শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আমরা সাধারণত জ্ঞান, শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও নিরাপত্তার জায়গা হিসেবে কল্পনা করি। একজন অভিভাবক যখন সন্তানকে স্কুল, মাদ্রাসা বা আবাসিক শিক্ষাকেন্দ্রে পাঠান, তখন তার সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা থাকে—সন্তান সেখানে নিরাপদ থাকবে।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোর ধারাবাহিক ঘটনা দেখাচ্ছে, বাংলাদেশের বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা এখনো ভয়াবহভাবে অনিশ্চিত। কোথাও শারীরিক নির্যাতন, কোথাও অপমানজনক শাস্তি, কোথাও আবার যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের অভিযোগ—সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, শিশুদের জন্য শিক্ষালয় কি সত্যিই নিরাপদ?
২০২৫ সালের মার্চে জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলায় একটি মাদ্রাসার ঘটনা নতুন করে দেশজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করে। নয় বছর বয়সী এক শিশুকে তার পরিবার মাদ্রাসায় ভর্তি করেছিল ধর্মীয় শিক্ষা ও নিরাপদ পরিবেশের আশায়। কিন্তু অভিযোগ ওঠে, ওই প্রতিষ্ঠানের ত্রিশ বছর বয়সী জ্যেষ্ঠ শিক্ষক বজলুর রহমান কয়েক মাস ধরে নয় ও দশ বছর বয়সী দুই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ করেছেন। স্থানীয় মানুষ অভিযুক্ত শিক্ষককে আটক করার পর সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করে তাকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। ঘটনাটি যতটা ভয়াবহ, তার চেয়েও উদ্বেগজনক হলো—এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।
গত কয়েক বছরের তথ্য বলছে, শিক্ষকের হাতে শিক্ষার্থীর ওপর সহিংসতা বাংলাদেশে একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে রূপ নিয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের গণমাধ্যম পর্যবেক্ষণভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষার্থীর ওপর সহিংসতার ৯৪৮টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৭৩৭টি ঘটনা ছিল শারীরিক নির্যাতন এবং ২১১টি ছিল শিক্ষকের মাধ্যমে যৌন হয়রানি বা যৌন নির্যাতনের ঘটনা। এই সংখ্যা শুধু প্রকাশ্যে আসা ঘটনার হিসাব; বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ হতে পারে, কারণ অনেক ঘটনা পরিবার, প্রতিষ্ঠান বা স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপে কখনো সংবাদমাধ্যম বা পুলিশের কাছে পৌঁছায় না।
২০২৩ সালে শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যায়। আগের বছর যেখানে এ ধরনের ঘটনা ছিল ১০৯টি, সেখানে ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৪০টিতে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শারীরিক নির্যাতন দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। কিন্তু এত ঘটনার পরও আনুষ্ঠানিক মামলা হয়েছে মাত্র ৯টিতে। মামলা দায়েরের হার ছিল মাত্র ৩.৮ শতাংশ। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, অপরাধ ঘটার পর আইনি প্রতিক্রিয়া কতটা দুর্বল।
২০২৪ সালে আরেকটি ভয়াবহ পরিবর্তন দেখা যায়। শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা কিছুটা কমলেও শিক্ষকের মাধ্যমে যৌন হয়রানির অভিযোগ এক বছরে তিন গুণ বেড়ে যায়। ২০২৩ সালে যেখানে যৌন হয়রানির ঘটনা ছিল ৩০টি, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯০টিতে। এটি সংশ্লিষ্ট সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ বার্ষিক সংখ্যা। অথচ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ হয়েছে মাত্র ৭টি ঘটনায়। অর্থাৎ অপরাধ বাড়ছে, কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রবেশের পথ এখনো সংকীর্ণ।
এই প্রবণতা ২০২৫ ও ২০২৬ সালেও থেমে যায়নি। আইন ও সালিশ কেন্দ্র এবং আইনি শিক্ষা ও উন্নয়ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে দেশে শিশু ধর্ষণের ঘটনা ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় ৭৫ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতেই আইন ও সালিশ কেন্দ্র ৩৫টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে, যার মধ্যে ১৩ জন ভুক্তভোগীর বয়স ছিল ১২ বছর বা তার কম। এই তথ্যগুলো শুধু অপরাধের পরিমাণই দেখায় না; এগুলো সমাজ, শিক্ষা প্রশাসন, পরিবার ও বিচারব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।
বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষার জন্য আইন নেই—এ কথা বলা যাবে না। ২০১১ সালে উচ্চ আদালত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ করেন। এক দশ বছর বয়সী শিক্ষার্থী শিক্ষক কর্তৃক মারধরের পর আত্মহত্যা করলে আইন ও সালিশ কেন্দ্র এবং বাংলাদেশ আইন সহায়তা ও সেবা ট্রাস্ট রিট করে। সেই প্রেক্ষাপটেই আদালতের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা আসে। পাশাপাশি শিশু আইন ২০১৩ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মতো আইনি কাঠামোও রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, আইন কাগজে থাকলেও তার প্রয়োগ মাঠপর্যায়ে দুর্বল।
শিক্ষাবিদদের মতে, বাংলাদেশের মূল সংকট আইন না থাকা নয়; বরং আইন বাস্তবায়নের অভাব। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে যে সংস্কার দরকার ছিল, তা হয়নি। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হয়রানি ও নির্যাতন প্রতিরোধে কমিটি থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক জায়গায় এসব কমিটি অকার্যকর, প্রভাবাধীন অথবা কাগুজে। কোথাও রাজনৈতিক প্রভাব, কোথাও স্থানীয় ক্ষমতাবানদের চাপ, কোথাও প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার অজুহাতে অভিযোগ চাপা পড়ে যায়।
এই চাপা দেওয়ার সংস্কৃতিই অপরাধীদের সাহস জোগায়। অনেক পরিবার থানায় যেতে ভয় পায়। কেউ সামাজিক অপমানের ভয়ে চুপ থাকে, কেউ অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে প্রভাবশালীদের সঙ্গে লড়তে পারে না। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় সালিশের নামে ভুক্তভোগী পরিবারকেই দোষারোপ করা হয়। কোথাও ক্ষতিপূরণের নামে আপস চাপিয়ে দেওয়া হয়। ফলে অপরাধী বার্তা পায়—অপরাধ করলেও বড় কিছু হবে না।
সমাজবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, শিক্ষক নিয়োগে শিশুর সঙ্গে কাজ করার মানসিক সক্ষমতা যাচাইয়ের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। আমরা ধরে নিই, শিক্ষক মানেই তিনি শিশুদের প্রতি দায়িত্বশীল, সংবেদনশীল ও নৈতিকভাবে উপযুক্ত। কিন্তু বাস্তবে একজন মানুষ শিশুদের সঙ্গে কাজ করার জন্য মানসিকভাবে কতটা প্রস্তুত, তার কোনো পদ্ধতিগত মূল্যায়ন হয় না। কর্তৃত্বপরায়ণ মনোভাব, মানসিক চাপ, অমীমাংসিত ব্যক্তিগত হতাশা, অসুস্থ ক্ষমতাচর্চা—এসব বিষয় শ্রেণিকক্ষ বা আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহিংস আচরণের জন্ম দিতে পারে।
বিশেষ করে আবাসিক মাদ্রাসা ও অনিবন্ধিত কওমি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নজরদারির ঘাটতি আরও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২১ সালে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের গণমাধ্যম পর্যবেক্ষণে কওমি মাদ্রাসার ভেতরে যৌন সহিংসতার অন্তত ৩০টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংখ্যা বাস্তব পরিস্থিতির সামান্য অংশ হতে পারে। অনেক অনিবন্ধিত মাদ্রাসা কার্যত সরকারি নজরদারির বাইরে চলে। ফলে সেখানে কী ঘটছে, তা জানা কঠিন।
এই আলোচনা কোনোভাবেই মাদ্রাসাবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি নয়। বরং প্রশ্নটি হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির। কোনো প্রতিষ্ঠান ধর্মীয় পরিচয় বহন করলেই কি সেটি নাগরিক আইন, শিশু সুরক্ষা ও রাষ্ট্রীয় নজরদারির বাইরে থাকবে? যদি কোনো মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ সমালোচনাকে অযৌক্তিক বলে মনে করে, তাহলে তাদেরই দেখাতে হবে—শিশু সুরক্ষায় তারা কী ব্যবস্থা নিয়েছে, অভিযোগ এলে কীভাবে তদন্ত করে, অপরাধীকে কীভাবে শাস্তির আওতায় আনে।
শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু দেশেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তি, যৌন সহিংসতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়মুক্তির সমস্যা রয়েছে। তবে কিছু দেশ ধীরে ধীরে পরিবর্তনের পথ তৈরি করেছে। নেপাল প্রথমে আইনি নিষেধাজ্ঞাকে শক্ত ভিত্তি হিসেবে দাঁড় করিয়েছে, তারপর শিক্ষক প্রশিক্ষণ, সামাজিক সচেতনতা ও বেসরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে তা মাঠপর্যায়ে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছে।
ইন্দোনেশিয়া শিক্ষক ও অভিভাবকদের আচরণগত পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়েছে। সেখানে শিশুদের ওপর শারীরিক শাস্তির মানসিক ও বিকাশগত ক্ষতি বোঝানো হয়েছে এবং বিকল্প শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনার কৌশল শেখানো হয়েছে। ভারতও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহিংসতা ও লিঙ্গভিত্তিক নিপীড়ন রোধে স্কুল নিরাপত্তা কর্মসূচি নিয়েছে এবং শিশুদের যৌন অপরাধ থেকে সুরক্ষা আইন সংশোধন করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর বাধ্যতামূলক প্রতিবেদন দেওয়ার দায়িত্ব জোরদার করেছে।
বাংলাদেশের জন্য এখান থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ আছে। প্রথমত, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাধ্যতামূলক নিবন্ধন ও নিয়মিত পরিদর্শন নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্কুল, মাদ্রাসা ও আবাসিক প্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা কমিটিকে কাগুজে না রেখে কার্যকর করতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষক নিয়োগে নৈতিকতা, মানসিক সুস্থতা, শিশুবান্ধব আচরণ ও পেশাগত উপযোগিতা যাচাইয়ের ব্যবস্থা দরকার। চতুর্থত, শিশু নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীন তদন্ত, দ্রুত মামলা, সাক্ষী সুরক্ষা এবং ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, স্থানীয় সালিশের নামে যৌন অপরাধ চাপা দেওয়ার সংস্কৃতি আইনি দৃষ্টিতে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করতে হবে।
২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই আইন ও সালিশ কেন্দ্র শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষার্থী নির্যাতনের ৯টি এবং যৌন হয়রানির ১২টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। এই হার চলতে থাকলে আগের বছরগুলোর পুনরাবৃত্তি আবারও দেখা যাবে। তাই এখন আর প্রশ্ন করার সময় নেই—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিরাপদ কি না। গত ছয় বছরের তথ্য সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিয়েছে। এখন মূল প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র, শিক্ষা প্রশাসন, প্রতিষ্ঠানপ্রধান, শিক্ষকসমাজ এবং পরিবার—সবাই মিলে এই উত্তর বদলাতে প্রস্তুত কি না।
শিশুরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যায় ভবিষ্যৎ গড়তে, ভয় নিয়ে বাঁচতে নয়। যে সমাজ শিশুদের নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ দিতে পারে না, সে সমাজ উন্নয়নের দাবি করলেও তার ভিত দুর্বল থাকে। আইন, নজরদারি, বিচার, সামাজিক সাহস এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি—এই পাঁচটি জায়গায় একসঙ্গে পরিবর্তন না আনলে শিক্ষালয় শিশুদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠবে না। আর নিরাপদ আশ্রয় ছাড়া শিক্ষা কখনো পূর্ণ শিক্ষা হতে পারে না।

