বাংলাদেশে সন্ধ্যা নামলেই বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকে। শহরের বাসাবাড়ি, শিল্পকারখানা, দোকানপাট, হাসপাতাল, অফিস—সবখানেই তখন বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বেড়ে যায়। সাধারণ মানুষের চোখে বিষয়টি খুব সহজ: সুইচ চাপলেই আলো জ্বলবে, পাখা ঘুরবে, কারখানা চলবে। কিন্তু এই দৃশ্যের আড়ালে বিদ্যুৎ খাতে এমন এক আর্থিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যা এখন অর্থনীতিবিদ, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বড় প্রশ্ন তুলছে।
দেশে এমন অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, যেগুলো নিয়মিত পুরো সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। আবার কিছু কেন্দ্র আংশিকভাবে ব্যবহার হয়। এর পাশাপাশি কিছু কেন্দ্র আছে, যেগুলো অনেক সময় খুব কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, এমনকি কখনো কখনো উৎপাদন না করেও অর্থ পায়। এই অর্থকে বলা হয় সক্ষমতা মাশুল। অর্থাৎ কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র বিদ্যুৎ উৎপাদন করুক বা না করুক, জরুরি প্রয়োজনে উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত থাকলেই তাকে নির্দিষ্ট অর্থ দিতে হয়।
একসময় এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল বিদ্যুৎ ঘাটতি কমানোর জন্য। তখন দেশে লোডশেডিং ছিল বড় সমস্যা। শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছিল। সে সময় বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে উৎসাহিত করতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল, যে কোনো সময় প্রয়োজন হলে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে এবং দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা থেমে থাকবে না।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই জরুরি ব্যবস্থা এখন বড় আর্থিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গত দেড় দশকে অনেক বেড়েছে, কিন্তু প্রকৃত উৎপাদন ও ব্যবহার সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে দেশে স্থাপিত সক্ষমতার একটি অংশ অব্যবহৃত বা কম ব্যবহৃত থাকছে। অথচ এসব কেন্দ্রকে চুক্তি অনুযায়ী অর্থ দিতে হচ্ছে।
এই অবস্থায় মূল প্রশ্ন হলো—এই ব্যবস্থার সুবিধা কারা পাচ্ছে, আর ব্যয়ের ভার শেষ পর্যন্ত কার ওপর পড়ছে?
বিদ্যুৎ খাতের চুক্তিগত কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অনেক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়চুক্তির আওতায় পরিচালিত হয়। এসব চুক্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি কেন্দ্র প্রস্তুত রাখার জন্যও অর্থ প্রদানের বিধান থাকে। এর ফলে রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে দুই ধরনের ব্যয় বহন করতে হয়। একদিকে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম দিতে হয়, অন্যদিকে অব্যবহৃত বা কম ব্যবহৃত সক্ষমতার জন্যও অর্থ দিতে হয়।
এখানেই তৈরি হয়েছে বড় বিতর্ক। সমর্থকেরা বলছেন, অতীতে বিদ্যুৎ ঘাটতির সময়ে এই ব্যবস্থা ছাড়া দ্রুত উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো কঠিন ছিল। তাদের মতে, এই নীতি দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করেছে এবং লোডশেডিং কমাতে ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু সমালোচকদের মতে, যে ব্যবস্থা একসময় সংকট মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় ছিল, সেটিই এখন দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক বোঝায় পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও জ্বালানি ব্যবস্থা বিশেষজ্ঞ ড. ইকবাল হাসানের মতে, সমস্যাটি শুধু অতিরিক্ত সক্ষমতা নয়; এর সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবহার, চুক্তি, পরিকল্পনা ও আর্থিক দক্ষতার প্রশ্নও জড়িত। তাঁর বিশ্লেষণে বোঝা যায়, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ালেই সমাধান হয় না। বরং প্রকৃত চাহিদা, ব্যবহারযোগ্যতা এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তিকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা জরুরি।
এখানে আরেকটি বড় সমস্যা হলো বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর জ্বালানি কাঠামো। বিদ্যুৎ উৎপাদনে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা ও অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এসব জ্বালানির বড় অংশ আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়লেই বাংলাদেশের ভর্তুকি ব্যয়ও দ্রুত বেড়ে যায়।
এই কাঠামোকে অনেক বিশ্লেষক আমদানিনির্ভর ভর্তুকি ব্যবস্থা হিসেবে দেখছেন। কারণ এখানে বিদ্যুতের দাম সাধারণ মানুষের নাগালে রাখতে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়, কিন্তু সেই ভর্তুকির বড় অংশ আবার আমদানি ব্যয়, জ্বালানি মূল্য ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তিগত দায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা সরাসরি দেশের বাজেটের ওপর চাপ তৈরি করে।
সাধারণভাবে ভর্তুকিকে জনবান্ধব নীতি হিসেবে দেখা হয়। কারণ ভর্তুকি থাকলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম হঠাৎ করে খুব বেশি বাড়ে না। এতে সাধারণ পরিবার, ছোট ব্যবসা ও শিল্পকারখানা কিছুটা স্বস্তি পায়। মূল্যস্ফীতির চাপও কিছু সময়ের জন্য নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। কিন্তু এর একটি অদৃশ্য মূল্য আছে। সরকার যখন বড় অঙ্কের অর্থ ভর্তুকি হিসেবে ব্যয় করে, তখন সেই অর্থ অন্য খাতে ব্যয় করার সুযোগ কমে যায়।
স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, অবকাঠামো উন্নয়ন কিংবা সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগের জায়গা সংকুচিত হতে পারে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি দিয়ে স্বল্পমেয়াদে দাম নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করে। বিশেষ করে যখন সেই ভর্তুকির একটি অংশ অব্যবহৃত সক্ষমতা বা কম ব্যবহৃত কেন্দ্রের পেছনে যায়, তখন প্রশ্ন আরও জোরালো হয়।
অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করছেন, দীর্ঘদিন ধরে কৃত্রিমভাবে দাম নিয়ন্ত্রণ করলে বাজারে ভুল সংকেত তৈরি হতে পারে। এতে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী আচরণ উৎসাহিত হয় না, অদক্ষ উৎপাদন কাঠামো টিকে থাকে এবং বিনিয়োগের সঠিক দিকনির্দেশনা বাধাগ্রস্ত হয়। বিদ্যুৎ খাতে দক্ষতা, জ্বালানি সাশ্রয় এবং নবায়নযোগ্য উৎসে বিনিয়োগ বাড়ানোর বদলে পুরোনো ব্যয়বহুল ব্যবস্থাই চালু থাকে।
তবে বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকও। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহকে উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে। শিল্পায়ন, শহরায়ণ ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তাই অনেক সময় তাৎক্ষণিক বিদ্যুৎ নিরাপত্তাকে দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় দক্ষতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎ খাতে দ্রুত সক্ষমতা তৈরি হলেও চুক্তির আর্থিক দায় ভবিষ্যতের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এখন সংস্কার প্রয়োজন হলেও তা সহজ নয়। বিদ্যুৎ ভর্তুকি কমানো হলে বিদ্যুতের দাম বাড়তে পারে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে, শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচ বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হতে পারে। আবার বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চুক্তি পুনর্বিবেচনা করাও জটিল, কারণ এর সঙ্গে বিনিয়োগ, আইনগত বাধ্যবাধকতা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত জড়িত।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ গবেষণা কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক রৌফা খানুম মনে করেন, এই আলোচনা জলবায়ু পরিবর্তন ও জ্বালানি রূপান্তরের দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখা জরুরি। জীবাশ্ম জ্বালানিকেন্দ্রিক ভর্তুকি দীর্ঘদিন চলতে থাকলে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর বিলম্বিত হতে পারে। এতে ভবিষ্যতে রূপান্তরের খরচ আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
অন্যদিকে অংশগ্রহণমূলক গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্রের প্রধান নির্বাহী মো. শামসুদ্দোহা মনে করেন, জ্বালানি ভর্তুকি সংস্কার করতে হলে একসঙ্গে তিনটি বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে—জ্বালানি নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা এবং জলবায়ু সহনশীলতা। শুধু ভর্তুকি কমালেই সমাধান হবে না। দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর যেন অতিরিক্ত চাপ না পড়ে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের সামনে তাই একটি কঠিন ভারসাম্যের প্রশ্ন দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে হবে, শিল্প উৎপাদন সচল রাখতে হবে এবং সাধারণ মানুষের ওপর হঠাৎ ব্যয় চাপানো যাবে না। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর ক্রমবর্ধমান ভর্তুকির চাপ কমাতে হবে, বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি আরও বাস্তবভিত্তিক করতে হবে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির পথে এগোতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সক্ষমতা মাশুলের মতো ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়ানো। কোন বিদ্যুৎকেন্দ্র কত অর্থ পাচ্ছে, কত বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে, কত সময় অলস থাকছে এবং চুক্তির শর্ত কী—এসব তথ্য জনসমক্ষে আরও পরিষ্কারভাবে থাকা প্রয়োজন। কারণ শেষ পর্যন্ত এই ব্যয় জনগণের কর, সরকারি ঋণ কিংবা বিদ্যুতের দামের মাধ্যমে জনগণকেই বহন করতে হয়।
বিদ্যুৎ খাতে বাংলাদেশের অর্জন অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু সেই অর্জন ধরে রাখতে হলে ব্যয়ের কাঠামোও টেকসই হতে হবে। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো যেমন জরুরি, তেমনি সেই সক্ষমতার সঠিক ব্যবহার, চুক্তির জবাবদিহি, আমদানি নির্ভরতা কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোও জরুরি।
আজকের প্রশ্ন তাই শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের নয়। প্রশ্ন হলো—অব্যবহৃত সক্ষমতার মূল্য কে দিচ্ছে, কারা সুবিধা পাচ্ছে, আর বাংলাদেশ ভবিষ্যতের জন্য কোন ধরনের জ্বালানি অর্থনীতি গড়ে তুলতে চায়।

