রাজধানীতে মশার উপদ্রব নতুন কিছু নয়, কিন্তু এবার পরিস্থিতি যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে। এক মাসের ব্যবধানে ঢাকায় মশার সংখ্যা ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এমনকি এক ঘণ্টায় একজন মানুষের শরীরে গড়ে ৮৫০টি মশা কামড়াতে আসছে—যা বিশ্বমান অনুযায়ী ভয়াবহ সতর্কবার্তা।
গত বুধবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে আদাবরের একটি বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে মশা তাড়াতে হাত-পা নাড়ছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী রাশেদুল ইসলাম। ঘরের ভেতরে কয়েল জ্বলছে, অ্যারোসল ছিটানো হয়েছে—তবু মশার আক্রমণ থামছে না। তিনি বলেন, সারাদিন কাজের পর একটু স্বস্তিতে বসার উপায় নেই। রাতে মশারির মধ্যেও ঢুকে পড়ে মশা।
তার আট বছরের সন্তানের হাত-পায়ে চুলকাতে গিয়ে ঘা হয়ে গেছে। কামড়ের দাগ ফুলে ওঠে, লাল হয়ে যায়। এমন চিত্র এখন অনেক পরিবারের।
গবেষণায় যা উঠে এসেছে
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারিতে মশার সংখ্যা ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশই কিউলেক্স প্রজাতির মশা। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, মার্চে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
বাংলাদেশে মূলত তিন ধরনের মশা বেশি দেখা যায়—কিউলেক্স, এডিস ও অ্যানোফিলিস। কিউলেক্সের কামড়ে ফাইলেরিয়া ও জাপানি এনসেফালাইটিস হতে পারে। যদিও দেশে এ রোগের প্রকোপ তুলনামূলক কম, তবু ঝুঁকি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী মোহাম্মদ শফিউল আলম জানান, জাপানি এনসেফালাইটিসে মৃত্যুহার প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। অতীতে রাজশাহী, রংপুর ও পার্বত্য অঞ্চলে এ রোগে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
লার্ভা থেকে প্রাপ্তবয়স্ক—সব পর্যায়েই বিস্তার
গবেষণায় দুইভাবে মশার ঘনত্ব পরিমাপ করা হয়েছে—লার্ভা গণনা এবং প্রাপ্তবয়স্ক মশার কামড়ের হার।
লার্ভা পরীক্ষায় বিভিন্ন জলাশয় থেকে ২৫০ মিলিলিটার পানি সংগ্রহ করে তাতে লার্ভার সংখ্যা গণনা করা হয়। জানুয়ারিতে গড়ে ৮৫০টি লার্ভা পাওয়া গেলেও ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১,২৫০টিতে।
প্রাপ্তবয়স্ক মশা গণনার পদ্ধতিও ছিল চমকপ্রদ। একজন মানুষের হাঁটু পর্যন্ত পা ও বাহু উন্মুক্ত রেখে এক ঘণ্টায় কতটি মশা কামড়াতে আসে, তা গণনা করা হয়। জানুয়ারিতে সংখ্যা ছিল ৪০০ থেকে ৬০০। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে গড়ে ৮৫০-এ পৌঁছেছে।
অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, বিশ্বমানে এক ঘণ্টায় পাঁচটি মশা কামড়াতে এলেও তা বেশি ধরা হয়। সেখানে ঢাকায় ৮৫০টি—এটি নিছক সংখ্যা নয়, স্পষ্ট বিপৎসংকেত।
নির্দিষ্ট এলাকায় বেশি উপদ্রব
রাজধানীর সব এলাকায় সমানভাবে মশা নেই। কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, শনির আখড়া, শ্যামপুর, রায়েরবাজার, উত্তরা এবং সাভার এলাকায় লার্ভা ও প্রাপ্তবয়স্ক মশার ঘনত্ব বেশি। শাহবাগ ও পরীবাগ এলাকায় তুলনামূলক কম।
ডিএনসিসি ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ১৬ থেকে ২০ জানুয়ারি পাঁচ এলাকায় ১৭,১৫৯টি মশা ধরা পড়ে। ৩০ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত একই এলাকায় সংখ্যা বেড়ে হয় ২২,৩৬২।
কেন বাড়ছে কিউলেক্স?
বিশেষজ্ঞদের মতে, আবহাওয়া ও দূষণ—এই দুই প্রধান কারণে কিউলেক্সের বিস্তার বেড়েছে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক জি এম সাইফুর রহমান বলেন, আগে মার্চের মাঝামাঝি থেকে কিউলেক্স বাড়ত। কিন্তু এবার ফেব্রুয়ারি থেকেই তা বেড়েছে এবং কালবৈশাখ পর্যন্ত থাকতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। সর্বনিম্ন ০.৪ ডিগ্রি এবং গড় তাপমাত্রা ০.৮ ডিগ্রি বেশি ছিল। এই তাপমাত্রা বৃদ্ধিই মশার জীবনচক্র দ্রুততর করেছে।
তাপমাত্রা বাড়লে মশার শরীরে হরমোন ও এনজাইমের কার্যকারিতা বেড়ে যায়। ফলে তারা দ্রুত ডিম পাড়ে এবং রক্তপানের চাহিদা বাড়ে। বদ্ধ জলাশয়, নর্দমা ও আবর্জনা কিউলেক্সের প্রধান প্রজননক্ষেত্র।
ব্যবস্থাপনায় জটিলতা
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রায় আট হাজার বিঘা জলাশয় রয়েছে, যা মশার বড় উৎপত্তিস্থল। ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, একবার পরিষ্কার করলেও দ্রুত আবার আবর্জনায় ভরে যায়। খোলা নর্দমা ও স্থায়ী জলাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
এছাড়া সিটি করপোরেশনে জনপ্রতিনিধির অভাবেও মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি ব্যাহত হচ্ছে। অনেক জলাশয়ে মাছের চাষ হয়, যেখানে সিটি করপোরেশন সরাসরি কাজ করতে পারে না।
তিনি বলেন, জনপ্রতিনিধিরা স্থানীয় মানুষকে বোঝাতে পারতেন। সরকারি কর্মকর্তাদের চেষ্টার ঘাটতি নেই, কিন্তু সব ক্ষেত্রে জনগণকে সম্পৃক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, মার্চে মশার প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। শীত দ্রুত বিদায় নেওয়া, দূষণ নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি এবং ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে রাজধানী এখন কিউলেক্সের বিস্তারের অনুকূল পরিবেশে দাঁড়িয়ে।
এক ঘণ্টায় ৮৫০টি কামড়—এটি কেবল অস্বস্তির বিষয় নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্য স্পষ্ট সতর্কবার্তা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী মাসগুলোতে ঢাকাবাসীর দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।

