দেশের বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে। চলতি বছরের মার্চ শেষে এই প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে, যা গত দুই দশকেরও বেশি সময়ের ২৪ বছরের সর্বনিম্নে সবচেয়ে কম। অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা বলছেন, বিনিয়োগে স্থবিরতা, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সংকট এবং নীতিগত অস্পষ্টতার সম্মিলিত প্রভাবে অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ শেষে বেসরকারি খাতে মোট বকেয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। যদিও ঋণের পরিমাণ বেড়েছে, তবে প্রবৃদ্ধির হার ধারাবাহিকভাবে কমতে কমতে ইতিহাসের সর্বনিম্ন অবস্থানে পৌঁছেছে।
গত বছরের নভেম্বরেও প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এরপর ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ধীরে ধীরে কমতে থাকে। মার্চে এসে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০০৩ সাল থেকে এই তথ্য প্রকাশ করছে, আর সেই হিসাব অনুযায়ী এটিই সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কিছুটা কমলেও ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এখনো পুরোপুরি ফিরে আসেনি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বাড়তি উৎপাদন ব্যয়, আমদানি খরচ, লজিস্টিক জটিলতা এবং জ্বালানি সংকট ব্যবসায়ীদের নতুন বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করছে। বিশেষ করে মার্চ মাসে গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি শিল্প খাতকে আরও চাপে ফেলে। অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারেনি। ফলে নতুন ঋণের চাহিদাও কমে গেছে।
ব্যাংকারদের ভাষ্য, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর কার্যক্রম সংকুচিত হয়েছে। কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, আবার অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ব্যাংকঋণের বাজারে। আগে যেসব প্রতিষ্ঠান যন্ত্রপাতি আমদানি, সম্প্রসারণ বা নতুন বিনিয়োগে বড় অঙ্কের ঋণ নিত, এখন তারা অনেকটাই নিষ্ক্রিয়।
অন্যদিকে ব্যাংকারদের একাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। তাদের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের অগ্রাধিকার কী—মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুদের হার কমানো নাকি প্রবৃদ্ধি বাড়ানো—সেটি স্পষ্ট নয়। ফলে ব্যাংকগুলোও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বা বড় বিনিয়োগে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
বিশেষ করে ডলারের বিনিময় হার নিয়ে অনিশ্চয়তা ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ব্যাংকারদের মতে, বাজারের বাস্তবতার তুলনায় ডলারের দর নিয়ন্ত্রিত রাখার চেষ্টা ভবিষ্যৎ ঝুঁকি তৈরি করছে। একই সঙ্গে ট্রেড ফাইন্যান্স ও আমদানি অর্থায়নে সুদের হার নির্ধারণ নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে।
অনেক ব্যাংকার বলছেন, যখন নীতিগত পরিবেশ অস্পষ্ট থাকে, তখন ব্যাংকগুলো ঝুঁকি নিতে চায় না। ফলে নতুন উদ্যোক্তা কিংবা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এদিকে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো এখন সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বেশি বিনিয়োগ করছে। কারণ সেখানে ঝুঁকি কম, আবার মুনাফাও তুলনামূলক নিশ্চিত। বর্তমানে সরকারি সিকিউরিটিজে প্রায় ১১ শতাংশ পর্যন্ত সুদ পাওয়া যাচ্ছে, যা অনেক ব্যাংকের জন্য লাভজনক হয়ে উঠেছে।
ফলে ব্যাংকগুলো শিল্প ও ব্যবসা খাতে ঋণ দেওয়ার বদলে সরকারি ঋণপত্রে ঝুঁকছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে বেসরকারি বিনিয়োগ আরও দুর্বল করতে পারে। কারণ সরকার বেশি ঋণ নিলে বাজারে বেসরকারি খাতের জন্য অর্থের প্রাপ্যতা কমে যায়। একে অর্থনীতির ভাষায় “ক্রাউডিং আউট” প্রভাব বলা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, মার্চে সরকার ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ৩৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়। এপ্রিলে সেই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৪৬ হাজার কোটি টাকায়। যদিও এর বড় অংশ পুরোনো দায় পরিশোধে ব্যবহার হয়েছে, তবুও সরকারের ব্যাংকনির্ভর ঋণ বাড়তে থাকায় বাজারে তার প্রভাব পড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু ব্যাংক খাতের দুর্বলতা নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনীতির মন্থরতারও ইঙ্গিত দিচ্ছে। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি সাধারণত শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও নতুন বিনিয়োগের একটি বড় সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই সূচক যখন ধারাবাহিকভাবে কমে যায়, তখন তা অর্থনৈতিক গতি কমে যাওয়ার বার্তা দেয়।
তারা বলছেন, পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি নীতিগত স্বচ্ছতা, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ফিরিয়ে আনা জরুরি। অন্যথায় আগামী মাসগুলোতে অর্থনীতিতে চাপ আরও বাড়তে পারে।

