রাজধানীর কয়েকটি পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি তেল বিক্রির নামে ভয়াবহ অনিয়ম ও প্রতারণার তথ্য উদ্ঘাটন করেছে বাংলাদেশ মান নিয়ন্ত্রণ ও পরীক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিএসটিআই)। সাম্প্রতিক মোবাইল কোর্ট অভিযানে দেখা গেছে, গ্রাহকদের কাছ থেকে পূর্ণমূল্য আদায় করা হলেও নির্ধারিত পরিমাণের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল কম সরবরাহ করা হচ্ছিল। কোথাও প্রতি ১০ লিটারে প্রায় ১ লিটার পর্যন্ত কম তেল দেওয়া হয়েছে, যা ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সোমবার (৮ জুন) বিএসটিআই জানায়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত পৃথক অভিযানে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুতর কারচুপির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জরিমানা আরোপের পাশাপাশি অনিয়মে জড়িত ডিসপেন্সিং ইউনিটগুলো সিলগালা করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
বিএসটিআই সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর মগবাজার এলাকায় একটি ফিলিং স্টেশনে পরিচালিত অভিযানে অকটেন সরবরাহকারী একটি ইউনিটে পরিমাপে অসঙ্গতি ধরা পড়ে। পরীক্ষার সময় দেখা যায়, প্রতি ১০ লিটার অকটেন সরবরাহে ৮০ মিলিলিটার কম দেওয়া হচ্ছে। এ অপরাধে প্রতিষ্ঠানটিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিট বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এর আগের দিন রাজধানীর কল্যাণপুর এলাকার একটি সার্ভিস স্টেশনেও অভিযান চালানো হয়। সেখানে চারটি ডিসপেন্সিং ইউনিট পরীক্ষা করে দুটিতে গুরুতর অনিয়ম শনাক্ত করা হয়। যাচাই-বাছাইয়ে দেখা যায়, একটি ইউনিটে প্রতি ১০ লিটার জ্বালানি বিক্রির ক্ষেত্রে ১ হাজার ৮০ মিলিলিটার এবং অন্যটিতে ৯৮০ মিলিলিটার পর্যন্ত কম তেল সরবরাহ করা হচ্ছিল। অর্থাৎ গ্রাহক ১০ লিটারের মূল্য পরিশোধ করলেও বাস্তবে পাচ্ছিলেন প্রায় ৯ লিটার জ্বালানি।
এ ধরনের অনিয়মকে পরিকল্পিত প্রতারণা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, সামান্য পরিমাণ নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে বড় অঙ্কের জ্বালানি কম সরবরাহ করলে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থ অবৈধভাবে হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। বিশেষ করে যেসব পাম্পে প্রতিদিন শত শত যানবাহনে জ্বালানি বিক্রি হয়, সেখানে এই কারচুপির আর্থিক প্রভাব কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ওজন ও পরিমাপ মানদণ্ড আইন, ২০১৮-এর আওতায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। একই সঙ্গে গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষায় অনিয়মে ব্যবহৃত দুটি ইউনিট তাৎক্ষণিকভাবে সিলগালা করা হয়।
দুটি অভিযানে মোট ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিএসটিআই। সংস্থাটি বলছে, জ্বালানি খাতে পরিমাপগত অনিয়ম শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, বরং বাজারে আস্থা সংকটও তৈরি করে। তাই এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে নিয়মিত নজরদারি ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি তেল এমন একটি পণ্য যা প্রতিদিন লাখো মানুষ ব্যবহার করেন। ফলে পরিমাপে সামান্য কারচুপিও দীর্ঘমেয়াদে বিপুল আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। এ কারণে ফিলিং স্টেশনগুলোর পরিমাপ ব্যবস্থা নিয়মিত পরীক্ষা এবং ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
ভোক্তা অধিকারকর্মীদের মতে, গ্রাহকদেরও সচেতন হতে হবে। জ্বালানি নেওয়ার সময় মিটারের রিডিং খেয়াল করা, সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে অভিযোগ জানানো এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হলে এ ধরনের প্রতারণা কমানো সম্ভব।
বিএসটিআই জানিয়েছে, ভোক্তা স্বার্থ সুরক্ষা এবং জ্বালানি সরবরাহে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতেও সারা দেশে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। সংস্থাটির আশা, নিয়মিত নজরদারি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে জ্বালানি খাতে অনিয়ম ও প্রতারণা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

