রমজানের প্রথম দিন। ঢাকার শাহজাদপুর বাজারে ইফতারের জন্য ফল কিনতে গিয়েছিলেন মাহিউদ্দিন। ভাবছিলেন পরিবারের জন্য কিছু মাল্টা, কমলা, আপেল আর আঙুর কিনবেন। কিন্তু বাজারে গিয়ে দামের হিসাব শুনে যেন থমকে গেলেন। মাত্র দুইটি মাল্টা, চারটি কমলা, চারটি আপেল এবং এক ছোট গুচ্ছ আঙুর কিনতেই তাকে গুনতে হয়েছে ৭৯০ টাকা।
এই অভিজ্ঞতা শুধু মাহিউদ্দিনের নয়—রমজানের শুরুতেই ফলের বাজারে এমন চিত্রই দেখা যাচ্ছে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়।
গত দুই থেকে তিন সপ্তাহে আমদানি করা ফলের দাম কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। স্থানীয় ফলও রেহাই পায়নি। বরই, পেঁপে, কলা ও পেয়ারা—এসব ফলের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ৩০ থেকে ৬০ টাকা।
মাহিউদ্দিন আক্ষেপ করে বলেন, আগে মাসে এক-দুই কেজি ফল সহজেই কিনতে পারতেন। এখন কয়েকটি ফল তুলতেই ভাবতে হচ্ছে। স্থানীয় ফলও এখন নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
বাজার ঘুরে যা দেখা গেল
শাহজাদপুর, কারওয়ান বাজার ও ইস্কাটন ঘুরে দেখা গেছে, রমজান উপলক্ষে খেজুর, মাল্টা, আঙুর ও আপেলের চাহিদা বেড়েছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে দামে।
বর্তমানে বাজারে মাল্টা ও কমলা কেজি ৩২০ থেকে ৩৬০ টাকা। লাল আপেল ৩৬০ থেকে ৪০০ টাকা, সবুজ আপেল ৪৩০ থেকে ৪৫০ টাকা। সবুজ আঙুর ৪৩০ থেকে ৪৫০ টাকা এবং লাল আঙুর ৫২০ থেকে ৫৫০ টাকা কেজি। নাশপাতি ৪৫০ টাকা, ডালিম ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সুপারশপগুলোতে দাম আরও বেশি। চীনা কমলা ৪৪৫ টাকা, কিন্নো কমলা ৪০০ টাকা, সবুজ আঙুর ৫০০ টাকা, অস্ট্রেলিয়ান লাল আঙুর ৬৯৫ টাকা, লাল আপেল ৪৪০ টাকা, সবুজ আপেল ৪৭৫ টাকা, মাল্টা ৩২৫ টাকা, নাশপাতি ৪১০ টাকা। খেজুর ৬০০ থেকে ১,৫০০ টাকা এবং ডালিম ৭৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
রমজানের চাহিদায় বাড়তি চাপ
ব্যবসায়ীরা বলছেন, রমজান এলে ফলের চাহিদা বাড়ে। বিশেষ করে ইফতারের জন্য খেজুর ও ফলের চাহিদা অনেক বেশি থাকে। ইস্কাটনের ফল বিক্রেতা রেজাউল করিম বলেন, রমজানে চাহিদা বাড়ে, আর চাহিদা বাড়লেই দামও বাড়ে।
স্থানীয় ফলও এখন ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। পেয়ারা, বরই, তরমুজ ও পেঁপের দাম বেড়েছে। কলার দামও বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই আগের মতো কিনতে পারছেন না।
খেজুরের বাজারে পরিস্থিতি আরও চড়া। নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে জনপ্রিয় জাহিদি খেজুরের দাম এক সপ্তাহেই উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আমদানি করা ডাব্বাস, কালমি ও মেডজুল জাতের খেজুরের দামও বাড়ছে ধারাবাহিকভাবে।
কিছু ব্যবসায়ী আমদানি প্রক্রিয়ায় জটিলতাকে দায়ী করছেন। বিশেষ করে ডাব্বাস খেজুরের চালান বন্দরে আটকে থাকায় সরবরাহ কমেছে। কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী আরাফাত হোসেন বলেন, চাহিদা বেশি, কিন্তু সরবরাহ কম। যখন চাহিদা সরবরাহকে ছাড়িয়ে যায়, তখন দাম বাড়াটাই স্বাভাবিক।
শুল্কের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন
বর্তমানে ফল আমদানিতে মোট শুল্কের হার প্রায় ৯০ শতাংশ। ফলে খুচরা বাজারে ফলের দাম অনেক বেড়ে যাচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এত বেশি শুল্ক পুষ্টি নিরাপত্তার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বাংলাদেশ ফুড সেফটি অথরিটির সাবেক সদস্য মাহবুব কবির মিলন বলেন, ফল কোনো বিলাসপণ্য নয়। ৯০ শতাংশ কর জনস্বাস্থ্যের জন্য প্রতিবন্ধকতা। দেশের ২০ কোটি মানুষের চাহিদা পূরণে শুধু দেশীয় ফল যথেষ্ট নয়। আঙুর, আপেল, নাশপাতি, কমলা ও মাল্টার মতো ফল সুষম খাদ্যের জন্য জরুরি।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ফলের ওপর এত বেশি কর রেখে ভিটামিন ও খাদ্যপরিপূরক সহজলভ্য করা কতটা যৌক্তিক? কল্যাণরাষ্ট্রে ফল কখনো বিলাসপণ্য হতে পারে না।
পুষ্টিবিদ সামিয়া তাসনিম বলেন, ফল ও সবজি শরীরের জন্য অপরিহার্য ভিটামিন ও খনিজ সরবরাহ করে। এর ঘাটতি ‘হিডেন হাঙ্গার’ তৈরি করে, যা চুল পড়া, ত্বকের সমস্যা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমার মতো জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। রমজানে অন্তত একটি খেজুর দিয়ে ইফতার শুরু করা এবং দৈনিক ১০০ থেকে ২৫০ গ্রাম ফল খাওয়া প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সবজিতে সামান্য স্বস্তি
ফলের বাজারে আগুন থাকলেও কিছু সবজির দামে সামান্য স্বস্তি মিলেছে। বেগুন, লেবু ও কাঁচামরিচের দাম প্রথম দিনে কিছুটা কমেছে।
কারওয়ান বাজার, শাহজাদপুর, বাড্ডা ও হাতিরপুলে বেগুন কেজি ৭০ থেকে ১০০ টাকা, যা দুই দিন আগে ছিল ১২০ থেকে ১৪০ টাকা। কাঁচামরিচ ৮০ থেকে ১২০ টাকা, আগে ছিল ১৪০ থেকে ১৮০ টাকা। লেবু ডজন ১৫০ থেকে ২৪০ টাকা, আগে ছিল ২৪০ থেকে ৩৬০ টাকা।
অন্যান্য সবজির দাম মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে। শসা ১০০ টাকা, আলু ২০ টাকা, কাঁচা পেঁপে ৮০ থেকে ১২০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ও দেশি টমেটো ৪০ থেকে ৬০ টাকা, ওলকপি ৫০ থেকে ৮০ টাকা, লাউ ৬০ থেকে ৭০ টাকা। করলা ১২০ থেকে ১৬০ টাকা, দেশি গাজর ৪০ থেকে ৬০ টাকা, বিভিন্ন ধরনের শিম ৪০ থেকে ৭০ টাকা, ফুলকপি ৪৫ থেকে ৫০ টাকা, বাঁধাকপি ৫০ টাকা এবং মূলা ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজি।
মধ্যবিত্তের বাড়তি চাপ
বাজারে ঘুরে দেখা গেছে, দামের অস্থিরতায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন মধ্যবিত্তরা। ক্রেতা আবদুল আলিম বলেন, এখন লেবুর মৌসুম। তবুও রমজানের আগে রাতারাতি দাম বেড়ে গেল। ব্যবসায়ীরা যদি নিজেদের অবস্থান না বদলান, তাহলে পরিস্থিতি বদলাবে না।
অন্যদিকে ব্যবসায়ী আসলাম হোসেন বলেন, রমজানের শুরুতে চাহিদা বেশি থাকায় দাম বেড়েছিল। এখন সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে, তাই সামান্য স্বস্তি এসেছে—তবে পুরোপুরি নয়।
রমজানের শুরুতেই ফলের বাজার মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। সামনে পুরো মাসজুড়ে এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত থাকবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। অনেকেই বলছেন, ফল যেন ধীরে ধীরে বিলাসপণ্যে পরিণত হচ্ছে—যা সবার জন্য সহজলভ্য থাকা উচিত।

