আপিল বিভাগে বিষয়টি চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগেই সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রম বিলুপ্ত করায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট। আদালতের পর্যবেক্ষণ ঘিরে বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের সম্পর্ক নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
বুধবার সকালে বিচারপতি আহমেদ সোহেলের বেঞ্চে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্তির প্রজ্ঞাপন উপস্থাপন করা হলে আদালত রাষ্ট্রপক্ষের উদ্দেশে জানতে চান, বিচারাধীন একটি বিষয়ে কীভাবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হলো। আদালতের এ প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি সাংবাদিকদের জানান রিটকারী আইনজীবী শিশির মনির।
তিনি দাবি করেন, আপিল বিভাগে মামলা নিষ্পত্তির আগেই সচিবালয়ের কার্যক্রম বন্ধ করে সরকার কার্যত আদালতের নির্দেশনার প্রতি অসম্মান দেখিয়েছে। তার ভাষ্য, বিষয়টি আদালত অবমাননার সামিল। এ ঘটনায় সরকারের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার আবেদন করা হবে বলেও জানান তিনি।
আইনজীবী শিশির মনির আরও বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশকে প্রশ্নের মুখে পড়তে হতে পারে। তার মতে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত দেশের বিচারব্যবস্থার ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
মঙ্গলবার আইন মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করে। একই সঙ্গে সেখানে দায়িত্ব পালন করা ১৫ জন বিচারককে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। এর ফলে বিচার বিভাগ পৃথককরণের প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আরও কার্যকরভাবে পৃথক করতে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে বিএনপি সরকার সেই অধ্যাদেশ বাতিল করে দেয়। তবে বিচার বিভাগ পৃথককরণসংক্রান্ত এক রায়ে হাইকোর্ট নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষ সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও এখনো আপিল দায়ের করা হয়নি বলে জানা গেছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পৃথক সচিবালয় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ বিচারকদের বদলি, প্রশাসনিক তদারকি ও বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনায় নির্বাহী বিভাগের প্রভাব কমানোই ছিল এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
তারা বলছেন, বিচার বিভাগ পৃথককরণ বাংলাদেশের সংবিধান ও আইনের শাসনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আদালতের পর্যবেক্ষণ, বিচারাধীন অবস্থা এবং সাংবিধানিক ভারসাম্য বিবেচনায় রাখা জরুরি। এদিকে সচিবালয় বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক ও আইন অঙ্গনেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ এটিকে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ বলছেন, এতে বিচার বিভাগের স্বাতন্ত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আপিল বিভাগে বিষয়টির চূড়ান্ত শুনানি ও আদালতের পরবর্তী নির্দেশনার ওপর এখন অনেক কিছু নির্ভর করছে। কারণ এ মামলার রায় ভবিষ্যতে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কাঠামো ও স্বাধীনতার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে উঠতে পারে।

