পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশজুড়ে ফ্রিজের বাজারে তৈরি হয়েছে নতুন গতি। কোরবানির পশুর মাংস সংরক্ষণের প্রয়োজন বাড়ায় শোরুমগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে। কোথাও কোথাও ফ্রিজ কেনার পর বিল পরিশোধের জন্য ক্রেতাদের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতেও দেখা যাচ্ছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবার অনেক ব্র্যান্ডের ফ্রিজ বিক্রি গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বিশেষ করে বড় আকারের এবং ইনভার্টার প্রযুক্তির ফ্রিজের চাহিদা বেশি।
দেশে ফ্রিজ বিক্রির নির্দিষ্ট সরকারি পরিসংখ্যান না থাকলেও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ফ্রিজ বাজারের আকার প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। বছরে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ ফ্রিজ বিক্রি হয়। এর মধ্যে কোরবানির ঈদেই বিক্রি হয় প্রায় ৯ থেকে ১০ লাখ ইউনিট। ফলে বলা যায়, ফ্রিজ বিক্রির সবচেয়ে বড় মৌসুম এই সময়টাই। মোট বিক্রির প্রায় ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ আসে শুধু কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে। দুই ঈদ মিলিয়ে এই হার দাঁড়ায় প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, কোরবানির সময় একসঙ্গে মাংস সংরক্ষণের চাপ তৈরি হওয়ায় অনেক পরিবার নতুন ফ্রিজ বা ডিপ ফ্রিজ কেনেন।
বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত ফ্রিজের প্রায় ৯০ শতাংশই দেশীয়ভাবে উৎপাদিত হচ্ছে। বাজারটি বছরে গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ হারে বড় হচ্ছে। একই সঙ্গে রপ্তানিও হচ্ছে কিছু পরিমাণ ফ্রিজ। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ভবিষ্যতে এই বাজার আরও বড় হবে এবং গ্রামীণ এলাকা হবে প্রধান চাহিদার কেন্দ্র।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল জানান, মানুষের আয় বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা বাড়ায় ফ্রিজ এখন প্রয়োজনীয় পণ্যে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, শুধু গৃহস্থালি নয়, বাণিজ্যিক ও শিল্প খাতেও এর ব্যবহার বাড়ছে।
অন্যদিকে মিনিস্টার গ্রুপের হেড অব প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ার মনিরুল হাসান স্বপন জানান, দেশের রেফ্রিজারেটর বাজার এখন ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি। প্রতিবছর এটি গড়ে ১০ থেকে ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে এবং বছরে প্রায় ৩৩ থেকে ৩৫ লাখ ইউনিট বিক্রি হচ্ছে।
ঈদকে ঘিরে দেশীয় ব্র্যান্ড ভিশন ফ্রিজের বিক্রি প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন আরএফএল ইলেকট্রনিক্সের রেফ্রিজারেটর ও এয়ার কন্ডিশনার ইউনিটের নির্বাহী পরিচালক মো. নুর আলম। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক চাপ থাকলেও চাহিদা কমেনি। বড় আকারের ফ্রিজের পাশাপাশি আধুনিক ফিচারযুক্ত মডেলের চাহিদা বেশি। তিনি আরও জানান, কোরবানির আগে শেষ কয়েক দিনে বিক্রি আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামে উন্নত মানের পণ্য এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে ভিশন ফ্রিজের প্রতি গ্রাহকদের আগ্রহ বেড়েছে।
মিনিস্টার গ্রুপের কর্মকর্তাদের মতে, কোরবানির ঈদ সামনে রেখে তাদের ফ্রিজের বিক্রি প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। তবে কাঁচামাল সংগ্রহে ব্যাংক সহায়তা কম থাকায় কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ক্রেতারা এখন আধুনিক ডিজাইন, ইনভার্টার প্রযুক্তি, ডিজিটাল ডিসপ্লে ও কম বিদ্যুৎ খরচের ফ্রিজ বেশি পছন্দ করছেন বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে বাজারে শক্ত অবস্থানে থাকা ওয়ালটন ফ্রিজের বিক্রিও বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির চিফ বিজনেস অফিসার মো. তাহসিনুল হক জানান, দুই ঈদ মিলিয়ে বছরের প্রায় ৭০ শতাংশ ফ্রিজ বিক্রি হয়। এবারও বিক্রি ইতিবাচক অবস্থায় রয়েছে।
রাজধানীর বিভিন্ন শোরুমে বিক্রির মিশ্র চিত্র পাওয়া গেছে। কোথাও বিক্রি ভালো, কোথাও তুলনামূলক ধীর। একটি বড় ইলেকট্রনিক শোরুমের ব্যবস্থাপক জানান, গত বছরের তুলনায় এখন পর্যন্ত বিক্রি ৫ থেকে ১০ শতাংশ বেশি। তবে অন্য কিছু শোরুমের ব্যবস্থাপকরা জানিয়েছেন, এখনো বিক্রি পুরোপুরি জমে ওঠেনি। মূল বিক্রি ঈদের আগের কয়েকদিনেই হয় বলে তারা আশা করছেন। বিক্রেতারা বলছেন, বিভিন্ন অফার ও প্রচারণা দিয়ে ক্রেতা আকর্ষণের চেষ্টা চলছে।
শাহীনবাগের এক ক্রেতা জানান, পুরোনো ফ্রিজ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে নতুন ফ্রিজ কিনতে হয়েছে। অন্যদিকে ফার্মগেট এলাকার এক ক্রেতা জানান, এবার কোরবানি ঢাকায় হওয়ায় বড় ফ্রিজ প্রয়োজন ছিল, তাই নতুন ফ্রিজ কেনা হয়েছে। আরেক ক্রেতা বলেন, ভালো মানের ডাবল ডোর ফ্রিজের দাম এখন এক লাখ টাকার ওপরে, যা মধ্যবিত্তের জন্য চাপ সৃষ্টি করছে।

