকে যাওয়া পানি পুরোপুরি পরিষ্কার করা যায়নি। পানি বের করতে গ্যাসের প্রবাহ বাড়ানোর পর একটি ভালভ ফেটে যায়। পানি বের করতে আরও কয়েক দিন লাগতে পারে। এ ছাড়া আবাসিকে চাহিদামতো গ্যাস সরবরাহ করা হলেও অবৈধ সংযোগ বেড়ে যাওয়ার কারণে বৈধ গ্রাহকেরা গ্যাস পাচ্ছে না। শিল্পে অগ্রাধিকার থাকায় পরিবহন খাতের জন্য সিএনজি স্টেশনে সরবরাহ কমেছে।
মোট গ্যাস ব্যবহারের মাত্র ৫ শতাংশ ব্যবহার করে পরিবহন খাত। বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ফারহান নূর গতকাল বলেন, দীর্ঘ দিন ধরে চাহিদামতো গ্যাস পাচ্ছে না সিএনজি স্টেশন। কিছুদিন ধরে সরবরাহ আরও কমেছে। কম চাপ থাকায় গ্যাস নিতে একটি গাড়ির পাঁচ মিনিটের বদলে আধা ঘণ্টা লেগে যাচ্ছে। স্টেশনের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। সূত্র: প্রথম আলো

