১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, মানুষের কল্যাণ এবং সামগ্রিক আর্থসামাজিক অগ্রগতির লক্ষ্য সামনে রেখে বিভিন্ন বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আসছে। রাষ্ট্রের উন্নয়ন কাঠামো গঠনে এসব চ্যালেঞ্জ বারবার নতুন করে সামনে এসেছে।
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, স্বাধীনতার পর দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বাংলাদেশ এখনো অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করার এক গুরুত্বপূর্ণ যাত্রাপথে রয়েছে। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ছিলেন। এর আগে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক এবং সিরডাপের গবেষণা পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
সম্প্রতি তিনি বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়া, অন্তর্ভুক্তিমূলক অগ্রগতি, দারিদ্র্য এবং বৈষম্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তার মতে, দেশের উন্নয়নযাত্রা বহু অর্জনে সমৃদ্ধ হলেও সামনের দিনগুলোতে আরও কাঠামোগত কাজের প্রয়োজন হবে, যাতে সকল শ্রেণি-গোষ্ঠী উন্নয়নের সুফল সমানভাবে পায়।
আপনি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়া ও অর্থনীতি নিয়ে কাজ করেছেন। বর্তমান বাংলাদেশকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন—আমাদের উন্নয়ন মডেল কতটা টেকসই?
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকেই বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন এবং জনগণের সামগ্রিক কল্যাণ ও আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতির লক্ষ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে। এ প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য হচ্ছে, সব ধরনের শোষণ থেকে মুক্ত এমন একটি রাষ্ট্র বিনির্মাণ যেখানে আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানব মর্যাদা, সাম্য ও ন্যায়বিচার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অধিকারসহ সব নাগরিকের জন্য সুরক্ষিত থাকবে। কয়েক দশক ধরে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য হ্রাসের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করা সত্ত্বেও এটা সত্য যে বাংলাদেশের উন্নয়নে অন্তর্ভুক্তীকরণের মাত্রা এখনো একটি উদ্বেগের বিষয়।
এজন্য আমাদের সামগ্রিক উন্নয়ন কৌশলের যথাযথ সমন্বয় প্রয়োজন যাতে উন্নয়নের সব অর্থনৈতিক এবং অ-অর্থনৈতিক মাত্রা ও সুবিধার বণ্টন সমাজের সব জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ন্যায়সংগতভাবে অর্জন করা যায়। অন্য কথায় বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন এজেন্ডায় উন্নয়ন কৌশল ও নীতি প্রণয়নের মৌলিক নির্দেশক হিসেবে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ধারণাকে গ্রহণ করতে হবে। যেহেতু অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন সমাজের সব বিভাজনের ক্ষেত্রে কল্যাণের ন্যায়সংগত বণ্টনের ওপর দৃষ্টি দেয়, এজন্য ধারণাটিতে আয় ও সম্পদ ছাড়াও কল্যাণের অন্য সব মাত্রাই অন্তর্ভুক্ত। তাই বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন সমতা ও ন্যায়বিচারের নীতিকে সমুন্নত রাখার পাশাপাশি সব ব্যক্তির মঙ্গলকে ব্যাপকভাবে উন্নত করার সমার্থক। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ধারণা ব্যক্তির পছন্দের স্বাধীনতা প্রদান করে এবং নমনীয়তা ও অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করে।
এভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের বহুমাত্রিক প্রক্রিয়াটি সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এবং নাগরিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও মানবকল্যাণের অন্য মাত্রাগুলোকে সুসংহত করে সমান সুযোগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সমাজের সব সদস্যের অংশগ্রহণকে সহজতর করে। এজন্য বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে উন্নয়ন নীতিকে কল্যাণমুখী ও ন্যায়সংগত করার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের একটি ব্যাপক ধারণাগত মডেল এবং এর বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ প্রদান করে। অর্থাৎ একটি টেকসই ও সবার অংশগ্রহণে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সমতাভিত্তিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা আবশ্যক। কোনো ব্যক্তি বিশেষের নয় বা কোনো শ্রেণীবিশেষের নয়, সব মানুষের জন্যই উন্নয়ন—এটিই আমাদের দেশের উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা হওয়া উচিত। স্বাভাবিকভাবেই এ ধরনের উন্নয়নের মডেল আমাদেরকে অনুসরণ করতে হবে যাতে দ্রুতগতিতে উন্নয়ন হয়, টেকসইতা নিশ্চিত হয়, উন্নয়নের সুফল সমভাবে বণ্টিত হয় যাতে একটি সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে উঠবে। এ ধরনের মডেলটিই আমাদের জন্য উপযুক্ত ও কাম্য মডেল।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিপরীতে বৈষম্যও ক্রমবর্ধমান। এ বাস্তবতাকে কীভাবে দেখেন?
উন্নয়ন, দারিদ্র্য ও বৈষম্যের ধারণা ভিন্ন, কিন্তু এগুলো অন্তর্নিহিতভাবে যুক্ত। এ তিন ধারণাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রূপকল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এবং এগুলোর সব ক’টিই মানুষের মঙ্গলের ওপর প্রভাব ফেলে। বৈষম্যের ধারণাটি বোঝায় কীভাবে নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্য ব্যক্তি, ব্যক্তিগোষ্ঠী বা দেশের মধ্যে বণ্টিত হয়। অসমতার ধারণায় লক্ষ্য হিসেবে ফলাফলের সমতা কিন্তু লক্ষ্য নয়, যেহেতু সব মানুষ একই পদ্ধতি ব্যবহার করে ফলাফলকে কল্যাণে রূপান্তর করে না। ফলাফল ও মানুষের কল্যাণের মধ্যে সম্পর্ক মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে, যেমন বয়স, লিঙ্গ, পারিবারিক পটভূমি ও অক্ষমতা।
এটি সামাজিক অবস্থার ওপরও নির্ভর করে, যেমন স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা, অপরাধের প্রবণতা এবং অন্য কারণগুলোর মধ্যে সম্প্রদায়ের সম্পর্ক। সুতরাং লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের স্বাধীনতা অনুশীলন করার সুযোগ সমান করা; বিভিন্ন ব্যক্তি যে ফলাফল অর্জন করে তার মধ্যে নয়। এতে সুযোগের বৈষম্যকে জনগণের পছন্দ ও স্বাধীনতার প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা হয়, যা তাদের মানব উন্নয়ন ও কল্যাণকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। এ কাঠামোতে মানব উন্নয়ন, দারিদ্র্য ও অসমতা সবই মূলত বহুমাত্রিক ও জনকেন্দ্রিক ধারণা। এগুলো সবই ফোকাস করে মানুষের সামর্থ্যের ওপর, যা মানুষের কল্যাণের ওপর চূড়ান্ত প্রভাব ফেলে। আমাদের দেশে সব ক্ষেত্রে বৈষম্য ক্রমবর্ধমান। উদাহরণস্বরূপ, আয়ের ক্ষেত্রে ২০১০ সালে সবচেয়ে বেশি আয়ের ৫ শতাংশ আয়ের ও সবচেয়ে কম আয়ের ৫ শতাংশ আয়ের মধ্যে ব্যবধান ছিল ৩১ গুণ। কিন্তু ২০২২ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এ ব্যবধান বৃদ্ধি পেয়েছে ৮২ গুণ।
অর্থাৎ ১২ বছরের ব্যবধানে ৫১ গুণ বেশি বেড়ে গেছে। সম্পদের বৈষম্য আরো বেশি বেড়েছে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ক্ষেত্রেও বৈষম্য আছে। অর্থাৎ সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রেই বৈষম্য ক্রমবর্ধমান। এ ক্রমবর্ধমান বৈষম্য আমাদের সমাজে কাঙ্ক্ষিত নয়। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান ও ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মূল কারণ ছিল বৈষম্য। কোটাবিরোধী আন্দোলন একটি সামগ্রিক বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে রূপান্তর হয়েছিল। স্বাধীনতার পর থেকে বিশেষ করে গত ১৫ বছরে যে উন্নয়ন হয়েছে, সেটা বৈষম্যকেও অনেক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ আমরা এমন একটি উন্নয়নের পথে এগিয়েছি, যেটি সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে বৈষম্য ক্রমাগত বাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা সত্যিকার অর্থে যদি টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে চাই তাহলে বৈষম্য নিরসনে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে দৃষ্টি দিতে হবে। তাছাড়া বিশেষ গোষ্ঠী যাতে সম্পদ, অর্থ ও ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত না করতে পারে সেদিকে নজর দিতে হবে। তাহলেই আমরা বৈষম্যহীন উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যেতে পারব। তখন উন্নয়নের সুফল সবাই ন্যায্যভাবে উপভোগ করতে পারবে।
আপনি ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন’ ধারণার ওপর জোর দিয়েছেন। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণে এ অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে?
এ কথা সত্য যে গত প্রায় ৫৫ বছরে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উত্তরোত্তর অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করেছে, কিন্তু বিদ্যমান উচ্চ সামাজিক বঞ্চনা ও অর্থনৈতিক বৈষম্য বর্তমানেও অব্যাহত রয়েছে। এ সুযোগগুলোর ন্যায্য অভিগমন এবং সেই সঙ্গে সমাজের সব গোষ্ঠীর মানুষের কাছে উন্নয়নের সুফল ন্যায়সংগতভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এ পরিস্থিতি সমাজের সব গোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে যেসব চ্যালেঞ্জ সেগুলো মোকাবেলা করা অপরিহার্য। অধিকন্তু বিশ্বায়ন, ডিজিটালাইজেশন, জনসংখ্যা ও জলবায়ু পরিবর্তন অর্থনৈতিক পদ্ধতিগত কার্যকলাপকে রূপান্তর করছে, যা নতুন সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জও সৃষ্টি করছে। বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও ভৌগোলিক অঞ্চলের মধ্যে উন্নয়নের সুফল ন্যায়সংগতভাবে বণ্টিত না হলে এটি আরো গভীর বঞ্চনা ও বৈষম্যের ঝুঁকি বৃদ্ধি করবে।
বাংলাদেশের বর্তমান দায়বদ্ধতা হচ্ছে নীতি এমনভাবে প্রস্তুত করা, যাতে বঞ্চনা ও বৈষম্য মোকাবেলার পাশাপাশি উচ্চ উৎপাদনশীলতা এবং আয় বৃদ্ধি উভয়ই সম্ভব হয়। এজন্য ভবিষ্যতে সম্প্রসারিত সুযোগকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন কাঠামো গ্রহণের মাধ্যমে আরো ভালোভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে, যা সবার জন্য উপকারী ও কাউকেই পিছিয়ে না রাখে। স্পষ্টতই এসব নীতির অনেকের মধ্যে ট্রেড-অফ থাকতে পারে, তবে যেসব নীতি সবার জন্য সুফল সৃষ্টি করে সেগুলো কোনো দ্বিধা ছাড়াই গ্রহণ করা যেতে পারে যেমন শ্রম ও প্রান্তিক গোষ্ঠীর অল্পবয়স্ক শিশুদের দক্ষতায় আরো বেশি বিনিয়োগ, কর্মীদের পুনর্দক্ষতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আকার, অবস্থান ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য নির্বিশেষে সব উদ্যোগে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের বিস্তার। আমাদের বর্তমানে প্রচলিত উন্নয়ন মডেল অন্তর্ভুক্তিমূলক ধারণা সঠিকভাবে ধারণ করে না।
আমরা উন্নয়ন করেছি, কিন্তু উন্নয়নটি অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়নি। আমাদের উন্নয়ন মডেলের কাঠামোগত পরিবর্তন দরকার যা উন্নয়নকে এমনভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবে, যা কাউকে পিছিয়ে রাখবে না; অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন হবে। এতে বিশেষ কোনো গোষ্ঠী এককভাবে লাভবান হবে না। অর্থাৎ আর্থিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য থেকে শুরু করে সব ধরনের বৈষম্য কমবে। একটি সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনে এগিয়ে যাবে। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ধারণাকে এগিয়ে নেয়ার জন্য উন্নয়ন কৌশলগুলোর গুণগত পরিবর্তন করা দরকার। বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে আমাদের উন্নয়ন কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে হবে। কারণ বর্তমানে যার ক্ষমতা আছে, তারাই ভালো সুযোগগুলো ব্যবহার করে। ক্ষমতা ব্যবহার করে দুর্নীতি করে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে। আর যাদের ক্ষমতা নেই বা দরিদ্র বা স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠী বঞ্চিতই থেকে যায়। অসম রাষ্ট্র ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক কাঠামোর সবক্ষেত্রে নীতিগত, গুণগত ও দৃষ্টিগত পরিবর্তন দরকার যেটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
উন্নয়ন সূচকে আমাদের অর্জন বাড়লেও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বা গভর্ন্যান্স কী পরিমাণে শক্তিশালী হয়েছে?
আমরা সবাই জানি, বাংলাদেশের সব ধরনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং সুশাসন সাংবিধানিক বিধান ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ উভয়ই দ্বারা চিহ্নিত। সুশাসনের মূল প্রাতিষ্ঠানিক পরিমিতিগুলোর মধ্যে রয়েছে একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, কার্যকর সংসদ, দক্ষ আমলাতন্ত্র, স্বাধীন বিচার বিভাগ, শক্তিশালী স্থানীয় সরকার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, একটি প্রাণবন্ত নাগরিক সমাজ এবং কার্যকর দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা। দুর্নীতি, জবাবদিহির অভাব এবং জনসাধারণের দুর্বল অংশগ্রহণের মতো বিষয়গুলো সুশাসন বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করে, বিশেষ করে যখন জনসাধারণের অংশগ্রহণ নামমাত্র থাকে। কাঙ্ক্ষিত কর্মক্ষম প্রতিষ্ঠান এবং সুশাসনের যেসব মাত্রা বা সূচক রয়েছে সবগুলোতেই আমরা পিছিয়ে আছি। বর্তমানে আমরা সুশাসনের ক্ষেত্রে অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
যেমন দুর্নীতি, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার অভাব, জনসাধারণের দুর্বল অংশগ্রহণ, অদক্ষ আমলাতন্ত্র, আইনের শাসনের অভাব এবং আরো অনেক কিছু। বিগত সরকারের শাসনামলে আমাদের সব ধরনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতাগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। দুর্নীতিগ্রস্ত ও ক্ষমতালোভী রাজনীতিবিদ, কিছু অনৈতিক অর্থ পিপাসু ব্যবসায়ী, ক্ষমতাশালী অভিজাত শ্রেণী এবং আমলারা মিলে একটি দুষ্টচক্র তৈরি করেছিল। তারা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজের স্বার্থে নিয়ন্ত্রণ করত এবং দুর্নীতি ও অর্থ লুণ্ঠনের মাধ্যমে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিকসহ সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের কাঠামো ধ্বংস করে দিয়েছে। কাজেই যদি এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো শক্তিশালী না করা হয় এবং এগুলো কার্যকরভাবে তাদের অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে না পারে, তাহলে আমরা কোনোভাবেই অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়নের দিকে অগ্রসর হতে পারব না। তাই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে শক্তিশালী করতে আমাদের সুশাসন বা গুড গভর্ন্যান্সকে নিশ্চিত করতে হবে।
দেশের উন্নয়নের নীতিনির্ধারণে ‘এভিডেন্স বেজড ডিসিশন মেকিং’ কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে? নাকি এখনো রাজনৈতিক বিবেচনাই মুখ্য ভূমিকা রাখে?
বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য ‘এভিডেন্স বেইজড ডিসিশন মেকিং’ যাকে আমরা প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ বলতে পারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি নিশ্চিত করে যে নীতি এবং গৃহীত উন্নয়ন হস্তক্ষেপগুলো কেবল অংশীদারদের মতামত বা আদর্শের ওপর নয়, বরং সর্বোত্তম প্রায়োগিক গবেষণাভিত্তিক জ্ঞান এবং তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গৃহীত হয়েছে। এ ধরনের উন্নয়ন প্রচেষ্টার অনুশীলন কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে, অনিশ্চয়তা হ্রাস করে এবং তথ্য ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের নির্দেশনা দিয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করে, যা ভালো ফলাফল এবং সম্পদের দক্ষ ব্যবহারের পথ আরো সুগম করে। বাংলাদেশে প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে, এর অনুশীলন কেবল মাত্র বিকশিত হচ্ছে। তাছাড়া এসব প্রচেষ্টা সক্ষমতা এবং প্রেক্ষাপট-নির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবের মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। এসব জটিলতা দূর করার জন্য বর্তমানে দেশে উন্নয়ন গবেষণা এবং প্রকৃত নীতি প্রণয়নের মধ্যে বিদ্যমান যে বিশাল ব্যবধান আছে তা কমানো অপরিহার্য।
এর সঙ্গে এটাও উপলব্ধি করা প্রয়োজন যে রাজনীতি ও অর্থনীতির মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। রাজনীতি সঠিক পথে না চললে অর্থনীতিও সঠিক পথে চলে না। আবার অর্থনীতি সঠিক পথে না চললে রাজনীতিও সঠিক পথে চলে না। কাজেই এ দুটির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের বিভিন্ন পথ কীভাবে উভয়কেই প্রভাবিত করে সে বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। পরস্পরের এ সম্পর্ককে সঠিকভাবে মূল্যায়ন না করে এবং পরিচালনার জন্য বাস্তবসম্মত নীতি-পদক্ষেপ না নিয়ে শুধু রাজনীতিতে দৃষ্টিপাত করলে অর্থনীতি ও রাজনীতি কোনোটিই সঠিক পথে যাবে না। গত দেড় দশকে অর্থনীতিতে যে সংকট তৈরি হয়েছিল চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর এখনো সেই সংকটের সমাধান পুরোপুরি হয়নি।
তবে মূল্যস্ফীতি সামান্য কমেছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, আর্থিক খাতসহ অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্থবির পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অর্থনীতিকে সচল রাখতে যে ধরনের সমন্বিত ও কৌশলগত সংস্কার এবং কার্যকর নীতি নেয়া প্রয়োজন, সেগুলো সঠিক সময়ে সঠিকভাবে নেয়া সম্ভব হয়নি। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার অতীত সরকারের অপকর্ম কাটিয়ে ওঠার জন্য কৌশলগত ও গভীর অর্থনৈতিক সংস্কার এবং কঠোর নীতি গ্রহণ না করার জন্য কোনো রাজনৈতিক বা অন্যান্য বাধ্যবাধকতার মধ্যে ছিল না, তবু স্পষ্টতই এই সরকার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সংস্কার নিষ্পত্তিতে নিযুক্ত ছিল, জরুরি অর্থনৈতিক সংস্কারও যথাযথ মনোযোগ পায়নি। সূত্র: বণিক বার্তা

