বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কিন্তু বৈশ্বিক বাজারে এখন শুধু কম দামে পণ্য সরবরাহ করাই যথেষ্ট নয়। এখন বৈশ্বিক ক্রেতারা শুধু কম দামে পণ্য কেনার দিকে তাকিয়ে নেই; তারা জানতে চাইছে পণ্যটি কীভাবে তৈরি হচ্ছে, উৎপাদনে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ কতটা পরিচ্ছন্ন, এবং পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে কার্বন নিঃসরণ কতটা কমানো যাচ্ছে।এই নতুন বাস্তবতার মুখে বাংলাদেশের স্থানীয় পোশাক কারখানাগুলো এখন বড় ধরনের চাপের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানাগুলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা থেকে এখনো অনেক দূরে। উচ্চ স্থাপন ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণের খরচ, ছোট কারখানায় সীমিত ছাদ বা জায়গার সংকট, সচেতনতার ঘাটতি এবং নীতিগত জটিলতা এই অগ্রগতিকে ধীর করে রেখেছে। অথচ আন্তর্জাতিক বাজার, বিশেষ করে ইউরোপীয় বাজার, আগামী বছরগুলোতে আরও কঠোর পরিবেশগত শর্ত আরোপ করতে যাচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্পোরেট টেকসইতা বিষয়ক যথাযথ যাচাই নির্দেশনা গত বছর কার্যকর হয়েছে। এই নির্দেশনার প্রভাবে বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোর জন্য ২০৩৫ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ৩৫ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে সংগ্রহ করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পশ্চিমা বাজারে রপ্তানি অব্যাহত রাখতে হলে এই লক্ষ্য শুধু পরিবেশগত দায়িত্ব নয়, বরং ব্যবসায়িক টিকে থাকার শর্তেও পরিণত হতে পারে।
কিন্তু বাস্তব চিত্র অনেক পিছিয়ে। গবেষণা অনুযায়ী, বর্তমানে স্থানীয় পোশাক কারখানাগুলোর ব্যবহৃত বিদ্যুতের মাত্র ৩ শতাংশ আসে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। অর্থাৎ ২০৩৫ সালের ৩৫ শতাংশ লক্ষ্যের তুলনায় বর্তমান অবস্থান অত্যন্ত নিচু। এই ব্যবধান দেখায় যে সময় হাতে থাকলেও প্রস্তুতি এখনো যথেষ্ট নয়।
গবেষণাটি করেছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্রের ম্যাপড ইন বাংলাদেশ কর্মসূচি। গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের ৮৭৮টি কারখানার ওপর জরিপ চালিয়ে এই ফলাফল তৈরি করা হয়েছে। গতকাল শেরাটন ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, পোশাক খাত এখনো প্রচলিত বিদ্যুতের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
কারখানাগুলোর মোট জ্বালানি ব্যবহারের ৬১.৫ শতাংশ আসে জাতীয় গ্রিড থেকে। আর ৩৫.৫ শতাংশ আসে নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থার মাধ্যমে। এর অর্থ হলো কারখানাগুলো এখনো বিদ্যুৎ ব্যবহারে এমন উৎসের ওপর নির্ভর করছে, যেগুলোকে দ্রুত পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবস্থায় রূপান্তর করা সহজ কাজ নয়। জাতীয় গ্রিড নিজেই যদি পর্যাপ্তভাবে নবায়নযোগ্য না হয়, তাহলে শুধু কারখানার নিজস্ব উদ্যোগ দিয়ে বড় পরিবর্তন আনা কঠিন।
গবেষণায় অংশ নেওয়া ৮৮ শতাংশ কারখানা উচ্চ স্থাপন ব্যয়কে নবায়নযোগ্য জ্বালানি গ্রহণের বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছে। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা বসাতে প্রাথমিক বিনিয়োগ অনেক বেশি হওয়ায় অনেক কারখানা উদ্যোগ নিতে পারছে না। আরও ৪২ শতাংশ কারখানা রক্ষণাবেক্ষণের উচ্চ ব্যয়কে সমস্যা হিসেবে দেখেছে। এর বাইরে ২৮ শতাংশ সচেতনতার অভাব, ১৬ শতাংশ অনুকূল নীতির ঘাটতি এবং ১৪ শতাংশ ছোট কারখানায় জায়গার সংকটকে বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এই তথ্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো দেখায় সমস্যাটি শুধু প্রযুক্তিগত নয়। অর্থায়ন, নীতি, জ্ঞান, অবকাঠামো এবং ব্যবসায়িক সক্ষমতা—সবকিছু একসঙ্গে জড়িত। বড় কারখানাগুলো হয়তো ধীরে ধীরে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করতে পারবে, কিন্তু ছোট ও ক্ষুদ্র কারখানার জন্য একই পথে হাঁটা অনেক বেশি কঠিন। অথচ বাংলাদেশের পোশাক সরবরাহ শৃঙ্খলে ছোট ও মাঝারি কারখানার ভূমিকা অত্যন্ত বড়।
জেলার ভিত্তিতেও পার্থক্য স্পষ্ট। গবেষণায় দেখা গেছে, গাজীপুরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ৩.৬ শতাংশ, কিন্তু নারায়ণগঞ্জে তা মাত্র ০.৯ শতাংশ। এই পার্থক্য দেখায় যে একই শিল্প খাতের ভেতরেও অঞ্চলভেদে অবকাঠামো, কারখানার আকার, বিনিয়োগ সক্ষমতা এবং নীতি বাস্তবায়নের প্রভাব ভিন্ন হতে পারে। ফলে একক নীতি দিয়ে পুরো খাতের সমস্যা সমাধান করা কঠিন হতে পারে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, জরিপভুক্ত কারখানাগুলোর মোট মেঝের আয়তন ১৫৫,০৬৫,৩৯৮ বর্গফুট। এর মধ্যে সৌর প্যানেল বসানোর জন্য ব্যবহারযোগ্য জায়গা প্রায় ৯,০৭৩,০৮৯ বর্গফুট। প্রতি এক বর্গফুট সৌর প্যানেল মাসে প্রায় ১.১০ কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। এই হিসাব ধরে ব্যবহারযোগ্য জায়গা পুরোপুরি কাজে লাগালে মাসে সর্বোচ্চ ৬৯,৮৬২,২৭৮.৫ কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এতে কার্বন নিঃসরণ প্রায় ৯.৮৪ শতাংশ কমতে পারে।
এই সম্ভাবনা আশাব্যঞ্জক হলেও সীমাবদ্ধতাও পরিষ্কার। মোট মেঝের মাত্র ৫.৮ শতাংশ জায়গা সৌর প্যানেল স্থাপনের জন্য উপযোগী। এমনকি সব ব্যবহারযোগ্য ছাদ বা জায়গা কাজে লাগালেও বর্তমান দক্ষতায় মোট জ্বালানি চাহিদার মাত্র ১৪ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ শুধু ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে ৩৫ শতাংশ লক্ষ্যে পৌঁছানো যাবে না। এর জন্য জাতীয় গ্রিডকে পরিচ্ছন্ন করা, কারখানার বাইরে থেকে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সংগ্রহের সুযোগ তৈরি করা এবং শক্তি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৮০ শতাংশ কারখানা তাদের মোট জ্বালানির ১ শতাংশেরও কম নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পায়। মাত্র ৫ শতাংশ কারখানা ১০ শতাংশের বেশি জ্বালানি নবায়নযোগ্য উৎস থেকে সংগ্রহ করে। বড় কারখানাগুলো কিছুটা বৈচিত্র্যময় জ্বালানি ব্যবহার করলেও ছোট ও ক্ষুদ্র কারখানাগুলো এখনো জাতীয় গ্রিডের ওপর বেশি নির্ভরশীল। এসব ছোট কারখানায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের হার ১ শতাংশের নিচে।
এই চিত্র রপ্তানি বাজারের জন্য সতর্কবার্তা। কারণ আন্তর্জাতিক ক্রেতারা শুধু বড় কারখানার তথ্য দেখবে না। তারা পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলের কার্বন পদচিহ্ন জানতে চাইবে। কোনো বড় রপ্তানিকারকের সঙ্গে যুক্ত ছোট কারখানা যদি পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে পিছিয়ে থাকে, তাহলে সেটিও সামগ্রিক মূল্যায়নে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি আর শুধু পরিবেশবান্ধব ভাবমূর্তির বিষয় নয়; এটি বাজারে প্রবেশাধিকার, ক্রেতার আস্থা এবং ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
জরিপভুক্ত কারখানাগুলো প্রতি মাসে প্রায় ৭০.২ মিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। এতে আনুমানিক ৪৬.১ মিলিয়ন কেজি কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হয়। এই পরিমাণ নিঃসরণ কমানো গেলে শুধু পরিবেশগত সুবিধাই হবে না, বরং ভবিষ্যতে কার্বন-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক নীতি, ক্রেতার শর্ত এবং সম্ভাব্য অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপও কমানো সম্ভব হবে।
গবেষকেরা বলেছেন, বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে আরও উচ্চাভিলাষী রূপান্তরের পথে এগোচ্ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫ এবং হালনাগাদ জলবায়ু প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে শিল্প খাতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার প্রসারকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে নীতি ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবায়নের ব্যবধান কমানো না গেলে পোশাক খাত কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারবে না।
গবেষণায় বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক খাতের জন্য সবুজ অর্থায়ন ব্যবস্থা চালু করা, সৌরবিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির জন্য সহজ ঋণ দেওয়া, শিল্প যন্ত্রপাতির জ্বালানি মান নির্ধারণ করা, কারখানা পর্যায়ে জ্বালানি ও কার্বন প্রতিবেদন ব্যবস্থা তৈরি করা এবং যাচাইকৃত নিঃসরণ হ্রাসে কার্বন ঋণ ও কার্বন বিনিময় ব্যবস্থাকে কাজে লাগানো। এছাড়া পোশাক খাতের জ্বালানি রূপান্তরের জন্য বিশেষ কর্মদল এবং অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে স্বাধীন সংস্থা গঠনের কথাও বলা হয়েছে।
আরও বড় পরিসরে গবেষকেরা জাতীয় গ্রিডকে কার্বননির্ভরতা থেকে ধীরে ধীরে সরিয়ে আনার কথা বলেছেন। কারণ কারখানা যদি গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, আর সেই বিদ্যুৎ যদি প্রধানত জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে আসে, তাহলে কারখানার নিজস্ব প্রচেষ্টার সীমা থাকবে। একই সঙ্গে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বাড়ানো, কারখানার বাইরে থেকে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ কেনার সুযোগ তৈরি করা, জ্বালানি সাশ্রয়ী মেশিন ব্যবহার করা এবং ডিজেলনির্ভরতা কমাতে মিশ্র ব্যবস্থা, ব্যাটারি ও দক্ষ নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সহসভাপতি বিদিয়া অমৃত খান বলেছেন, বর্তমানে ৪.৭৫ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদিত হচ্ছে। তাঁর মতে, সরকারের নীতিগত সহায়তা আগামী বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হলে ২০৩৫ সালের ৩৫ শতাংশ লক্ষ্যে পৌঁছানো কঠিন হবে না। এই বক্তব্য আশাবাদী, তবে বাস্তবায়নের প্রশ্নটি এখানে সবচেয়ে বড়। কারণ নীতি সহায়তা কাগজে থাকলেই হবে না; তা কারখানার দরজায় পৌঁছাতে হবে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ সৌর প্যানেল ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহারের কথা বলেছেন। এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে স্থাপন ব্যয়ের চাপ কিছুটা কমতে পারে। তবে শুধু শুল্ক ছাড় যথেষ্ট হবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, সহজ ঋণ, কারিগরি সহায়তা, নির্ভরযোগ্য নীতি, এবং ছোট কারখানাগুলোর জন্য আলাদা সহায়তা কাঠামো।
সব মিলিয়ে গবেষণাটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। ২০৩৫ সালের লক্ষ্য দূরের মনে হলেও শিল্প রূপান্তরের জন্য সময় খুব বেশি নেই। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে এখনই বড় পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে রপ্তানি বাজারে চাপ বাড়তে পারে। বাংলাদেশের পোশাক খাত অতীতে শ্রম, নিরাপত্তা ও উৎপাদন দক্ষতায় বড় পরিবর্তন এনেছে। এবার চ্যালেঞ্জ হলো জ্বালানি ও কার্বন ব্যবস্থাপনায় একই ধরনের রূপান্তর দেখানো।
এই রূপান্তর সফল হলে বাংলাদেশ শুধু পরিবেশগত দায় পূরণ করবে না, বরং বৈশ্বিক বাজারে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে। কিন্তু ব্যর্থ হলে সস্তা উৎপাদনের পুরোনো সুবিধা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যেতে পারে। তাই সবুজ জ্বালানি এখন আর ভবিষ্যতের আলোচনা নয়; এটি বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের বর্তমান সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু।

