২০২৫ সালের ২ এপ্রিল বিশ্ববাণিজ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নেয়। সেদিন যুক্তরাষ্ট্র ১৫৭টি দেশের পণ্যের ওপর বিভিন্ন হারে পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়। এই সিদ্ধান্ত নেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুল্ক আরোপের বিষয়টি আকস্মিক ছিল না। নির্বাচনী প্রচারণার সময়ই ট্রাম্প স্পষ্ট করে জানিয়েছিলেন, ক্ষমতায় গেলে তিনি আমদানিনির্ভর বাণিজ্যনীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবেন।
শুল্ক আরোপের ঘোষণায় ট্রাম্প বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজার সুবিধা নিয়েছে। তাঁর ভাষায়, “অন্যরা আমেরিকাকে ছিঁড়ে খেয়েছে।” এই পাল্টা শুল্ককে তিনি সেই অবস্থার অবসান হিসেবে দেখেন। এমনকি দিনটিকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক ধরনের ‘স্বাধীনতা দিবস’ বলেও অভিহিত করেন। এতে তাঁর সমর্থকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা গেলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তৈরি হয় তীব্র প্রতিক্রিয়া।
ঘোষণার পরপরই আইনি বিতর্ক শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট এই পাল্টা শুল্ক আরোপকে অবৈধ ঘোষণা করে। আদালতের এই সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় ধাক্কা হলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পিছিয়ে যাওয়ার মানুষ নন। আদালতের রায়ের পর তিনি ভিন্ন আইনি কাঠামো ব্যবহার করে নতুন করে সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন।
এই ঘটনাপ্রবাহ বিশ্ববাণিজ্য ব্যবস্থাকে আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও বাণিজ্য বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, একের পর এক শুল্ক আরোপ ও পাল্টা ব্যবস্থার ফলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমতে পারে, যা বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ–এর মতো রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার। শুল্ক কাঠামোর পরিবর্তনে রপ্তানি ব্যয় বাড়তে পারে এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তাই বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বাংলাদেশকে এখনই বিকল্প বাজার, নতুন বাণিজ্য অংশীদার এবং পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর কৌশল নিয়ে ভাবতে হবে।
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কনীতি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নয়; এটি বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার জন্যও একটি বড় পরীক্ষা। এই অনিশ্চিত বাস্তবতায় কোন দেশ কতটা দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে নিজেদের কৌশল বদলাতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।
পাল্টা শুল্ক কী এবং কেন এ নীতি
বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বহু দেশের রপ্তানির প্রধান গন্তব্য। বিশেষ করে রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির মডেলে এগিয়ে যাওয়া দেশগুলোর অর্থনীতি অনেকাংশেই মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভরশীল। ভিয়েতনাম এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। তবে সমস্যা হলো—এই দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করলেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলনামূলকভাবে অনেক কম পণ্য আমদানি করে। এর ফলে একের পর এক দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যঘাটতি ক্রমেই বড় আকার ধারণ করেছে।
এই পরিস্থিতিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর যুক্তি ছিল, মার্কিন পণ্যের ওপর অন্য দেশগুলো যে মাত্রায় শুল্ক আরোপ করছে, তার প্রতিফলন যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতিতে নেই। এই অসমতাকে দূর করতেই তিনি ‘পাল্টা শুল্ক’ নীতির কথা সামনে আনেন।
পাল্টা শুল্কের মূল ধারণা ছিল সহজ—যে দেশ যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে যত শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে, যুক্তরাষ্ট্রও সেই দেশের পণ্যে সমপরিমাণ শুল্ক বসাবে। এর সঙ্গে আগে থেকে প্রচলিত নিয়মিত শুল্ক তো থাকছেই। এই নীতির আলোকে ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়া হয়। যদিও পরবর্তী সময়ে এই নীতিতে সংশোধন আনা হয় এবং আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে পৃথক বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন হয়।
এই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের একটি বাণিজ্য চুক্তি হয়, যা সম্পাদিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কয়েক দিন আগে। এতে বোঝা যায়, কেবল কঠোর শুল্ক আরোপ নয়—আলোচনার পথও খোলা রাখছিল ট্রাম্প প্রশাসন।
২ এপ্রিলের ঘোষণায় ট্রাম্প স্পষ্ট করেন, চাইলে তিনি হুবহু সমপরিমাণ শুল্ক আরোপ করতে পারতেন। তবে তাঁর ভাষায়, তাতে অনেক দেশ গুরুতর অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়ত। উদাহরণ হিসেবে তিনি চীন–এর কথা উল্লেখ করেন। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, মুদ্রা কারসাজি ও বিভিন্ন বাণিজ্যবাধা মিলিয়ে চীন কার্যত মার্কিন পণ্যের ওপর প্রায় ৬৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র সেখানে তার প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ ৩৪ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নেয়।
এই ‘অর্ধেক নীতি’ কমবেশি সব দেশের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা হয়। ফলে ট্রাম্পের মতে, এতে অতিরিক্ত আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। বাস্তবে তখন সব দেশের পণ্যের ওপর গড়ে ন্যূনতম ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করা হয়।
সব মিলিয়ে পাল্টা শুল্ক ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যঘাটতি কমানোর একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। তবে এই নীতি একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করেছে, অন্যদিকে তেমনি বিশ্ববাণিজ্যে নতুন অনিশ্চয়তা ও পুনর্বিন্যাসের পথও তৈরি করেছে—যার প্রভাব এখনো আলোচনার কেন্দ্রে।
ট্রাম্প কি শুল্কযুদ্ধ থেকে সরে আসছেন?
এই প্রশ্নের সরল উত্তর—না। শুল্ক আরোপের মাধ্যমে মার্কিন অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত গতি না এলেও ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি বাণিজ্যযুদ্ধ থেকে পিছু হটবেন না। আদালতের রায় তাঁর কৌশলে সাময়িক বাধা তৈরি করলেও নীতিগত অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আনেনি।
রায় ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন ব্যবহার করতে না পারলেও প্রশাসনের হাতে শুল্ক আরোপের জন্য আরও আইনি পথ রয়েছে। প্রয়োজনে বিকল্প আইন প্রয়োগ করেই শুল্ক বহাল রাখা হবে। একই সঙ্গে তিনি নতুন করে বিশ্বব্যাপী ন্যূনতম ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। পাশাপাশি তথাকথিত অন্যায্য বাণিজ্যিক রীতি নিয়ে আরও বিস্তৃত তদন্ত চালানোর কথাও জানান।
ট্রাম্পের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আদালত কেবল একটি নির্দিষ্ট আইনের আওতায় তাঁর ক্ষমতা সীমিত করেছে। কিন্তু বাণিজ্য ও শুল্কনীতি নির্ধারণে প্রশাসনের জন্য বিকল্প আইনি কাঠামো এখনো উন্মুক্ত। অর্থাৎ, আদালতের রায়কে তিনি শুল্কনীতির শেষ অধ্যায় হিসেবে দেখছেন না।
এই অবস্থানকে সমর্থন করে স্কট বেসেন্ট জানান, প্রশাসন ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের বিভিন্ন ধারা ব্যবহার করে নতুন শুল্ক কার্যকর করার পরিকল্পনা করছে। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এসব ব্যবস্থার ফলে ২০২৬ সালে শুল্ক থেকে সরকারের আয় মোটামুটি অপরিবর্তিত থাকতে পারে। অর্থাৎ, রাজস্বের দিক থেকে বড় ধাক্কার আশঙ্কা করছে না প্রশাসন।
তবে বিকল্প আইনি পথে শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এসব ধারায় শুল্কের সর্বোচ্চ হার নির্ধারিত, মেয়াদ সীমিত এবং তদন্ত ও শুনানির মতো প্রক্রিয়াগত ধাপ অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। উদাহরণ হিসেবে, প্রশাসন ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ১২২ নম্বর ধারা ব্যবহার করে ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক আরোপ করতে চায়। এই ধারায় সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সুযোগ থাকলেও তা কার্যকর রাখা যাবে সর্বোচ্চ ১৫০ দিনের জন্য।
এ ছাড়া আইনের অন্যান্য ধারা প্রয়োগ করতে হলে আগে প্রমাণ করতে হবে যে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা বা অন্যায্য বাণিজ্যিক রীতি মোকাবিলার জন্য শুল্ক অপরিহার্য। অর্থাৎ, আগের মতো নির্বিঘ্নে শুল্ক আরোপের সুযোগ আর নেই।
ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, নতুন আইনি পথে এগোতে হলে প্রশাসনকে বাড়তি প্রস্তুতি ও সময় দিতে হবে। তবে তাঁর বিশ্বাস, শেষ পর্যন্ত শুল্কনীতি থেমে যাবে না। তাঁর কথায়, “প্রক্রিয়াটা কিছুটা জটিল এবং সময়সাপেক্ষ, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এর মাধ্যমে আমাদের রাজস্ব আরও বাড়বে।” সব মিলিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে, শুল্কযুদ্ধ ট্রাম্পের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে। আইনি বাধা আসতে পারে, পথ বদলাতে হতে পারে, কিন্তু শুল্কনির্ভর বাণিজ্যনীতি থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত এখনো দিচ্ছেন না তিনি।
শুল্কের অর্থ কি শেষ পর্যন্ত ফেরত দিতে হবে?
শুল্কনীতি ঘিরে আইনি বিতর্ক যত ঘনীভূত হচ্ছে, ততই সামনে আসছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—আদায় করা শুল্কের অর্থ কি সরকারকে ফেরত দিতে হবে? বিষয়টি শুধু নীতিগত নয়, বিপুল অঙ্কের অর্থ জড়িত থাকায় এটি হয়ে উঠেছে অর্থনৈতিকভাবে সংবেদনশীল ইস্যু।
প্রাপ্ত হিসাব অনুযায়ী, গত বছর যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক থেকে আনুমানিক ২৪০ থেকে ৩০০ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব পেয়েছে। তবে এই অর্থের বড় অংশ বাস্তবে এসেছে দেশটির আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদের কাছ থেকেই। অর্থাৎ কাগজে-কলমে শুল্ক পরিশোধ করেছে আমদানিকারকেরা, কিন্তু দাম বাড়ার মাধ্যমে তার বোঝা গিয়ে পড়েছে বাজার ও ভোক্তার ঘাড়ে।
যদি আদালতের রায়ের ফলে সরকারকে এই অর্থ আমদানিকারকদের ফেরত দিতে হয়, তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে। এককালীন এত বিপুল অঙ্ক ফেরত দেওয়া সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনায় গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
গবেষণাগুলোও এই চাপের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, আরোপিত শুল্কের প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যয় বহন করেছে মার্কিন কোম্পানিগুলো। এর বড় অংশ আবার পণ্যের দাম বাড়িয়ে ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে শুল্কের প্রকৃত খরচ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে গেছে।
যদিও অর্থ ফেরতের প্রশ্ন উঠছে, বাস্তবে তা দ্রুত কার্যকর হবে—এমন সম্ভাবনা কম। মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট–এর বিচারপতি ব্রেট কাভানফ মন্তব্য করেছেন, শুল্কের অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়া আইনগতভাবে অত্যন্ত জটিল হতে পারে। তাঁর ইঙ্গিত থেকে বোঝা যায়, বিষয়টি দীর্ঘসূত্রতায় পড়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে, সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভাব্য অর্থ ফেরতের প্রসঙ্গ কার্যত উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, এ নিয়ে বর্তমানে কোনো আলোচনা নেই। বরং তাঁর ইঙ্গিত, এই প্রশ্নের নিষ্পত্তি হতে গেলে আগামী কয়েক বছর আদালতকেন্দ্রিক আইনি লড়াই চলতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, শুল্কের অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত। আইনি জটিলতা, রাজনৈতিক অবস্থান এবং বিপুল অঙ্কের আর্থিক ঝুঁকি—সবকিছু মিলিয়ে এটি সহজ কোনো সিদ্ধান্ত নয়। ফলে শুল্কনীতি নিয়ে চলমান বিতর্ক কেবল বাণিজ্য বা রাজস্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক নীতির বড় পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।
অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ: শুল্কের আড়ালে ক্ষমতার নতুন হিসাব
বিশ্ববাণিজ্যে দীর্ঘদিন ধরে একটি নীরব বাস্তবতা কাজ করেছে—পরাশক্তি হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র–এর পণ্যের ওপর অনেক দেশই তুলনামূলকভাবে উচ্চ শুল্ক আরোপ করে এসেছে। এই চর্চা নতুন নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভিয়েতনাম দীর্ঘদিন মার্কিন পণ্যের ওপর প্রায় ৯০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে রেখেছিল। এর জবাবে ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা শুল্ক বসায় ঠিক তার অর্ধেক, অর্থাৎ ৪৫ শতাংশ।
একই নীতি প্রয়োগ করা হয় বাংলাদেশ ও ভারত–এর ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশ মার্কিন পণ্যে ৭৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল; পাল্টা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পণ্যে ৩৭ শতাংশ শুল্ক বসায়। ভারতীয় পণ্যের ক্ষেত্রেও চিত্র একই—মার্কিন পণ্যে ভারতের ৫২ শতাংশ শুল্কের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র আরোপ করে ২৬ শতাংশ।
বিশ্বের প্রায় সব দেশই যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে উচ্চ শুল্ক আরোপ করেছিল মূলত একটি কারণেই—যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক পরাশক্তি। এই উচ্চ শুল্ক অনেকটা অঘোষিত ‘ক্ষমতার মাশুল’ হিসেবে কাজ করত। অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তি ছিল রপ্তানি, আর সেই রপ্তানির সবচেয়ে বড় গন্তব্য ছিল মার্কিন বাজার।
কিন্তু এই সমীকরণ মানতে রাজি নন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দৃষ্টিতে, পরাশক্তি হিসেবে বাড়তি দায় নেওয়ার ধারণা অগ্রহণযোগ্য। ট্রাম্প নিজেকে আগে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে দেখেন—যেখানে লাভ-লোকসানের হিসাবই মুখ্য। ২ এপ্রিলের আগেই তিনি বারবার বলে আসছিলেন, বহু বছর ধরে বিশ্বের দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে বাণিজ্যে ‘শোষণ’ করেছে। তাঁর ঘোষণা ছিল, সেই যুগের অবসান হবে। সব দেশের পণ্যে পাল্টা শুল্ক আরোপের দিনটিকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্বাধীনতা দিবস’ হিসেবেও অভিহিত করেন।
এই পাল্টা শুল্কনীতিকে অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের স্পষ্ট প্রকাশ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও ইউএনডিপি–এর মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তরের সাবেক পরিচালক সেলিম জাহান বলেন, ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গির মূল বৈশিষ্ট্য হলো দ্বিপক্ষীয়তা। তাঁর ভাষায়, বৈদেশিক নীতি থেকে শুরু করে বাণিজ্যনীতি—সব ক্ষেত্রেই ট্রাম্প বহুপক্ষীয় কাঠামো এড়িয়ে দ্বিপক্ষীয় পথে হাঁটছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠিত বিধিবদ্ধ ব্যবস্থাকে উপেক্ষা করছেন।
সেলিম জাহানের মতে, মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট–এর সাম্প্রতিক রায়ে পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। কারণ, আদালতের রায় সত্ত্বেও ট্রাম্প নিজের অবস্থান থেকে সরে আসবেন—এমন কোনো লক্ষণ নেই। বরং বিভিন্ন আইনি পথ খুঁজে তিনি শুল্ক আরোপ অব্যাহত রাখার চেষ্টা করবেন। এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানি ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
এই প্রেক্ষাপটে সেলিম জাহান একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন—অন্তর্বর্তী সরকার কেন একেবারে শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে গেল। তাঁর মতে, বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এই চুক্তির ফলে নতুন সরকার একধরনের দায়ভার নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। এখন সেই চুক্তির ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নতুন করে বিবেচনা করা জরুরি।
চলমান এই অনিশ্চয়তার মধ্যে সেলিম জাহানের পরামর্শ স্পষ্ট—বাংলাদেশকে বিকল্প পথ খুঁজতেই হবে। যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়ন–এর সঙ্গে ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ, তেমন বহুমুখী বাজার ও অংশীদার খোঁজার চিন্তা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পিছানোর যে আবেদন করেছে, সেই অতিরিক্ত সময়ের মধ্যে কি সত্যিই সব কাঠামোগত ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে—যেসব ঘাটতির যুক্তি দেখিয়ে এই আবেদন করা হয়েছে।

