ব্যাংকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো, কাগজপত্র জমা দেওয়া আর দিনের পর দিন অপেক্ষার ঝামেলা ছাড়াই এখন অনলাইনে মিলছে ক্ষুদ্র ব্যক্তিগত ঋণ। ডিজিটাল ঋণসেবার প্রসারে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ঢাকা ব্যাংকের ‘ইঋণ’ প্ল্যাটফর্ম। এই সেবার মাধ্যমে অনলাইনে আবেদন করে মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যেই সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ পাওয়ার সুযোগ মিলছে বলে জানিয়েছে ব্যাংকটি।
ব্যক্তিগত জরুরি খরচ, চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা মাসের শেষ সময়ে অর্থসংকটে পড়া মানুষের জন্য দ্রুত অর্থ সহায়তার একটি বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে এই সেবাকে তুলে ধরছে ব্যাংকটি। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং বেতনভোগীদের লক্ষ্য করেই এ সেবা চালু করা হয়েছে।
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গ্রাহকরা মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে ঘরে বসেই ঋণের আবেদন করতে পারবেন। আবেদন অনুমোদিত হলে সরাসরি ব্যাংক হিসাবে টাকা পাঠিয়ে দেওয়া হবে। একজন গ্রাহক সর্বনিম্ন ১ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন। ঋণ পরিশোধের সময়সীমা রাখা হয়েছে তিন মাস অথবা ছয় মাস। পুরো অর্থ মাসিক কিস্তির মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে।
এই সেবার সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে, এতে কোনো ধরনের জামানত লাগছে না। আবেদনকারীর তথ্য, আয় এবং ব্যাংক লেনদেন বিশ্লেষণ করেই ঋণের যোগ্যতা যাচাই করা হচ্ছে। ফলে প্রচলিত ব্যাংকঋণের তুলনায় প্রক্রিয়াটি অনেক সহজ ও দ্রুত।
২১ বছরের বেশি বয়সী যেকোনো বাংলাদেশি নাগরিক এই ঋণের জন্য আবেদন করতে পারবেন। তবে আবেদনকারীর মাসিক আয় কমপক্ষে ১০ হাজার টাকা হতে হবে। পাশাপাশি একটি সক্রিয় ব্যাংক হিসাব, বৈধ জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল নম্বর বা গুগল অ্যাকাউন্ট এবং ঠিকানার প্রমাণপত্র থাকতে হবে।
আবেদনের ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র, সাম্প্রতিক বেতন স্লিপ বা আয়ের প্রমাণ, ব্যাংক হিসাবের স্টেটমেন্ট এবং ঠিকানার প্রমাণ জমা দিতে হবে। ঠিকানার প্রমাণ হিসেবে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানির বিল, পাসপোর্ট, টেলিফোন বিল বা হোল্ডিং ট্যাক্সের কপি গ্রহণ করা হচ্ছে। আবেদনকারীকে নিজের ছবিও আপলোড করতে হবে। সব নথি স্পষ্ট ও নির্ধারিত ফরম্যাটে জমা দেওয়ার শর্ত রয়েছে।
ব্যাংকটির কর্মকর্তারা বলছেন, সঠিক তথ্য ও প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়া হলে অনেক ক্ষেত্রেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঋণ অনুমোদন করা সম্ভব হচ্ছে। তাদের দাবি, ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করায় পুরো প্রক্রিয়ায় মানবিক হস্তক্ষেপ কমেছে এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে।
ব্যাংক খাত–সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দেশে ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তার নতুন ধরনের ঋণব্যবস্থার পথ তৈরি করছে। বিশেষ করে তরুণ চাকরিজীবী, গার্মেন্টস কর্মী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য এ ধরনের ক্ষুদ্রঋণ তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্কও করছেন। তাদের মতে, দ্রুত ঋণ পাওয়া সহজ হলেও গ্রাহকদের সুদের হার, সার্ভিস চার্জ, বিলম্ব ফি এবং পরিশোধ সক্ষমতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নিয়ে ঋণ নেওয়া উচিত। কারণ সময়মতো কিস্তি পরিশোধ না করতে পারলে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।
ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের এপ্রিলে চালু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ৫০ হাজারের বেশি গ্রাহক এই সেবা নিয়েছেন। মোট ঋণ বিতরণের পরিমাণ ইতিমধ্যে ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। প্রতি মাসে এক হাজারের বেশি গ্রাহক নতুন করে এই সেবা গ্রহণ করছেন বলে জানিয়েছে ব্যাংকটি।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশে ডিজিটাল ব্যাংকিং যত বিস্তৃত হবে, ততই ছোট অঙ্কের তাৎক্ষণিক ঋণের বাজার বড় হবে। তবে এর পাশাপাশি গ্রাহক সুরক্ষা, স্বচ্ছ সুদনীতি এবং তথ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।

