দেশের অর্থনীতিতে এখন এমন এক চাপা অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব একসঙ্গে পড়ছে ভোক্তা, ব্যবসায়ী, উৎপাদক, ব্যাংক খাত এবং সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থার ওপর। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। মানুষ আগের মতো খরচ করতে পারছে না। প্রয়োজনীয় ব্যয়ের বাইরে অনেক পরিবার এখন অতিরিক্ত খরচ কমিয়ে দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাজারে পণ্য বিক্রি, উৎপাদন, আমদানি এবং ব্যবসার গতিতে।
ব্যবসা-বাণিজ্যের এই ধীরগতির সঙ্গে সরকারের রাজস্ব আহরণের সম্পর্ক খুবই গভীর। কারণ সরকারের মোট রাজস্ব আয়ের ৬৫ শতাংশের বেশি আসে পরোক্ষ কর থেকে। অর্থাৎ পণ্য আমদানি, পণ্য বিক্রি, সেবা গ্রহণ ও ভোগব্যয়ের সঙ্গে সরকারের বড় অংশের আয় জড়িয়ে আছে। যখন মানুষ কম কেনে, ব্যবসা কম বিক্রি করে এবং আমদানি কমে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই আমদানি শুল্ক ও মূল্য সংযোজন করের আয় কমে যায়। বর্তমানে সেটিই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রাজস্ব আহরণসংক্রান্ত ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে, অর্থাৎ জানুয়ারি-মার্চ সময়ে আমদানি শুল্ক বাবদ সরকারের আয় হয়েছে ৭ হাজার ৭৪৮ কোটি টাকা। এটি গত বছরের শেষ প্রান্তিক, অর্থাৎ অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ৩ শতাংশ কম। একই সময়ে মূল্য সংযোজন কর খাতে আয় হয়েছে ৩৬ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় দশমিক ৩৪ শতাংশ কম।
এই পরিসংখ্যান শুধু সরকারের আয় কমার ইঙ্গিত দেয় না; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের দুর্বলতাও তুলে ধরে। আমদানির বিপরীতে মূল্য সংযোজন কর বাবদ চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে আয় হয়েছে ১৩ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় ৪ শতাংশ কম। তবে স্থানীয় বাজারে পণ্য বিক্রির বিপরীতে মূল্য সংযোজন কর থেকে ২২ হাজার ৭৮৪ কোটি টাকা আয় হয়েছে, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় ২ শতাংশ বেশি। এই সামান্য বৃদ্ধি কিছুটা ইতিবাচক হলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আমদানি শুল্ক ও মূল্য সংযোজন করের ধীরগতি দেখিয়ে দিচ্ছে যে দেশের উৎপাদন, আমদানি ও ভোগ—তিন ক্ষেত্রেই চাপ রয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য যখন স্বাভাবিক গতিতে চলে না, তখন শুধু উদ্যোক্তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হন না; সরকারের আয়ও কমে যায়। এর ফলে বাজেট বাস্তবায়ন, উন্নয়ন ব্যয়, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি ব্যয়ের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়।
সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর থেকে রাজস্ব আহরণে যে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে, তা অর্থনীতির মন্থরতার স্পষ্ট ইঙ্গিত। তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আমদানি কমে যাওয়া, শিল্পোৎপাদনের গতি কমে যাওয়া এবং ভোক্তা চাহিদা সংকুচিত হওয়ার প্রভাব সরাসরি রাজস্ব খাতে পড়ছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের বর্তমান মন্দা পরিস্থিতি তাই রাজস্ব আহরণের দুর্বলতার অন্যতম বড় কারণ।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রাজস্ব বাড়ানোর জন্য শুধু করের হার বাড়ানো যথেষ্ট নয়। যদি বাজারে বিক্রি না থাকে, উৎপাদন কমে যায় এবং বিনিয়োগ স্থবির থাকে, তাহলে কর আদায়ের ক্ষেত্রও সংকুচিত হয়ে পড়ে। ফলে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ দিলেই রাজস্ব বাড়বে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। বরং কর ব্যবস্থাকে সহজ করা, করজাল সম্প্রসারণ, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি, ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং উৎপাদন খাতকে সহায়তা দেওয়া জরুরি।
ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারাও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। তাদের বক্তব্য, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ সুদহার মিলিয়ে ব্যবসার খরচ অনেক বেড়ে গেছে। একদিকে ভোক্তার চাহিদা কমেছে, অন্যদিকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বর্তমানে ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ সুদে ব্যাংক ঋণ নিয়ে ব্যবসা চালানো অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসা যদি ঠিকমতো না চলে, তাহলে কর দেওয়ার সক্ষমতাও কমে যায়।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি কামরান তানভিরুর রহমানের বক্তব্যেও একই বাস্তবতা উঠে এসেছে। তিনি মনে করেন, শুধু বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ বাড়িয়ে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো সম্ভব নয়। সরকারের হিসাবে ১ কোটি ২০ লাখ টিআইএনধারী থাকলেও রিটার্ন জমা দেন মাত্র ৪০ থেকে ৪৫ লাখ। তাই রাজস্ব বাড়াতে হলে করদাতার সংখ্যা বাস্তব অর্থে বাড়াতে হবে। করজাল সম্প্রসারণ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো কঠিন হবে।
পরোক্ষ করের বাইরে সরকারের সামগ্রিক রাজস্ব পরিস্থিতিও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে সব মিলিয়ে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৪২২ কোটি টাকা। এটি গত বছরের শেষ প্রান্তিকের তুলনায় ৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ বেশি হলেও গত বছরের প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় ১ দশমিক ২৩ শতাংশ কম। অর্থাৎ প্রান্তিকভিত্তিক তুলনায় কিছু বৃদ্ধি দেখা গেলেও বছরভিত্তিক তুলনায় দুর্বলতা রয়ে গেছে।
চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে আয় হয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় ৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ বেশি। কিন্তু একই সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-বহির্ভূত রাজস্ব এবং কর-বহির্ভূত রাজস্ব আয় আগের বছরের প্রথম প্রান্তিক ও শেষ প্রান্তিক—উভয়ের তুলনায় কমেছে। ফলে সামগ্রিকভাবে সরকারের আয়ের ভিত্তি এখনো স্থিতিশীল নয়।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে শুল্ক ও কর আহরণে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। জুলাই-মার্চ সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড মোট ২ লাখ ৮৭ হাজার ৮৬২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা আহরণ করতে পেরেছে। অথচ এই সময়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮৫২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। ফলে নয় মাসে মোট রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৯৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকায়।
এই ঘাটতি সরকারের অর্থব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল করে তুলছে। রাজস্ব আয় কম হলে সরকারকে ব্যয় মেটাতে ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের মার্চে সরকার ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ৩৩ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল। এক মাসের ব্যবধানে এপ্রিল মাসে তা ৩৯ শতাংশ বেড়ে ৪৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এর মধ্যে ৩২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা আগের ট্রেজারি বিলের দায় পরিশোধে ব্যয় হয়েছে। ফলে এপ্রিল মাসে ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে, অর্থাৎ এপ্রিল-জুন সময়ে ব্যাংক খাত থেকে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের। এটি অর্থনীতির জন্য একটি বড় সংকেত। কারণ সরকার ব্যাংক খাত থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তি আরও কঠিন হতে পারে। আবার বেসরকারি খাত যদি ঋণ না পায়, তাহলে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে রাজস্ব আহরণেও নতুন করে চাপ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ একটি চক্র তৈরি হয়—ব্যবসা কমে, রাজস্ব কমে; রাজস্ব কমলে সরকার ঋণ নেয়; সরকার বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাত চাপে পড়ে; আর বেসরকারি খাত চাপে পড়লে ব্যবসা আরও কমে।
অর্থ বিভাগের সাবেক সচিব ও সাবেক মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী এই পরিস্থিতিকে বেশ জটিল হিসেবে দেখছেন। তার মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সরকার এখন সহজে টাকা ছাপিয়ে ঘাটতি মেটাতে পারবে না। কারণ তা করলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে। আবার রাজস্ব সংকটের প্রভাব বেসরকারি খাতেও পড়বে। যদি তারল্য পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ার পর বেসরকারি খাত বিনিয়োগ বাড়াতে চায়, তখন ব্যাংকগুলো সরকারের ট্রেজারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগ কমাতে বাধ্য হতে পারে। ফলে অর্থায়নের ভারসাম্য আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
আসন্ন বাজেট নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। আগামী বাজেটের সম্ভাব্য আকার ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে। কিন্তু ব্যয়, রাজস্ব, দেশি-বিদেশি ঋণ ও কর-বহির্ভূত রাজস্বের মধ্যে যথাযথ সামঞ্জস্য না থাকলে বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়তে পারে। রাজস্ব আহরণ দুর্বল থাকলে বড় বাজেট ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়নই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
অর্থনীতির এই চাপ কেবল সরকারি হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বড় বড় কোম্পানির আয় ও মুনাফার চিত্রেও এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। এককভাবে সরকারকে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব দেয় ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেড। চলতি ২০২৬ হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানিটির আয় হয়েছে ৮ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে আয় ছিল ৯ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আয় কমেছে ৮৭২ কোটি টাকা। একই সময়ে কোম্পানিটির নিট মুনাফা কমেছে ১০৮ কোটি টাকা।
শুধু এই প্রতিষ্ঠান নয়, ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার, ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজ, রেকিট বেনকিজার বাংলাদেশসহ আরও অনেক তালিকাভুক্ত কোম্পানির ব্যবসা থেকে আয় কমেছে। এটি দেখায় যে ভোক্তা চাহিদার সংকোচন শুধু ছোট ব্যবসাকে নয়, বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানকেও প্রভাবিত করছে। ভোক্তারা যখন ব্যয় কমিয়ে দেন, তখন দ্রুত ব্যবহার্য পণ্য, ইলেকট্রনিক পণ্য, নির্মাণসামগ্রীসহ নানা খাতে বিক্রি কমে যায়। এর প্রভাব উৎপাদন, মুনাফা, কর্মসংস্থান ও কর আদায়ে পড়ে।
ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার লিমিটেডের চেয়ারম্যান মাসুদ খানও ভোক্তাব্যয় কমে যাওয়াকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন। তার মতে, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে অনেক কোম্পানির প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হয়েছে। মানুষ এখন ব্যয় কাটছাঁট করছে, কারণ মূল্যস্ফীতি কমেনি; বরং ওই প্রান্তিকে আরও বেড়েছে। শুধু ভোক্তা পণ্য খাত নয়, সিমেন্টসহ বড় উৎপাদন খাতেও একই ধরনের ধীরগতি দেখা যাচ্ছে।
ব্যাংক খাতের ঋণপ্রবাহের দুর্বলতাও ব্যবসার জন্য বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে। বেসরকারি খাত সাধারণত স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি—দুই ধরনের ঋণের ওপর নির্ভর করে। দীর্ঘমেয়াদি ঋণ এখন প্রায় শূন্যের কোটায়। অনেক ব্যাংক স্বল্পমেয়াদি ঋণ দিতেও আগ্রহী নয়। কারণ তারা আশঙ্কা করছে, বর্তমান মন্দা পরিস্থিতিতে ঋণ দিলে তা ফেরত আসবে কি না। অথচ স্বল্পমেয়াদি ঋণ থেকেই অনেক কোম্পানি চলতি মূলধনের জোগান পায়। এই অর্থায়ন বন্ধ হয়ে গেলে উৎপাদন, মজুদ, সরবরাহ ও দৈনন্দিন পরিচালনা ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে।
বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, রাজস্ব সংকটকে শুধু কর প্রশাসনের সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে বৃহত্তর অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিফলন। ভোক্তার আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমলে বাজার দুর্বল হয়। বাজার দুর্বল হলে ব্যবসা কমে। ব্যবসা কমলে উৎপাদন ও আমদানি কমে। উৎপাদন ও আমদানি কমলে কর আদায় কমে। আর কর আদায় কমলে সরকার ঋণের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ফলে অর্থনীতির বিভিন্ন অংশ একে অন্যকে প্রভাবিত করে আরও জটিল পরিস্থিতি তৈরি করে।
এ অবস্থায় সরকারের কর আহরণ বাড়ানোর কৌশল হতে হবে ভারসাম্যপূর্ণ। বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে করজাল বাড়ানো, কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা, কর পরিশোধ সহজ করা এবং ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা, সুদহারের চাপ কমানো এবং উৎপাদন খাতে সহায়তা দেওয়া দরকার।
রাজস্ব বাড়াতে হলে অর্থনীতিকে আগে গতিশীল করতে হবে। কারণ ব্যবসা সচল না থাকলে রাজস্বও শক্তিশালী হবে না। তাই বর্তমান সংকটের সমাধান শুধু রাজস্ব বোর্ডের হাতে নেই; এটি আর্থিক খাত, মুদ্রানীতি, বিনিয়োগ পরিবেশ, বাজারব্যবস্থা এবং ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—সরকার কি শুধু রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাড়াবে, নাকি সেই রাজস্ব আয়ের ভিত্তি শক্তিশালী করার জন্য অর্থনীতির বাস্তব সমস্যাগুলো সমাধানে মনোযোগ দেবে? বর্তমান পরিসংখ্যান বলছে, ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি না ফিরলে রাজস্ব আহরণে বড় উন্নতি আশা করা কঠিন। আর রাজস্বে চাপ থাকলে ঋণনির্ভরতা বাড়বে, যা আগামী দিনের বাজেট ও সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

