বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতে করপোরেট প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন নয়। গ্রাহকসংখ্যা, নেটওয়ার্কের মান, অফার আর প্যাকেজ—এসব নিয়েই দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করে আসছে অপারেটররা। তবে ২০২৫ সালে এই প্রতিযোগিতা বিজ্ঞাপন বা বাজার কৌশলের গণ্ডি ছাড়িয়ে পৌঁছে যায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ, নিয়ন্ত্রক চ্যালেঞ্জ এবং আদালতের দ্বার পর্যন্ত।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় গ্রাহকভিত্তিক এই খাতে এমন প্রকাশ্য আইনি সংঘাত বিরল। বিষয়টি গড়ায় তিনটি প্রতিষ্ঠানের টেবিলে—বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন (বিসিসি) এবং উচ্চ আদালত। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে বাজারে আধিপত্য, মূল্যনীতি, ব্র্যান্ড ব্যবহার এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক কাঠামোর বৈধতা।
বছর শেষে কোনো মামলারই চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। তবে এসব ঘটনাপ্রবাহ প্রতিযোগিতার ন্যায়সংগততা, নিয়ন্ত্রকদের সক্ষমতা এবং কঠিন হয়ে ওঠা ব্যবসায়িক পরিবেশে খাতটির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
প্রতিযোগিতাবিরোধী অভিযোগ: রবির প্রথম পদক্ষেপ
২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি রবি আজিয়াটা বিসিসিতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করে। অভিযোগে বলা হয়, বাজারে শীর্ষস্থানীয় অপারেটর গ্রামীণফোন (জিপি) তার প্রভাবশালী অবস্থান ব্যবহার করে ‘প্রিডেটরি প্রাইসিং’ ও অতিরিক্ত সিম ভর্তুকির মাধ্যমে প্রতিযোগিতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। রবি দাবি করে, এসব আচরণ ২০১২ সালের প্রতিযোগিতা আইন লঙ্ঘন করে।
গ্রামীণফোন ২০১৯ সাল থেকে বিটিআরসির ঘোষিত Significant Market Power (SMP) অপারেটর। গ্রাহকসংখ্যা, আয় ও মুনাফায় তাদের এগিয়ে থাকা রবির অভিযোগকে গুরুত্ব দেয়। পরে বাংলালিংকও একই ধরনের অভিযোগ জানায়।
গ্রামীণফোন এসব অভিযোগ অস্বীকার করে। তারা জানায়, তাদের সিমের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৩৫০ টাকা এবং তারা সিম লোকসানে বিক্রি করে না। কোনো ছাড় থাকলে তা খুচরা বিক্রেতাদের নিজস্ব উদ্যোগে দেওয়া হয়। কমিশন কাঠামোও বিনিয়োগ ও নিয়ন্ত্রক ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই দাবি করে তারা।
বিসিসি তদন্ত শুরু করলে জিপি তার এখতিয়ার নিয়েই প্রশ্ন তোলে। ডিসেম্বর মাসে উচ্চ আদালত তদন্ত কার্যক্রমে স্থগিতাদেশ দেন।
এয়ারটেল ব্র্যান্ড নিয়ে নতুন বিতর্ক
বিসিসির তদন্ত চলাকালেই সেপ্টেম্বর মাসে গ্রামীণফোন বিটিআরসিতে চিঠি দিয়ে অভিযোগ করে, ২০১৬ সালে এয়ারটেল বাংলাদেশকে একীভূত করার পরও রবি ‘এয়ারটেল’ ব্র্যান্ড ব্যবহার করে যাচ্ছে, যা একীভূতকরণের শর্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
অক্টোবর মাসে বাংলালিংকও ‘জনস্বার্থে’ একই অভিযোগ তোলে। তাদের দাবি, রবি এখনো এয়ারটেলের পুরোনো ০১৬ নম্বর সিরিজে সিম ইস্যু করছে, যা একীভূতকরণের দুই বছরের পর নিষিদ্ধ থাকার কথা ছিল।
রবি এই অভিযোগ উড়িয়ে দেয়। তাদের করপোরেট ও রেগুলেটরি প্রধান শাহেদ আলম জানান, দ্বৈত ব্র্যান্ড ব্যবস্থার অনুমোদন বিটিআরসি ও মন্ত্রণালয় থেকে নেওয়া হয়েছে এবং একাধিক ব্র্যান্ড পরিচালনায় কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী বলেন, বিষয়টি আইনের ভিত্তিতেই দেখা হবে। তবে বছরের শেষে বিষয়টি অমীমাংসিতই থেকে যায়।
এসএমপি কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি ঘটনা ছিল জিপির এসএমপি কাঠামোর বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ। ২০১৮ সালে প্রণীত এই কাঠামো অনুযায়ী, কোনো অপারেটর ৪০ শতাংশের বেশি গ্রাহক, আয় বা স্পেকট্রাম দখল করলে তাকে বিশেষ নিয়ন্ত্রক বাধ্যবাধকতার আওতায় আনা হয়।
এসএমপি অপারেটর হিসেবে জিপিকে তিনটি বাধ্যবাধকতা মানতে হয়—নতুন সেবা চালুর আগে অনুমোদন নেওয়া, মোবাইল নম্বর পোর্টেবিলিটিতে স্বল্প লক-ইন সময়, এবং আন্তঃঅপারেটর কলরেট ০.১০ টাকার বদলে ০.০৭ টাকা নির্ধারণ।
২০১৯ সালে এ বিষয়ে চ্যালেঞ্জ করে ব্যর্থ হলেও ২০২৫ সালে জিপি নতুন রিট দায়ের করে। তারা এই সিদ্ধান্তকে ‘খামখেয়ালি ও বেআইনি’ বলে দাবি করে। উচ্চ আদালত তিন মাসের জন্য এসএমপি প্রয়োগে স্থগিতাদেশ দেন, ফলে আন্তঃঅপারেটর রেট আবার ০.১০ টাকায় ফিরে যায়।
বিটিআরসি এ আদেশের বিরুদ্ধে আপিলের ইঙ্গিত দেয়। জিপির করপোরেট অ্যাফেয়ার্স প্রধান তানভীর মোহাম্মদ জানান, আদালতে যাওয়ার আগে একাধিকবার নিয়ন্ত্রকের কাছে পর্যালোচনার আবেদন করা হয়েছিল।
কেন বাড়ছে আইনি লড়াই?
রবি ও বাংলালিংকের মতে, বাজারে ভারসাম্যহীন নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও একক আধিপত্য এই পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। রবির সিইও জিয়াদ শাতারা বলেন, সমঝোতা সম্ভব না হলে আদালতের দ্বারস্থ হওয়া অধিকার রক্ষার অংশ। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে এক অপারেটরের দিকে মুনাফা অতিমাত্রায় ঝুঁকে আছে।
বাংলালিংকের সিইও জোহান বুসে বলেন, অধিকাংশ দেশে শীর্ষ অপারেটর ৫০ শতাংশ বাজার দখল করে। কিন্তু ৯০ শতাংশ মুনাফা এক অপারেটরের হাতে থাকা অস্বাভাবিক। এতে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে অন্য অপারেটরদের সম্পর্ক কঠিন হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে জিপির সিইও ইয়াসির আজমান এই অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, এসএমপি কাঠামোই প্রমাণ করে যে নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা তাদের পক্ষে নয়। বরং এটি উদ্ভাবন ও নতুন সেবা চালুর ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। জিপির বাজার নেতৃত্ব বিনিয়োগ, দক্ষতা ও গ্রাহকের আস্থার ফল বলেও তিনি দাবি করেন।
টেলিকম বিশেষজ্ঞ আবু নাজাম এম তানভীর হোসেন বলেন, খাতটি এখন প্রবৃদ্ধির পর্যায় পেরিয়ে পরিপক্ব প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এখন বাজার অংশীদারিত্ব বাড়ানো মানে প্রতিদ্বন্দ্বীর আয় কমানো। এ অবস্থায় অপারেটরদের সামনে দুটি পথ থাকে—উচ্চ বিনিয়োগ করে নেটওয়ার্ক উন্নয়ন অথবা নতুন সেবা উদ্ভাবন। কিন্তু তৃতীয় পথ হিসেবে আইনি ও নিয়ন্ত্রক ফোরাম ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে, যা সীমিত পুনর্বিনিয়োগ ও স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক চাপের লক্ষণ।
সামনে কী?
২০২৫ সাল টেলিকম খাতের জন্য আইনি উত্তেজনায় ভরা বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকল। অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ, আদালতের স্থগিতাদেশ—সব মিলিয়ে প্রতিযোগিতা এখন কেবল বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই।
চূড়ান্ত রায় এখনো আসেনি। তবে স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের টেলিকম খাত এক নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে—যেখানে প্রতিযোগিতা শুধু প্যাকেজ বা নেটওয়ার্ক নয়, বরং আইন ও নীতির ব্যাখ্যাতেও নির্ধারিত হচ্ছে।

