বর্তমান সরকারের শুরু থেকেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সংকটের মধ্যে রয়েছে। পরিস্থিতি তিরস্কার করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছেন।
কিছু দিন পর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার ফলে হরমুজ প্রণালী, যা দেশকে জ্বালানির ‘লাইফ লাইন’ হিসেবে পরিচিত, বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ মহাসংকটে পড়ে যায়। দেশের জ্বালানি ব্যবস্থা এখন টালমাটাল। মন্ত্রণালয় জানাচ্ছে, জুন পর্যন্ত তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকারের কাছে ৬৫ থেকে ৭৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ বা ভর্তুকি প্রয়োজন। এর মধ্যে জ্বালানি খাতে দর পড়ছে ৩১ হাজার কোটি টাকা, বাকি অর্থ বিদ্যুৎ খাতের জন্য।
আজ মঙ্গলবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে জরুরি বৈঠক হবে। এতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের দুই সচিব উপস্থিত থাকবেন। সূত্রের খবর, বৈঠকে তেল ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির বিষয়ও আলোচিত হতে পারে। যদিও বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু মন্তব্য করতে রাজি হননি। জ্বালানি সচিব মো. সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও পেট্রোবাংলাকে ভর্তুকি দেওয়া লাগবে। এতে সরকারের বাজেটের উপর চাপ বাড়ছে।
গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম কমপক্ষে ১ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। অর্থমন্ত্রী ১১ এপ্রিল ওয়াশিংটনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বৈঠকে যোগ দেবেন। সেখানে বিদ্যুৎ ও তেলের দাম বৃদ্ধি, পাশাপাশি অন্যান্য অর্থনৈতিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা হবে। ততক্ষণে অর্থ মন্ত্রণালয় মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ এবং অন্যান্য কারণে দেশের অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে।
তেলের দাম ও ভর্তুকি সংকট:
যুদ্ধের কারণে তেল পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে। গত সপ্তাহে বিপিসি ডিজেল কিনেছে প্রতি লিটার ১৮০ টাকার বেশি দিয়ে, কিন্তু দেশের বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে মাত্র ১০০ টাকায়। ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত প্রতিমাসে চার হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি প্রয়োজন হবে।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির আগে ও পরে ২০ মার্চ পর্যন্ত বিপিসির বিক্রি করা ডিজেলের গড় মূল্য ছিল ১৫৫ টাকা। সরকার এ দাম ধরে না দিয়ে ১০০ টাকায় বিক্রি করছে। এর ফলে এপ্রিলেই তেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তবে অনুমোদন মেলেনি।
এলএনজি আমদানি সংকট:
সরকারকে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) কিনতে হচ্ছে দ্বিগুণ দামে, বিশেষ করে স্পট মার্কেট থেকে। ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতি ইউনিট ৯–১০ ডলারে এলএনজি কিনেছে পেট্রোবাংলা। এখন যুদ্ধের কারণে একই এলএনজি কিনতে হচ্ছে প্রতি ইউনিট ২০–২৮ ডলারে।
কাতার ও ওমানের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ বন্ধ থাকায় স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। এর ফলে গ্যাসের প্রতি ইউনিট খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ টাকা ২০ পয়সায়। বিক্রির মাধ্যমে সরকারের ক্ষতি পড়ছে প্রতি ইউনিট ৮ টাকা ৭৪ পয়সা। মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত পেট্রোবাংলার ভর্তুকির প্রয়োজন পড়বে ১৪ হাজার কোটি টাকা।
বিদ্যুৎ খাতের সংকট:
বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণের খরচ প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় প্রায় ১৩ টাকা হলেও বিক্রি হচ্ছে ৫.৭২ টাকায়। এই ব্যবধানের কারণে পিডিবি, বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানি ও অন্যান্য খাতের সঙ্গে লেনদেনে গত অর্থবছরে ১৭ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ৪০–৪৫ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি দরকার হবে। এর মধ্যে বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানি ও আইপিপিকে বিদ্যুৎ কিনে লোকসান পরবে ৪৫ হাজার কোটি টাকা, এবং পিডিবি অন্য খাত থেকে ১৬ হাজার কোটি টাকার লোকসান নিরূপণ করেছে।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে কয়লার দাম বেড়ে ৬০–৬৫ ডলারের পরিবর্তে ৮০ ডলারের কাছাকাছি চলে গেছে। অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হয়ে বিদ্যুতের জন্য প্রয়োজন পড়বে ৬৫ হাজার কোটি টাকার মতো। যদিও অর্থ মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত ৩৬ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এক কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, সব হিসাব সোমবার রাতে চূড়ান্ত করা হবে এবং এরপর পুরো চিত্র অর্থমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরা হবে।

