নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরদিনই বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের কাছে আবেদন করেছে।
এরূপ আবেদন করেছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী। তিনি গত বুধবার জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) অধীন কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) চেয়ারম্যান হোসে আন্তোনিও ওকাম্পোর কাছে একটি চিঠি পাঠান। চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কারণে এলডিসি উত্তরণের সময়কাল ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো প্রয়োজন।
আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ হওয়ার কথা ছিল ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর। চূড়ান্ত উত্তরণের আগে ইতিমধ্যেই তৃতীয় পর্যালোচনা প্রক্রিয়া চলছে।
সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠন ও অর্থনীতিবিদের পরামর্শে নেপাল ও লাওসের সঙ্গে সমন্বয় করে সময় বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নতুন মন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর বলেন, “এলডিসি থেকে উত্তরণ বিলম্বিত করতে যা করা প্রয়োজন, সবই করা হবে। আজ থেকেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছে। ইআরডির সঙ্গে দ্রুত সমন্বয় করে উত্তরণ বিলম্বিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।” ইআরডি সচিবও ওই দিনই সিডিপি চেয়ারম্যানকে চিঠি দেন।
সরকারের যুক্তি ও বিশ্লেষণ:
চিঠিতে সরকার উল্লেখ করেছে, সময়সীমা বাড়ালে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখা, চলমান সংস্কারগুলো সংহত করা এবং “স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি” (এসটিএস) অনুযায়ী অগ্রাধিকারমূলক কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
সরকার বলেছে, এলডিসি উত্তরণে পাঁচ বছরের প্রস্তুতি সময়ে দেশি ও বৈশ্বিক নানা সংকট “গুরুতরভাবে ব্যাহত” করেছে। বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে রয়েছে—কোভিড-১৯ মহামারি, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ধীরগতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব, জ্বালানি ও খাদ্যবাজারের অস্থিরতা, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার কঠোরতা, বাণিজ্য পুনরুদ্ধারে বিলম্ব এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা।
দেশি চ্যালেঞ্জের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—আর্থিক খাতে অনিয়ম, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের স্থিতিশীল সমাধান না হওয়া। এসব কারণে সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমেছে, মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, বেসরকারি ও সরকারি বিনিয়োগ হ্রাস পেয়েছে এবং কর-জিডিপি অনুপাত কমেছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ বেড়েছে, মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের আমদানি কমেছে এবং কম বিনিয়োগের কারণে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজারও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এই অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সরাসরি দারিদ্র্য বিমোচনের পথকে বিপরীতমুখী করছে।
সরকারের যুক্তি অনুযায়ী, উত্তরণ-সংক্রান্ত সংস্কারগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া এলডিসি-পরবর্তী বাণিজ্য সুবিধার অনিশ্চয়তাও উদ্বেগের বিষয়। যেমন, তৈরি পোশাক খাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাস সুবিধা প্রাপ্তি, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপ, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তির পরিবর্তন এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর নতুন মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি।
চিঠিতে বলা হয়েছে, শুল্ক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, জ্বালানি সংস্কার, রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ ও শিল্পকারখানার কমপ্লায়েন্স উন্নয়ন অগ্রগতি হলেও, একের পর এক সংকটের কারণে এগুলো নির্ধারিত সময়ের চেয়ে পিছিয়ে।
বাংলাদেশের এলডিসি ইতিহাস ও প্রস্তুতি:
বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে এলডিসি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। এলডিসি অবস্থার সুবিধায় পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ বিভিন্ন সুবিধা পেয়েছে।
ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি সূচকের মধ্যে কমপক্ষে দুটি পূরণ করলে এলডিসি উত্তরণ সম্ভব। বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালে তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়েছে। ২০২৪ সালে মাথাপিছু জিএনআই বেড়ে দাঁড়ায় ২,৮২০ ডলার।
করোনার কারণে উত্তরণ আগের দুই বছর পিছিয়েছে। তাই ২০২৬ সালে বাংলাদেশকে এলডিসি থেকে উত্তরণে তিন বছরের সময় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
বিশেষভাবে, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, মালদ্বীপ ও নেপালের মতো দেশও প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি দেখিয়ে এলডিসি উত্তরণ নির্ধারিত সময়ের আগে করতে পারেনি।
সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “উত্তরণের মানদণ্ডের বিচারে এলডিসি উত্তরণ পেছানোর সুযোগ নেই। তবে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ সামনে আনলে সময় বাড়ানো সম্ভব। দেশের টেকসই উত্তরণ নিশ্চিত করতে আরও সময় দরকার। নতুন সরকার দ্রুত আবেদন করে সঠিক পদক্ষেপ নিয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “সিডিপি আবেদন মূল্যায়ন করবে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভায় হবে। সেখানে বন্ধু রাষ্ট্রের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ। তাই এখনই সরকারকে কাজ শুরু করতে হবে।”

