ব্যাংক কার্ড থেকে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টে টাকা স্থানান্তরের ক্ষেত্রে বড় ধরনের নতুন নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কার্ডের মালিক এবং যে এমএফএস অ্যাকাউন্টে টাকা যাবে—দুই হিসাবই একই ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত হতে হবে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে অন্য কারও বিকাশ, নগদ বা অন্য মোবাইল ওয়ালেটে নিজের ব্যাংক কার্ড থেকে সরাসরি ‘অ্যাড মানি’ করা যাবে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি একটি বিদেশি ব্যাংকের কার্ড ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ সাইবার জালিয়াতির ঘটনায় লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর নিরাপত্তা জোরদারে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। খুব শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সার্কুলার জারি করবে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, আগামী ১ আগস্ট ২০২৬ থেকে ব্যাংক কার্ড দিয়ে এমএফএস অ্যাকাউন্টে টাকা যোগ করার সময় নিশ্চিত করতে হবে যে কার্ডধারী ও এমএফএস হিসাবধারী একই ব্যক্তি। এর মাধ্যমে ভুয়া অ্যাকাউন্ট, অন্যের নামে নিবন্ধিত সিম এবং প্রতারণামূলক ওয়ালেট ব্যবহার করে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
তবে পুরো প্রক্রিয়া কার্যকর হওয়ার আগে সাময়িকভাবে কিছু ছাড় রাখা হচ্ছে। আগামী জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত এক ব্যক্তির কার্ড ব্যবহার করে অন্য ব্যক্তির এমএফএস অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো যাবে। কিন্তু এজন্য অতিরিক্ত যাচাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
অন্তর্বর্তী এই ব্যবস্থায় কার্ড সংযুক্তির সময় সর্বোচ্চ ৫০০ টাকার একটি ‘টোকেন লেনদেন’ করতে হবে। সেই লেনদেন সফল হওয়ার পর ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে। এরপর কার্ডটি এমএফএস অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিয়মিত লেনদেন করা যাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আরও নির্দেশ দিয়েছে, কার্ড থেকে এমএফএস-এ পাঠানো অর্থকে আর ‘মার্চেন্ট পেমেন্ট’ হিসেবে দেখানো যাবে না। এটিকে ‘ফান্ড ট্রান্সফার’ হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। পাশাপাশি টাকা যে ওয়ালেটে যাচ্ছে, সেই নম্বরও কার্ড ইস্যুকারী ব্যাংকের কাছে দৃশ্যমান রাখতে হবে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নিশ্চিত করতে না পারলে সংশ্লিষ্ট কার্ড থেকে ‘অ্যাড মানি’ সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
খাতসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সম্প্রতি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের কিছু গ্রাহকের ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ডের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে প্রতারক চক্র বিকাশ ও নগদের মতো মোবাইল ওয়ালেটে অর্থ সরিয়ে নেয়। অভিযোগ রয়েছে, ওটিপি যাচাই এড়িয়ে অন্যের নামে নিবন্ধিত সিম ও ভুয়া এমএফএস হিসাব ব্যবহার করে প্রায় ২৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।
ঘটনার পর স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক সাময়িকভাবে তাদের কার্ড থেকে এমএফএসে ‘অ্যাড মানি’ সুবিধা বন্ধ করে দেয়। পরে বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তদন্ত শুরু করে এবং পুরো ব্যবস্থায় বড় ধরনের নিরাপত্তা দুর্বলতা খুঁজে পায়।
ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিকসেবা খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে ডিজিটাল লেনদেন দ্রুত বাড়লেও নিরাপত্তা অবকাঠামো এখনো পুরোপুরি শক্তিশালী হয়নি। বিশেষ করে অন্যের নামে নিবন্ধিত সিম ও অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে প্রতারণার ঝুঁকি দীর্ঘদিন ধরেই ছিল। নতুন নিয়ম সেই ঝুঁকি অনেকটাই কমাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে তারা এটাও বলছেন, এই সিদ্ধান্তে কিছু সাধারণ ব্যবহারকারী সাময়িক ভোগান্তিতে পড়তে পারেন। কারণ পরিবার বা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে অনেকেই অন্যের এমএফএস অ্যাকাউন্টে নিয়মিত টাকা পাঠাতেন। নতুন নিয়মে সেই সুবিধা সীমিত হয়ে যাবে। তারপরও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন ছিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

