হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উন্মুক্ত স্থানে পড়ে রয়েছে বিপুল পরিমাণ আমদানি করা পণ্য। কার্গো ভিলেজের ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে এসব পণ্য বিমানবন্দরের রানওয়ে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। অধিকাংশ পণ্যই তৈরি পোশাক খাতের কাঁচামাল ও স্যাম্পল। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সদস্য কারখানাগুলোকে দ্রুত পণ্য খালাস করার অনুরোধ জানিয়েছে তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএ।
গত বছরের ১৮ অক্টোবর বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে আমদানি করা পণ্যসহ গুদামের বড় অংশ পুড়ে যায়। আগুনের পর বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর যৌথ উদ্যোগে জরুরি ভিত্তিতে আমদানি পণ্য সংরক্ষণের জন্য অস্থায়ী তাঁবু স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি ভাড়া-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে সেই তাঁবুগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ফলে এখন সীমিত ধারণক্ষমতার গুদামেই পণ্য রাখতে হচ্ছে। জায়গার অভাবে বিপুল পরিমাণ আমদানি পণ্য গুদামের বাইরে খোলা জায়গায় স্তূপ করে রাখা হয়েছে। পণ্যের পরিমাণ এত বেশি যে তা বিমানবন্দরের রানওয়ে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এতে মূল্যবান পণ্য অনিরাপদ অবস্থায় পড়ে থেকে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। একই সঙ্গে ব্যবস্থাপনায়ও দেখা দিয়েছে বিশৃঙ্খলা।
আকাশপথে সাধারণত রপ্তানিমুখী পণ্যের স্যাম্পল বা নমুনা পরিবহন করা হয়। ব্র্যান্ড-ক্রেতাদের কাছে একাধিকবার নমুনা পাঠানো ও অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় কার্গো ভিলেজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়া জরুরি কাঁচামাল, এক্সেসরিজ ও কুরিয়ারে পাঠানো নথিপত্রও এই কার্গো ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
এই মুহূর্তে এসব স্যাম্পল ও কাঁচামালের বড় অংশই উন্মুক্ত স্থানে পড়ে রয়েছে, যা তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদন ও রপ্তানি প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে।
বিজিএমইএর সহ-সভাপতি শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী বলেন, খোলা জায়গায় কুয়াশায় ভিজে গুরুত্বপূর্ণ আমদানি পণ্য নষ্ট হচ্ছে। কার্গো ভিলেজের ধারণক্ষমতা না বাড়িয়ে অস্থায়ী তাঁবু দ্রুত সরিয়ে নেওয়া ঠিক হয়নি। এতে বিপুল পরিমাণ স্যাম্পল ও কাঁচামাল ঝুঁকিতে পড়েছে। ক্ষতি এড়াতে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তারা যোগাযোগ করছেন।
ঢাকা কাস্টমস এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, এখন বৃষ্টি না থাকলেও রাতের কুয়াশা ও দিনের রোদে পণ্যের মান নষ্ট হচ্ছে। বর্ষা শুরু হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। ব্যবসায়ীরা বারবার বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ বিমানের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কার্যকর সমাধান পাননি বলে অভিযোগ করেন তিনি। নতুন বেসামরিক বিমান পরিবহনমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর কাছে দ্রুত পদক্ষেপের আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) হিসাব অনুযায়ী, গত অক্টোবরে কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ১২ হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর বাইরে প্রায় ২০০ কোটি টাকার রপ্তানিমুখী ওষুধসামগ্রী পুড়ে বিনষ্ট হয়, যা সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের ব্যাঘাত সৃষ্টি করে।
কার্গো ভিলেজের অগ্নিকাণ্ডের ক্ষত এখনো পুরোপুরি সামাল দেওয়া যায়নি। তার মধ্যেই উন্মুক্ত স্থানে পণ্য স্তূপ হয়ে থাকা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। দ্রুত পণ্য খালাস, অস্থায়ী সংরক্ষণ ব্যবস্থা পুনর্বহাল বা স্থায়ী সমাধান না হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিমানবন্দর দেশের রপ্তানি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেখানে ব্যবস্থাপনায় এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে শুধু ব্যবসায়ী নয়, পুরো রপ্তানি খাতই চাপের মুখে পড়তে পারে। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত কার্যকর সমাধান দেয়, সেটিই দেখার বিষয়।

