মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আশঙ্কা যখন ক্রমেই বাড়ছিল, ঠিক তখনই নতুন এক তথ্য সামনে এসেছে। পবিত্র হজ মৌসুমকে সামনে রেখে ইরানের ওপর পরিকল্পিত সামরিক হামলা আপাতত স্থগিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোর সতর্কবার্তা, মুসলিম বিশ্বের সম্ভাব্য ক্ষোভ এবং বৈশ্বিক বিমান চলাচল বিপর্যয়ের আশঙ্কাই এই সিদ্ধান্তের পেছনে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি সপ্তাহে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক পদক্ষেপের পরিকল্পনা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। তবে সৌদি আরব, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় মিত্রদের পক্ষ থেকে কড়া সতর্কতা আসার পর শেষ মুহূর্তে সেই পরিকল্পনা স্থগিত করা হয়।
ওই সতর্কবার্তায় বলা হয়, হজের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় সময়ের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে পুরো মুসলিম বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। শুধু রাজনৈতিক ক্ষতি নয়, এতে ভয়াবহ মানবিক ও লজিস্টিক সংকটও তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কারণ, প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখ লাখ মুসল্লি হজ পালনের জন্য সৌদি আরবে যান। চলতি বছরের হজ আগামী ২৪ মে থেকে শুরু হওয়ার কথা এবং এরই মধ্যে বহু হজযাত্রী সৌদি আরবে পৌঁছে গেছেন। যুদ্ধ শুরু হলে বিমান চলাচল, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারত।
উপসাগরীয় কর্মকর্তাদের আশঙ্কা ছিল, ইরানের ওপর হামলা হলে পুরো অঞ্চলে পাল্টা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়বে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন সংঘাত শুরু হলে তেল সরবরাহ, বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ব্যবস্থায় বড় ধাক্কা লাগতে পারত।
মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সূত্রও জানিয়েছে, ট্রাম্পকে তাঁর নিজের কর্মকর্তারাও সতর্ক করেছিলেন। তারা বলেন, এই মুহূর্তে নতুন যুদ্ধ শুরু হলে শুধু আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াই নয়, ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মুসলিম বিশ্বের মানুষের কাছে যুক্তরাষ্ট্র আরও নেতিবাচক বার্তা দিত।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন বুঝতে পেরেছে যে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি বড় সংঘাত এখন শুধু সামরিক বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, জ্বালানি, কূটনীতি এবং বৈশ্বিক জনমতের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।
এরই মধ্যে ইরানও কঠোর বার্তা দিয়ে রেখেছে। তেহরান স্পষ্ট জানিয়েছে, তাদের জ্বালানি বা বেসামরিক অবকাঠামোতে নতুন হামলা হলে তারা উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। এমনকি সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে ইরান।
এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরব, কাতার ও ওমানের মতো দেশগুলো দ্রুত কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে। কারণ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে উপসাগরীয় অর্থনীতি। বিশেষ করে তেল ও তরলীকৃত গ্যাস রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর জন্য এটি বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মজার বিষয় হলো, ট্রাম্প নিজেও সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছেন যে উপসাগরীয় নেতাদের অনুরোধেই তিনি হামলার পরিকল্পনা স্থগিত করেছেন। তিনি দাবি করেন, আঞ্চলিক নেতারা এখনো বিশ্বাস করেন আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব।
তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত হয়ে গেছে—এমনটা মনে করছেন না বিশ্লেষকেরা। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, হজ মৌসুম শেষ হওয়ার পর আবারও সামরিক উত্তেজনা বাড়তে পারে। কারণ ইসরায়েল এখনো ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ধরে রেখেছে এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রকে আরও শক্ত অবস্থান নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে।
এদিকে মার্কিন সামরিক মহলেও উদ্বেগ বাড়ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন হামলা শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রকে কঠিন প্রতিরোধের মুখে পড়তে হতে পারে। বিশেষ করে ইরানের উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং বিপুল ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে পেন্টাগনের ভেতরেও আলোচনা চলছে।
সব মিলিয়ে, হজকে ঘিরে আপাতত যুদ্ধের ঝুঁকি কিছুটা কমলেও মধ্যপ্রাচ্যের সংকট এখনো পুরোপুরি থামেনি। বরং কূটনীতি, সামরিক চাপ এবং আঞ্চলিক স্বার্থের জটিল সমীকরণের মধ্যে পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠছে।

