নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৪ হাজারের বেশি সহকারী শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে তৎপর হয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশের মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই মৌখিক পরীক্ষার সূচি ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ২৮ জানুয়ারি থেকে মৌখিক পরীক্ষা শুরু হয়ে চলবে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এরপর নির্বাচনের আগেই, ১০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে।
এরই মধ্যে মৌখিক পরীক্ষা দ্রুত শেষ করতে প্রতিটি জেলায় একাধিক বোর্ড গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নির্বাচনের আগে প্রশাসনের ব্যস্ততম সময়েই এই নিয়োগ কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে।
সূত্র জানায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলা প্রশাসকেরা (ডিসি) গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। গত ২২ জানুয়ারি নির্বাচনী প্রচার শুরু হওয়ার পর থেকে তাঁদের ব্যস্ততা আরও বেড়েছে। অথচ সহকারী শিক্ষক নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষা বোর্ডের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন জেলা প্রশাসকরাই।
মৌখিক পরীক্ষার সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্বে থাকা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারাও নির্বাচনসংক্রান্ত নানা কাজে যুক্ত রয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র ১৫ দিন আগে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষক নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষা শুরু করা স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহের জন্ম দিচ্ছে। প্রতিটি আসনের নির্বাচনী পরিস্থিতি সামলাতে গিয়ে জেলা প্রশাসকদের দিন কাটছে। নির্বাচন ঘিরে নানা প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে তাঁদের। এমন অবস্থায় নিয়োগ কার্যক্রমে সময় দেওয়া কঠিন হবে। ফলে লিখিত পরীক্ষার মতো মৌখিক পরীক্ষাতেও অনিয়ম ও বাণিজ্যের গুঞ্জন ছড়াচ্ছে।
এ বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নুর মো. শামসুজ্জামান বলেন, আগামী ৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে মৌখিক পরীক্ষা শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। এ জন্য প্রতিটি জেলায় একাধিক বোর্ড গঠন করা হয়েছে। নির্বাচনের আগেই চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করতে চায় অধিদপ্তর। তিনি বলেন, জেলা প্রশাসকেরা নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পারেন। তাই বোর্ডে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বা সমপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাঁরা দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এবার সহকারী শিক্ষক নিয়োগে মৌখিক পরীক্ষার কাঠামোতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে ভাইভায় ২০ নম্বর থাকলেও এবার তা কমিয়ে ১০ নম্বর করা হয়েছে। একই সঙ্গে এবারই প্রথম মৌখিক পরীক্ষায় পাস ও ফেল যুক্ত করা হয়েছে। পরীক্ষাবোর্ডে প্রতিটি জেলায় অধিদপ্তরের একজন করে প্রতিনিধি যুক্ত করা হয়েছে, যা আগে ছিল না। অন্যদিকে চাকরিপ্রার্থীদের সার্টিফিকেটের জন্য কোনো নম্বর রাখা হয়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়োগ পরীক্ষায় এমন সিদ্ধান্ত বিরল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, পুরো বিষয়টি একটি বড় পরিকল্পনার অংশ। নির্বাচনকালীন সময়কে কাজে লাগাতে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, নির্বাচনের পর মৌখিক পরীক্ষা হলে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হতো। কারণ তখন অনেক কর্মকর্তা নিজ নিজ পদে নাও থাকতে পারেন। এখন সবার মনোযোগ নির্বাচনের দিকে। ফলে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম হলেও তা নজরে পড়ার সম্ভাবনা কম। এই সময়টাই বাণিজ্যের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। এরই মধ্যে অধিদপ্তরের একাধিক সিন্ডিকেট মাঠপর্যায়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
গত ৯ জানুয়ারি দেশের ৬১টি জেলায়, তিন পার্বত্য জেলা বাদে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রাজস্ব খাতভুক্ত সহকারী শিক্ষক নিয়োগ ২০২৫-এর লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ওই পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে ২১ জানুয়ারি মোট ৬৯ হাজার ২৬৫ জন প্রার্থীকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত করা হয়।
এই লিখিত পরীক্ষাকে ঘিরে ব্যাপক জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের চেষ্টা এবং ডিজিটাল প্রতারণার অভিযোগে সারা দেশে দুই শতাধিক পরীক্ষার্থী ও চক্রের সদস্যকে আটক করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। গাইবান্ধা, নওগাঁ, দিনাজপুর, রংপুর, কুড়িগ্রাম, চুয়াডাঙ্গা, জামালপুর ও ভোলাসহ বিভিন্ন জেলায় ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও প্রক্সি পরীক্ষার্থী ব্যবহারের অভিযোগে তাঁদের আটক ও কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে ব্লু-টুথ ডিভাইস, গোপন যোগাযোগ যন্ত্র ও নকল উদ্ধার করা হয়।
এবারের পরীক্ষায় আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি জালিয়াতি ধরা পড়ায় বিভিন্ন মহল থেকে পরীক্ষা বাতিলের দাবি ওঠে। কয়েক হাজার পরীক্ষার্থী প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ঘেরাও করে পরীক্ষা বাতিলের দাবি জানান। তবে এসব দাবিতে সাড়া না দিয়ে অধিদপ্তর দ্রুত লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ করে। একই ধারাবাহিকতায় মৌখিক পরীক্ষাও দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এরপর ২২ জানুয়ারি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নুর মো. শামসুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে মৌখিক পরীক্ষার সূচি প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষা ২৮ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জেলা পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হবে। যেসব জেলায় পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি, সেখানে একাধিক ইন্টারভিউ বোর্ড গঠন করা হবে।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, মৌখিক পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত প্রার্থীদের অনলাইনে আবেদনের আপলোডকৃত ছবি, আবেদনপত্রের কপি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি কর্তৃক প্রদত্ত নাগরিকত্ব সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র, লিখিত পরীক্ষার প্রবেশপত্র, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সত্যায়িত করে ২৭ জানুয়ারির মধ্যে নিজ নিজ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে জমা দিতে হবে। জমার সময় মূল কাগজপত্র দেখিয়ে প্রাপ্তি স্বীকারপত্র সংগ্রহ করতে হবে। মৌখিক পরীক্ষার তারিখ ও সময় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের ওয়েবসাইট ও নোটিশ বোর্ডে প্রকাশ করা হবে।

