বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা এখন কেবল সরকার পরিবর্তনের গল্পে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একই সঙ্গে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ধারক মুহূর্ত। এই পরিবর্তনের ভেতরেই ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা খুঁজছে দেশের অর্থনীতি।
ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়েই দেখা গেছে, রাজনৈতিক রূপান্তরের পর অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় আস্থা পুনর্গঠন। কারণ বিনিয়োগ কোনো যান্ত্রিক অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া নয়। এটি মূলত একটি দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিনিয়োগকারীর বিশ্বাস, নীতির ধারাবাহিকতা সম্পর্কে তার মূল্যায়ন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার ওপর আস্থার প্রতিফলন। বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন সরকারের সামনে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—তারা কি এমন একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে পারবে, যেখানে দেশীয় উদ্যোক্তা ও বিদেশি বিনিয়োগকারী উভয়ই দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা দেখতে পাবেন?
বাংলাদেশের অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তি এখনো শক্ত অবস্থানে রয়েছে। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের বিশাল ভোক্তা বাজার, তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগভিত্তিক কৌশলগত অবস্থান এবং গত এক দশকে অবকাঠামো খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ—সব মিলিয়ে দেশটিকে একটি সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার সক্ষমতা রয়েছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, দ্রুতগতির সড়ক, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামোর সম্প্রসারণ অর্থনীতির ভিত্তিকে আরও বিস্তৃত করেছে।
তবে বাস্তবতা বলছে, বিনিয়োগকারীরা কেবল অবকাঠামো দেখে সিদ্ধান্ত নেন না। তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো স্থিতিশীলতা, পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং নীতিনির্ভরতার নিশ্চয়তা। আর ঠিক এই জায়গাতেই বাংলাদেশ এখনো কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি।
বর্তমান অর্থনীতিতে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, ডলারের বিনিময় হার নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সুদের হার বৃদ্ধির কারণে বিনিয়োগ প্রবাহে একধরনের সতর্ক অবস্থান তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে মুদ্রাস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে থাকলে তার প্রভাব কেবল ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; উৎপাদন খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
শিল্প খাতে কাঁচামাল, জ্বালানি, পরিবহন এবং শ্রম ব্যয় বাড়তে থাকায় অনেক প্রকল্পের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা সংকুচিত হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে সুদের হার বৃদ্ধি পেলে প্রকল্প অর্থায়নের খরচও বেড়ে যায়, ফলে বহু সম্ভাবনাময় উদ্যোগ শুরু হওয়ার আগেই থেমে যায়। এই পরিস্থিতিতে নতুন সরকারের অর্থনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রে থাকা প্রয়োজন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুদের হার ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য আনা এবং মুদ্রানীতির মাধ্যমে বাজারে আস্থা পুনরুদ্ধার করা।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো, বিনিয়োগকারীরা করছাড়ের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেন নীতি-স্থিতিশীলতাকে। একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী সাধারণত বিবেচনা করেন, তিনি যদি ১০ বছরের জন্য কোনো শিল্প স্থাপন করেন, তবে করনীতি, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, আমদানি কাঠামো বা শিল্প প্রণোদনা হঠাৎ পরিবর্তিত হবে কি না।
বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় দুর্বলতা হলো—নীতিগত ঘোষণা থাকলেও বাস্তবায়নে প্রায়ই অসংগতি দেখা যায়। কখনো হঠাৎ আমদানি সীমিত করা হয়, কখনো ডলারের বাজারে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়, আবার রাজস্ব কাঠামোয় আকস্মিক পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়। ফলে অনেক বিনিয়োগকারী বাংলাদেশকে সম্ভাবনাময় হলেও নীতিগতভাবে অনিশ্চিত বাজার হিসেবে বিবেচনা করেন। এই বাস্তবতায় নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে একটি ৫ থেকে ১০ বছর মেয়াদি সুস্পষ্ট বিনিয়োগ রূপরেখা তৈরি করা, যেখানে নীতির ধারাবাহিকতাকে প্রধান বার্তা হিসেবে তুলে ধরা হবে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের ঝুঁকি মূলত তিনটি স্তম্ভে দাঁড়িয়ে আছে—নীতি ঝুঁকি, মুদ্রা ঝুঁকি এবং প্রশাসনিক ঝুঁকি। নীতি ঝুঁকি কমাতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেও অর্থনৈতিক নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মুদ্রা ঝুঁকি কমাতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আর প্রশাসনিক ঝুঁকি কমাতে সবচেয়ে জরুরি হলো আমলাতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক সংস্কার।

