সংযুক্ত আরব আমিরাত গত দুই দশক ধরে নিজেকে শুধু একটি ছোট উপসাগরীয় রাষ্ট্র হিসেবে দেখাতে চায়নি। দেশটি নিজের জন্য এমন এক ভাবমূর্তি তৈরি করেছিল, যেন আকারে ছোট হলেও প্রভাব, সম্পদ, সামরিক প্রস্তুতি ও কূটনৈতিক সংযোগের দিক থেকে তারা অনেক বড় শক্তির সমতুল্য। বন্দর, বাণিজ্যপথ, অর্থনৈতিক কেন্দ্র, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, প্রভাবশালী রাজধানীগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক, এমনকি বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিনিধি শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ—সব মিলিয়ে আবুধাবি নিজেকে এমন এক রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরেছিল, যাকে সহজে চাপে ফেলা যায় না।
এই ভাবমূর্তির পেছনে ছিল একটি পরিচিত ধারণা—‘ছোট স্পার্টা’। অর্থাৎ ছোট ভূখণ্ড, কিন্তু কঠোর সামরিক মনোভাব, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং নিজের চারপাশের রাজনৈতিক পরিবেশকে প্রভাবিত করার উচ্চাকাঙ্ক্ষা। সংযুক্ত আরব আমিরাত বহু বছর ধরে এই ধারণাটিকেই নিজের কৌশলগত পরিচয়ের অংশ বানিয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ইরান সংঘাত সেই আত্মবিশ্বাসের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে।
গত তিন মাসের ঘটনাপ্রবাহ আবুধাবিকে কঠিন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে উপসাগরীয় অবকাঠামোর ওপর হামলা আমিরাতকে মনে করিয়ে দিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক অর্থ, বন্দর, কূটনৈতিক যোগাযোগ ও সামরিক প্রস্তুতি থাকলেও ভূগোলকে অস্বীকার করা যায় না। ইরান কাছেই আছে। তার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতার আওতায় আমিরাতের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো, আর্থিক কেন্দ্র ও বাণিজ্যিক প্রবাহ পড়ে। ফলে দেশটির তৈরি করা অজেয়তার ভাবমূর্তি বাস্তব নিরাপত্তা সংকটের সামনে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
আমিরাতের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ সাম্প্রতিক এক বার্তায় প্রতিবেশী ও অংশীদারদের ভূমিকা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্যে বোঝা যায়, আবুধাবি আশা করেছিল যে ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিতে উপসাগরীয় প্রতিবেশী ও মিত্ররা দৃঢ়ভাবে পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু বাস্তবতা তা হয়নি। কেউ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় গেছে, কেউ সতর্ক থেকেছে, কেউ সরাসরি সংঘাতে জড়াতে চায়নি। এই অবস্থাই আবুধাবির ক্ষোভের প্রধান কারণ।
আমিরাতের কৌশলগত চিন্তায় দীর্ঘদিন ধরে একটি বিশ্বাস কাজ করেছে—সংযোগই শক্তি। অর্থাৎ বিশ্ববাণিজ্যের কেন্দ্র হওয়া, আন্তর্জাতিক পুঁজির গন্তব্য হওয়া, বন্দর ও সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ বিন্দু হয়ে ওঠা, পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখা, আবার একই সঙ্গে মস্কো ও বেইজিংয়ের সঙ্গেও দরজা খোলা রাখা—এসবই যেন নিরাপত্তার এক ধরনের ঢাল। কিন্তু ইরান সংঘাত দেখিয়ে দিয়েছে, সংযোগ ক্ষমতা তৈরি করতে পারে, তবে সব সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না।
বরং এই সংযুক্ত অবস্থানই আমিরাতকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে। কারণ দেশটির অর্থনীতি নির্ভর করে আস্থা, স্থিতিশীলতা ও অবিচ্ছিন্ন প্রবাহের ওপর। বিনিয়োগকারী, বীমা কোম্পানি, জাহাজ চলাচল, বিদেশি কর্মী, পর্যটন, আর্থিক লেনদেন—সবকিছুই নিরাপত্তার ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে। ইরান যদি শুধু এই বার্তাটুকু দিতে পারে যে আমিরাত নিরাপদ ব্যতিক্রম নয়, তাহলে সেটিই আবুধাবির জন্য বড় কৌশলগত ক্ষতি। কারণ আমিরাতের শক্তি তার খোলা অর্থনীতি, আর সেই খোলামেলাতাই তাকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।
এই সংকট আরও একটি সত্য সামনে এনেছে। আমিরাত বহু বছর ধরে বিভিন্ন সংঘাত, বাজার ও কূটনৈতিক দরকষাকষিতে নিজের প্রভাব বাড়িয়েছে। ইয়েমেন থেকে সুদান, বন্দর থেকে বিনিয়োগ, নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান থেকে তথ্যপ্রবাহ—সব জায়গায় আবুধাবি নিজের উপস্থিতি বাড়িয়েছে। কিন্তু এই বিস্তৃত প্রভাব ইরানের মতো প্রতিবেশী শক্তিকে ঠেকানোর মতো সরাসরি প্রতিরোধক্ষমতায় রূপ নেয়নি। রাশিয়ার সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও মস্কো আমিরাতের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয়নি। বেইজিং উদ্বেগ ও স্থিতিশীলতার কথা বলেছে, কিন্তু প্রতিরক্ষার ভার নেয়নি। ওয়াশিংটন আশ্বাস দিলেও বাস্তব প্রতিরোধের ক্ষেত্রে আবুধাবি প্রত্যাশিত ফল পায়নি।
এখানেই আমিরাতের কৌশলগত দ্বন্দ্ব। দেশটি এমন এক প্রভাবযন্ত্র তৈরি করেছে, যা অঞ্চলের অনেক ছোট রাষ্ট্রের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। কিন্তু একই সঙ্গে দেশটি ভৌগোলিক বাস্তবতার বন্দি। তার বন্দর ইরানের হামলার নাগালে, তার অর্থনীতি আস্থাভিত্তিক, তার জনসংখ্যা কাঠামো বহির্ভর, এবং তার নিরাপত্তা এখনো বাইরের নিশ্চয়তার ওপর নির্ভরশীল। ফলে ‘আমরা আলাদা’—এই ধারণা যুদ্ধের বাস্তবতায় এসে দুর্বল হয়ে গেছে।
আমিরাতের সাম্প্রতিক বার্তাগুলোতে তাই এক ধরনের অস্থির আত্মরক্ষার সুর শোনা যায়। আবুধাবি এখনো দেখাতে চায় যে তারা দৃঢ়, সক্ষম এবং ভয় পায় না। কিন্তু এই প্রদর্শন যত বেশি জোরালো হচ্ছে, ততই বোঝা যাচ্ছে যে দেশটি গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক জবাব দিলেও সেটি প্রতিরোধের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে কতটা সফল হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কারণ ইরানের বিপ্লবী গার্ড ক্ষতি সহ্য করার ক্ষমতায় উপসাগরীয় ধনী রাষ্ট্রগুলোর চেয়ে ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক ও সামরিক সংস্কৃতিতে কাজ করে।
আবুধাবি প্রতিবেশীদের নিয়ে আরও দৃঢ় যৌথ সামরিক অবস্থান গড়তে চেয়েছিল। কিন্তু সেই আহ্বান প্রত্যাশিত সাড়া পায়নি। এরপর আমিরাত কৌশলগত বার্তা, আন্তর্জাতিক প্রচার, পশ্চিমা রাজধানীতে লবিং এবং নিজেদের দৃঢ়তা দেখানোর প্রচেষ্টায় বেশি মন দিয়েছে। এই প্রচারে কখনো কখনো উপসাগরীয় প্রতিবেশী, আরব জোট, এমনকি মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্রগুলোকেও সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে।
কিন্তু সমস্যার গভীরতা এখানেই। আমিরাত দীর্ঘদিন ধরে উপসাগরীয় যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষার সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখেছে। সৌদি আরব, কাতার, ওমান, কুয়েত, বাহরাইন—প্রত্যেকের নিজস্ব কৌশল, ভয় ও হিসাব আছে। আমিরাত অনেক সময় নিজেকে তাদের চেয়ে বেশি দ্রুত, বেশি কার্যকর এবং বেশি আধুনিক নিরাপত্তা-রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরেছে। এখন সংকটে পড়ে সে বুঝতে পারছে, যাদের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যেতে চেয়েছিল, সেই প্রতিবেশীদের ছাড়া নিজের নিরাপত্তা স্থিতিশীল করা সম্ভব নয়।
এখানে একটি বড় শিক্ষাও আছে। মধ্যস্থতা সব সময় বিশ্বাসঘাতকতা নয়। পাকিস্তান, কাতার বা ওমান যদি উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করে, তা উপসাগরীয় নিরাপত্তার আরেক ধরনের ভূমিকা হতে পারে। সৌদি আরব যদি সতর্ক থাকে, সেটি দুর্বলতার লক্ষণ নাও হতে পারে; বরং তার ভূগোল, জনসংখ্যা, জ্বালানি অবস্থান ও কৌশলগত গভীরতার হিসাব ভিন্ন। আমিরাতের জন্য এই ভিন্নতাগুলোকে বিরক্তির চোখে না দেখে, একটি যৌথ নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখা জরুরি।
ইসরায়েলের সম্ভাব্য সহায়তাও এই বাস্তবতা বদলাতে পারে না। কারণ বাইরের সামরিক সহযোগিতা ভৌগোলিক ঝুঁকি মুছে দেয় না। উপসাগরের নিরাপত্তা উপসাগরীয় বাস্তবতার মধ্যেই গড়তে হবে। আমিরাত যদি মনে করে, পশ্চিমা নিশ্চয়তা, ইসরায়েলি সহায়তা বা আন্তর্জাতিক প্রচার দিয়ে একা নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, তাহলে সেটি আবারও একই ভুল ধারণার পুনরাবৃত্তি হবে।
এই সংঘাত আমিরাতকে একটি কঠিন সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড় করিয়েছে। দেশটি কি আগের মতোই নিজেকে ব্যতিক্রমী, আলাদা ও প্রায় অজেয় হিসেবে দেখাতে থাকবে? নাকি স্বীকার করবে যে, ছোট রাষ্ট্রের উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকতে পারে, কিন্তু সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষা ভৌগোলিক দুর্বলতা মুছে দিতে পারে না?
আমিরাতের সমস্যা উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়। সমস্যা হলো, সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষা যদি বাস্তবতার জায়গা দখল করে নেয়। একটি ছোট রাষ্ট্র মধ্যশক্তির মতো আচরণ করতে পারে, প্রভাব বাড়াতে পারে, কূটনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারে, সামরিক সক্ষমতা উন্নত করতে পারে। কিন্তু সে যদি ভাবে, এসব দিয়ে সে নিজের অঞ্চলগত নিরাপত্তা বাস্তবতা থেকে মুক্ত হয়ে গেছে, তাহলে সংকটের মুহূর্তে সেই ভুল ধারণা ভেঙে পড়বেই।
ইরান যুদ্ধ তাই আমিরাতের জন্য শুধু সামরিক বা কূটনৈতিক ধাক্কা নয়; এটি আত্মপরিচয়ের সংকটও। ‘ছোট স্পার্টা’ ভাবমূর্তি এত দিন শক্তির ভাষা তৈরি করেছিল। কিন্তু এখন প্রয়োজন হয়তো আরও সংযত ভাষা—সমন্বয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, পারস্পরিক নির্ভরতা এবং বাস্তববাদ। উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা আলাদা আলাদা কাচের দেয়ালে বন্দি নয়। একটির অস্থিরতা অন্যটির বাজার, বন্দর, জ্বালানি, কূটনীতি ও জননিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে।
শেষ পর্যন্ত আবুধাবির সামনে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো: একা নিরাপদ থাকা যায় না, বিশেষ করে এমন অঞ্চলে যেখানে হুমকি সীমান্ত মানে না। আমিরাত তার ভবিষ্যৎ গড়তে পারবে, তবে তা একা নয়। উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে নতুন নিরাপত্তা সমঝোতা, বাস্তবভিত্তিক কূটনীতি এবং অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের বদলে যৌথ ঝুঁকি বোঝার মধ্য দিয়েই দেশটি স্থিতিশীলতা খুঁজে পেতে পারে।
‘ছোট স্পার্টা’ হয়তো এক সময় শক্তিশালী প্রতীক ছিল। কিন্তু ইরান যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে, প্রতীক দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানো যায় না, প্রচার দিয়ে বিনিয়োগকারীর ভয় দূর করা যায় না, আর একক উচ্চাকাঙ্ক্ষা দিয়ে যৌথ নিরাপত্তার অভাব পূরণ করা যায় না। আমিরাত যদি সত্যিই দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ হতে চায়, তবে তাকে প্রথমে স্বীকার করতে হবে—উপসাগরের ভাগ্য থেকে নিজেকে আলাদা করে দেখা আর সম্ভব নয়।
সিভি/এইচএম

