সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক স্বাধীন সচিবালয় গঠনের নির্দেশ দিয়ে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছিল, তার বিরুদ্ধে আপিল করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। আজ বৃহস্পতিবার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল।
গত ৭ এপ্রিল হাইকোর্টের দেওয়া ১৮৫ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি প্রকাশিত হয়। ওই রায়ে বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় তিন মাসের মধ্যে গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এর আগে গত ১৯ মে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করে ১৫ জন কর্মকর্তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশে মঙ্গলবার এ বিষয়ে পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করে আইন ও বিচার বিভাগ। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ১০ এপ্রিল থেকে ওই কর্মকর্তাদের আইন মন্ত্রণালয়ে যোগদান দেখানো হয়েছে।
এর আগের দিন জাতীয় সংসদে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়। প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ অনুযায়ী বিচার বিভাগের ১৫ জন কর্মকর্তাকে পরবর্তী উপযুক্ত পদে পদায়ন না হওয়া পর্যন্ত আইন ও বিচার বিভাগে সংযুক্ত রাখা হলো।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বাতিল আইন চ্যালেঞ্জ করে এবং সচিবালয়ের কার্যক্রমে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশনা চেয়ে রিট দায়ের করা হয়। পরে গত ২০ এপ্রিল বিষয়টি শুনানির জন্য ওঠে, তবে সেদিন শুনানি হয়নি। রিটের পক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির এবং রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল।
২০ এপ্রিল শুনানি শেষে শিশির মনির জানান, রাষ্ট্রপক্ষ আদালতকে জানিয়েছে তারা দ্রুতই হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে। আদালতও এ বিষয়ে আপিল করার প্রত্যাশা প্রকাশ করে। একই সঙ্গে আদালত আশা প্রকাশ করে, আপিল চলমান থাকা অবস্থায় সুপ্রিম কোর্টের বিদ্যমান কাঠামোয় দ্রুত কোনো পরিবর্তন না আনা হয়।
এর আগে সাতজন আইনজীবীর রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠনের নির্দেশ দিয়েছিল। ওই রায়ের ভিত্তিতে পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করে অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এতে জনবল নিয়োগসহ প্রায় নব্বই শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ক্ষমতায় এসে ওই অধ্যাদেশ বাতিল করে দেয়।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা বারবার বাধার মুখে পড়েছে:
১৯৭২ সালের সংবিধানে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত ছিল। তবে ১৯৭৪ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সেই দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির হাতে চলে যায়। পরে ১৯৭৯ সালে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির এই ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শের বিধান যুক্ত করা হয়।
১৯৯৪ সালে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করার দাবিতে রিট আবেদন করেন জেলা জজ এবং তৎকালীন জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মাসদার হোসেন। এ বিষয়ে হাইকোর্ট ১৯৯৭ সালে তাঁর পক্ষে রায় দেন। রাষ্ট্রপক্ষ ওই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে। পরে ১৯৯৯ সালে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে এবং বিচার বিভাগ পৃথক করার পাশাপাশি ১২ দফা নির্দেশনা প্রদান করে।
আপিল বিভাগের নির্দেশনার আলোকে ২০০১ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করার জন্য একটি খসড়া আইন প্রস্তুত করা হয়। ওই খসড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবদের কাছেও পাঠানো হয়েছিল। সাবেক প্রধান বিচারপতি ও তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা লতিফুর রহমান তাঁর লেখা একটি বইয়ে উল্লেখ করেন, ২০০১ সালের ১ অক্টোবর জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ৩ অক্টোবর উপদেষ্টা পরিষদের সভায় বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের আইন অধ্যাদেশ আকারে জারির জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।
তিনি আরও লেখেন, ওই দিনই পরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া টেলিফোনে প্রধান উপদেষ্টাকে অনুরোধ করেন, বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের বিষয়টি তাঁদের নির্বাচনী অঙ্গীকারে রয়েছে, তাই এটি তাঁদের সরকারের জন্য রেখে দেওয়ার জন্য। তিনি আশ্বাস দেন, ক্ষমতায় এলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
তবে পরবর্তীতে বিএনপি সরকারের সময়ে বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক হয়নি। পরে ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকলেও পৃথক সচিবালয় গঠনের বিষয়টি বাস্তবায়ন হয়নি।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের দশজন আইনজীবী সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদন করেন। এতে বলা হয়, ওই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অধস্তন আদালতের বিচারকদের পদোন্নতি ও বদলির ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে থাকায় নির্বাহী বিভাগের সরাসরি হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি হয়, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করে।
এরপর হাইকোর্ট এ বিষয়ে রুল জারি করে। ওই রুল নিষ্পত্তি করে গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর রায় দেওয়া হয়। রায়ে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করা হয়। এতে অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা সুপ্রিম কোর্টের হাতে ন্যস্ত করা হয়। একই সঙ্গে তিন মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেওয়া হয়।
রায়ে হাইকোর্ট উল্লেখ করে, ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের মাধ্যমে ১১৬ অনুচ্ছেদে আনা পরিবর্তন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। একইভাবে ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনী আইনের মাধ্যমে করা পরিবর্তনও অসাংবিধানিক বলে উল্লেখ করা হয়। আদালত আরও বলেন, ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে যেমন ছিল, তেমনভাবেই ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল থাকবে।
রায়ে আরও বলা হয়, জাতীয় সংসদ সচিবালয় ও নির্বাচন কমিশন সচিবালয় স্বাধীনভাবে কাজ করলেও বিচার বিভাগের জন্য আলাদা কোনো সচিবালয় নেই, যা একটি সাংবিধানিক অঙ্গ হিসেবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এই রায়ের পর গত বছরের ৩০ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ জারি করা হয়। একই বছরের ১১ ডিসেম্বর সচিবালয়ের কার্যালয় উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যে সরকারই আসুক, সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। আইনের শাসন ও গণতন্ত্র রক্ষায় এই কাঠামো অটুট রাখা জরুরি বলেও তিনি মত দেন।

