বিশ্ব আবারও এক ভয়ংকর সংক্রামক রোগের সামনে দাঁড়িয়ে। গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রকে কেন্দ্র করে নতুন ইবোলা প্রাদুর্ভাব দ্রুত উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ১৯ মে ২০২৬ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার আফ্রিকা রোগনিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র কঙ্গোতে নতুন ইবোলা প্রাদুর্ভাবের কথা নিশ্চিত করে। এর মাত্র দুই দিনের মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করে। ভাইরাসটি এরই মধ্যে উগান্ডায়ও ছড়িয়ে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রাথমিক হিসাবেই সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়েছে এবং মৃত্যুর সংখ্যা ১৩০-এর বেশি। এই সংখ্যা শুধু বর্তমান সংকটের ভয়াবহতা বোঝায় না, বরং আরও বড় একটি আশঙ্কার ইঙ্গিত দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যুর তথ্য সামনে আসা মানে ভাইরাসটি হয়তো কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাস ধরে নীরবে ছড়িয়ে পড়ছিল। অর্থাৎ বিশ্ব যখন আনুষ্ঠানিকভাবে সংকটটি দেখতে পেল, তখন পরিস্থিতি অনেক দূর এগিয়ে গেছে।
কেন্দ্রীয় ও পশ্চিম আফ্রিকা এর আগে বহুবার ইবোলার মুখোমুখি হয়েছে। তাই অভিজ্ঞতার ঘাটতি নেই। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। কারণ প্রাদুর্ভাবটি এমন সময়ে ঘটছে, যখন বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সহযোগিতা আগের তুলনায় দুর্বল ও বিভক্ত। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্ত—যেমন আন্তর্জাতিক সহায়তা কমানো, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে সরে যাওয়া এবং নিজ দেশের রোগনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় নেতৃত্ব ও বিশেষজ্ঞ সংকট—এই সংকট মোকাবিলাকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
এই প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্র হিসেবে কঙ্গোর দুটি খনি শহর মংবওয়ালু ও রওয়ামপারা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধরনের খনি এলাকায় মানুষের যাতায়াত বেশি থাকে, বাইরে থেকে শ্রমিক আসে, আবার স্থানীয় মানুষও বিভিন্ন অঞ্চলে চলাচল করে। ফলে সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার আগেই তা অনেক জায়গায় পৌঁছে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তার ওপর ওই অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ অনিয়মিত, পরীক্ষার ব্যবস্থা সীমিত এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতিও জটিল। সশস্ত্র সংঘাত ও অস্থিরতা অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে যেতে নিরুৎসাহিত করতে পারে। এতে রোগ শনাক্তকরণ দেরি হয়, আর দেরি মানেই সংক্রমণের শিকল আরও দীর্ঘ হয়।
ইবোলার আরেকটি বড় সমস্যা হলো, প্রথম দিকের উপসর্গ অনেক সময় ম্যালেরিয়া বা টাইফয়েডের মতো রোগের সঙ্গে মিলে যায়। জ্বর, দুর্বলতা, শরীর ব্যথা—এসব লক্ষণ দেখে শুরুতে বোঝা কঠিন হতে পারে এটি ইবোলা নাকি অন্য কোনো সাধারণ সংক্রমণ। কঙ্গোর ওই অঞ্চলে ম্যালেরিয়া ও টাইফয়েডও প্রচলিত। ফলে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা শুরুতেই ইবোলা সন্দেহ না করলে রোগটি সহজেই নজর এড়িয়ে যেতে পারে।
এবারের প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী ধরনটি বুন্দিবুগিও নামে পরিচিত। এই ধরন শনাক্ত করাও তুলনামূলক কঠিন। সাধারণ ইবোলা ধরন শনাক্তে যে দ্রুত পরীক্ষাগুলো বেশি ব্যবহৃত হয়, সেগুলো এই ধরন ধরতে ব্যর্থ হতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুরুর কিছু পরীক্ষায় ফল নেগেটিভ এসেছিল। এতে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়েছে। আরও জটিল বিষয় হলো, নির্ভুল পরীক্ষা করতে যে উন্নত পরীক্ষাগার দরকার, তা প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে। নমুনা সংগ্রহ থেকে নিশ্চিত ফল পাওয়া পর্যন্ত সময় বাড়লে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের সুযোগ কমে যায়।
চিকিৎসা ও প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বুন্দিবুগিও ধরনের জন্য অনুমোদিত টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। আগে ইবোলা মোকাবিলায় টিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, কিন্তু সেই সুবিধা এখানে সরাসরি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সংক্রমণ ঠেকাতে এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হচ্ছে রোগী শনাক্ত, পৃথকীকরণ, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খোঁজ, সীমান্ত পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বিশ্বাসভিত্তিক যোগাযোগে।
এখানেই আন্তর্জাতিক সহায়তার গুরুত্ব সামনে আসে। ২০১৪ সালে পশ্চিম আফ্রিকায় ভয়াবহ ইবোলা প্রাদুর্ভাবে আক্রান্তের সংখ্যা ২৮,০০০ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা, যুক্তরাষ্ট্রের রোগনিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যৌথভাবে বড় ভূমিকা রেখেছিল। ২০১৮ সালেও কঙ্গোতে ইবোলা দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত বিশেষজ্ঞ দল পাঠিয়েছিল এবং পরীক্ষামূলক এক ডোজের টিকা ব্যবহারে সহযোগিতা করেছিল।
কিন্তু ২০২৬ সালের বাস্তবতা ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কমে যাওয়ায় কঙ্গোর মতো দেশগুলোর স্বাস্থ্যব্যবস্থা বড় ধাক্কা খেয়েছে। ২০২৪ সালে কঙ্গোর বৈদেশিক সহায়তার প্রায় ১.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, অর্থাৎ ৭০ শতাংশের বেশি, এসেছিল যুক্তরাষ্ট্র থেকে। পরে সেই সহায়তা কমে যায়। এর প্রভাব সরাসরি গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ওষুধ সরবরাহ, পরীক্ষাগার, নজরদারি ব্যবস্থা এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবায় পড়েছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্তের যুক্তি হিসেবে অতিমারি ব্যবস্থাপনায় সংস্থাটির ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করে। কিন্তু বাস্তবে এর ফলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তার সবচেয়ে বড় অর্থদাতা ও প্রভাবশালী অংশীদারকে হারায়। জরুরি স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে এই অনুপস্থিতি বড় ফাঁক তৈরি করেছে। বিশেষ করে আফ্রিকার মতো অঞ্চলে, যেখানে দ্রুত অর্থ, জনবল, সরঞ্জাম ও সমন্বয় দরকার হয়, সেখানে এই শূন্যতা সংকটকে আরও গভীর করে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এ বছর শতাধিক জীবনরক্ষাকারী বৈদেশিক সহায়তা কর্মসূচির অর্থায়ন নবায়ন করেনি। এর মধ্যে এমন একটি কর্মসূচিও ছিল, যা বর্তমান প্রাদুর্ভাবের অঞ্চলে জরুরি স্বাস্থ্য সহায়তা দিত। ওই কর্মসূচির অর্থায়ন মার্চে শেষ হয়। ফেব্রুয়ারিতে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র ও কঙ্গো একটি কৌশলগত স্বাস্থ্য অংশীদারত্বে সম্মত হয়, যার আওতায় সংক্রামক রোগসহ স্বাস্থ্য খাতে আগামী পাঁচ বছরে ৯০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু চলমান সংকটের তুলনায় তা কত দ্রুত এবং কত কার্যকরভাবে কাজে লাগবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
যুক্তরাষ্ট্রের পিছু হটার মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ কিছু ধনী দেশ সহায়তার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী পাঠানোর জন্য মজুত প্রস্তুত রেখেছে বলে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকার দেশগুলোর নিজেদের অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। কঙ্গো গত ডিসেম্বরেই আরেকটি ইবোলা প্রাদুর্ভাবের সমাপ্তি ঘোষণা করেছিল। অর্থাৎ স্থানীয় দক্ষতা আছে। কিন্তু ইবোলার মতো কঠিন রোগে শুধু স্থানীয় অভিজ্ঞতা যথেষ্ট নয়; দ্রুত আন্তর্জাতিক সমন্বয়ও দরকার।
বর্তমান প্রাদুর্ভাবের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো সংক্রমণের শিকল হারিয়ে ফেলার ঝুঁকি। ইবোলা নিয়ন্ত্রণের মূল কৌশল হলো আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত শনাক্ত করা, তাকে পৃথক রাখা এবং তার সংস্পর্শে আসা প্রত্যেক ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা। কিন্তু যখন আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যায়, সংক্রমণ একাধিক দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং অঞ্চলগুলো শত শত মাইল দূরে থাকে, তখন এই কাজ প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় আক্রান্ত শনাক্ত হওয়া পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
ইবোলা খুব নির্মম রোগ। সামান্য ভুল, একটি অশনাক্ত রোগী, একটি বাদ পড়া সংস্পর্শ—এসব থেকেই নতুন ক্লাস্টার তৈরি হতে পারে। তাই এই রোগ নিয়ন্ত্রণে সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা প্রায় নিখুঁত হতে হয়। কিন্তু এবার প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে দেরিতে, আর বৈশ্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা আগের মতো একত্র নয়। ফলে সামনে পথ দীর্ঘ ও কঠিন হতে পারে।
এই প্রাদুর্ভাব শুধু কঙ্গো বা উগান্ডার সমস্যা নয়। এটি দেখিয়ে দিচ্ছে, সংক্রামক রোগ কোনো সীমান্ত মানে না। যে দেশগুলো আজ দূরে আছে, কাল তারাও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। তাই ইবোলা মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো দ্রুত সহযোগিতা, স্বচ্ছ তথ্য বিনিময়, স্থানীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নেতৃত্বে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া। কিন্তু ঠিক এই জায়গাতেই এখন সবচেয়ে বেশি ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত এই সংকট একটি বড় শিক্ষা দিচ্ছে। জনস্বাস্থ্য শুধু হাসপাতাল, ওষুধ বা পরীক্ষাগারের বিষয় নয়; এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং মানবিক দায়বদ্ধতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। ইবোলার নতুন প্রাদুর্ভাব যত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে, তত কম প্রাণহানি হবে। কিন্তু যদি বিশ্ব আবারও দেরি করে, তাহলে এই সংকট শুধু আফ্রিকার সীমান্তে আটকে থাকবে না; এটি বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও আরও নগ্ন করে দেবে।

