সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশে এখন থেকে পরিকল্পনামন্ত্রীর অনুমোদনের অপেক্ষা করতে হবে না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মহাপরিচালক নিজেই সরাসরি তথ্য প্রকাশ করতে পারবেন।
পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ আশা করছেন, এতে পরিসংখ্যান নিয়ে কারসাজির পথ বন্ধ হবে। তবে অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান মনে করছেন, বিবিএস যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে, রাজনৈতিক প্রভাবের আশঙ্কা থাকবে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্প্রতি ‘পরিসংখ্যান প্রণয়ন, প্রকাশ ও সংরক্ষণ’ নীতিমালা জারি করেছে। নীতিমালা অনুযায়ী একটি বিধিমালা তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। অন্তর্বর্তী সরকার তাদের দায়িত্বের অবশিষ্ট সময়ে এটি উপদেষ্টা পরিষদের সভায় অনুমোদন দিতে চায়। পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, নতুন বিধিমালায় পরিসংখ্যান প্রকাশে সময় কম লাগবে। তথ্য সঠিক ও নির্ভুল হবে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপও থাকবে না।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে সব সময় পরিসংখ্যান কারসাজির অভিযোগ থাকে। জিডিপির প্রবৃদ্ধি বেশি দেখানো বা মূল্যস্ফীতি কম দেখানোর প্রবণতা থাকে। মন্ত্রীর কাছে জরিপ ও শুমারির প্রতিবেদন না পাঠালে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমবে এবং জনগণ সঠিক তথ্য জানতে পারবে।
বিবিএস পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা। ২০১৩ সালের পরিসংখ্যান আইন অনুযায়ী এর কাজ হলো জনশুমারি, কৃষিশুমারি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ শুমারি এবং অন্যান্য জরিপ গ্রহণ করা। এছাড়া মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি, ভোক্তার মূল্যসূচকসহ অন্যান্য সূচক প্রকাশ করাও বিবিএসের দায়িত্ব। মহাপরিচালক বা ডিজি সরকার নিয়োগ দেন। তিনি অতিরিক্ত সচিবের পদমর্যাদার।
এতদিন বিবিএস যেকোনো জরিপের তথ্য প্রকাশের আগে পরিকল্পনামন্ত্রীর অনুমোদন নিত। নতুন নীতিমালায় তা আর বাধ্যতামূলক নয়। এখন থেকে মূল্যস্ফীতি, জিডিপি প্রবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক শুমারি ও শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য বিবিএস মহাপরিচালক প্রকাশ করতে পারবেন। এতে পরিকল্পনামন্ত্রীর ক্ষমতা কমেছে। বিবিএসে ছয়টি শাখা রয়েছে—কৃষি, জনশুমারি, জনসংখ্যাতত্ত্ব ও স্বাস্থ্য, শিল্প, জাতীয় আয়-ব্যয় ও কম্পিউটার শাখা। এসব শাখার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট জরিপ ও শুমারি করা হয়।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, বিবিএস সঠিক ও নির্ভুল পরিসংখ্যান তৈরি, প্রকাশ ও সংরক্ষণের জন্য শাখাভিত্তিক ‘কারিগরি পরামর্শ কমিটি’ গঠন করবে। কৃষিভিত্তিক জরিপে ১৪ সদস্যের কমিটি হবে। এর প্রধান থাকবেন মহাপরিচালক। কমিটিতে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা থাকবেন, যেমন ব্র্যাক, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।
এই কমিটির মাধ্যমে পরিসংখ্যান যাচাই-বাছাই হবে এবং ডিজি তা প্রকাশ করবেন। পরিকল্পনামন্ত্রীর কাছে তথ্য পাঠাতে হবে না। এতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ হবে, সময় কম লাগবে এবং তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা বাড়বে। জনসংখ্যা ও স্বাস্থ্য সম্পর্কিত জরিপেও ১৩ সদস্যের কমিটি গঠন হবে। এ কমিটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পরিসংখ্যান গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, আইসিডিডিআরবি, পপুলেশন কাউন্সিল ও নিপোর্টের প্রতিনিধিরা থাকবেন। অন্যান্য শাখার জন্যও পৃথক কারিগরি কমিটি গঠন করা হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন, এখন থেকে জরিপ ও শুমারির ফল পরিকল্পনামন্ত্রীর কাছে না গেলে তথ্য প্রকাশে দ্রুততা আসবে এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকবে না।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, কাগজে-কলমে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ না থাকলেও বাস্তবে কী হচ্ছে তা বোঝা যাবে না। যতক্ষণ বিবিএসকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হবে না, ততক্ষণ রাজনৈতিক প্রভাবের আশঙ্কা থেকে যাবে।

