বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটছে সরকার। দীর্ঘদিন ধরে অনুসরণ করা পাঁচ বছর মেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা থেকে সরে এসে এবার নতুন ধরনের একটি কৌশলগত উন্নয়ন কাঠামো গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে। নতুন এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে আগামী এক দশকে দেশের অর্থনীতিকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরিয়ে আনা।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, সরকার জুন মাসের মধ্যেই “পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো” চূড়ান্ত করতে চায়। এই কাঠামোই আগামী কয়েক বছরের সংস্কার, বাজেট, উন্নয়ন ব্যয় এবং অর্থনৈতিক নীতির ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। নতুন সরকারের লক্ষ্য ২০৩৪ সালের মধ্যে সেটিকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়া। একই সঙ্গে ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৮.৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
এই নতুন কৌশলকে শুধু একটি উন্নয়ন পরিকল্পনা নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক নীতির বড় ধরনের মোড় পরিবর্তন হিসেবেও দেখা হচ্ছে। কারণ গত কয়েক দশকে দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার বড় অংশজুড়ে ছিল অবকাঠামো নির্মাণ, খাদ্য নিরাপত্তা ও বড় প্রকল্পকেন্দ্রিক প্রবৃদ্ধি। কিন্তু নতুন পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, বেসরকারি বিনিয়োগ, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত দুই বছরে দেশে কার্যকর কোনো মধ্যমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা না থাকায় নীতিনির্ধারণে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা স্থগিত হয়ে যাওয়ার পর মন্ত্রণালয়গুলো অনেকটা স্পষ্ট দিকনির্দেশনা ছাড়াই কাজ করছিল। নতুন এই কাঠামো সেই অনিশ্চয়তা দূর করার চেষ্টা করছে।
সরকারের পরিকল্পনায় প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও বড় লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কাঠামো অনুযায়ী, মেয়াদের শেষে মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ জিডিপির ৩৬.৭ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ বাড়িয়ে জিডিপির ২.৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
কর আদায়ের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম কম। নতুন পরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে এই হার ১০ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এবার উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হচ্ছে প্রযুক্তি ও উচ্চমূল্যের খাতগুলোকে। তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ব্লু ইকোনমিকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে কম মজুরিভিত্তিক অর্থনীতি থেকে বের হয়ে দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনে জোর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা রয়েছে। বিভিন্ন খাতে ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি মেধাভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে প্রায় ৫ লাখ মানুষকে সরকারি চাকরিতে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাতেও নতুনত্ব আনার কথা বলা হয়েছে। প্রথমবারের মতো বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য কাঠামোবদ্ধ পেনশন তহবিল এবং আনুষ্ঠানিক বেকার ভাতা চালুর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি বাস্তবায়িত হলে দেশের শ্রমবাজার ও সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে নতুন উন্নয়ন কৌশলের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হচ্ছে জবাবদিহিতা ও সুশাসনের ওপর জোর। অতীতের মতো শুধু কাগুজে পরিকল্পনা নয়, বরং প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে স্থানীয় পর্যায়ে প্রকল্প ড্যাশবোর্ড চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিকরা সরাসরি প্রকল্প ব্যয়, অগ্রগতি এবং বাস্তবায়নের সময়সীমা পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।
এছাড়া রাজনৈতিক প্রভাব বা স্বজনপ্রীতির ভিত্তিতে প্রকল্প অনুমোদনের সংস্কৃতি থেকে সরে আসার কথাও বলা হয়েছে। ভবিষ্যতে প্রকল্প অনুমোদনে অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা ও জনস্বার্থকে প্রধান ভিত্তি করা হবে বলে পরিকল্পনায় উল্লেখ রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না। কারণ ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছাতে হলে উচ্চ প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, দক্ষ প্রশাসন এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ—সবকিছু একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। তবুও দীর্ঘদিন পর একটি সুসংগঠিত অর্থনৈতিক রূপরেখা সামনে আসায় ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে সরকার যে নতুন উন্নয়ন কৌশল নিতে যাচ্ছে, তা শুধু একটি পরিকল্পনা নয়; বরং বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নতুন পথে নেওয়ার একটি বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

