নতুন সরকারের প্রথম বাজেট ঘিরে ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা এবার কিছুটা ভিন্ন। তারা চান, কেবল বড় অঙ্কের ব্যয়ের ঘোষণা নয়, বরং এমন বাস্তবধর্মী উদ্যোগ আসুক যা ব্যবসা সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরির বিষয়টি এবারের বাজেটে গুরুত্ব পাবে বলে আশা করছেন তারা।
ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার চেয়ে স্থিতিশীল ও ব্যবসাবান্ধব নীতিই বেশি প্রয়োজন। তারা মনে করছেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে করনীতিতে স্বস্তি দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমাতে কার্যকর পদক্ষেপও থাকতে হবে বাজেটে।
ব্যবসায়ী মহলের একটি অংশ মনে করছে, ৩০ বছরের নিচের উদ্যোক্তাদের জন্য পাঁচ বছরের করমুক্ত সুবিধা চালু করা হলে তা নতুন প্রজন্মকে ব্যবসায় আগ্রহী করতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এটিকে সম্ভাব্য বাজেটের অন্যতম নতুনত্ব হিসেবেও দেখছেন কেউ কেউ।
তাদের ভাষ্য, কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে বড় বরাদ্দের পাশাপাশি উদ্যোক্তা তৈরিতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। কারণ নতুন বিনিয়োগ ও নতুন উদ্যোক্তা ছাড়া অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। তবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও এবারের বাজেটে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে সরকার বড় ধরনের করছাড় বা প্রণোদনা দিতে খুব বেশি সুযোগ পাবে না বলেও ধারণা তাদের।
দেশের বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের বাজেটে তারা এমন সিদ্ধান্ত দেখতে চান যা ব্যবসার পরিবেশ সহজ করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনতে সহায়তা করবে।
উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতি নয়, কার্যকর উদ্যোগ চায় ব্যবসায়ীরা:
নতুন সরকারের প্রথম বাজেটকে ঘিরে ব্যবসায়ী মহলে বাড়ছে প্রত্যাশা। তবে তারা বড় বড় ঘোষণা নয়, বরং বাস্তবায়নযোগ্য ও কার্যকর পদক্ষেপকে বেশি গুরুত্ব দিতে বলছেন। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ব্যবসাবান্ধব নীতি গ্রহণের ওপর জোর দিচ্ছেন উদ্যোক্তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি-এর সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, তারা এমন একটি বাস্তবমুখী বাজেট প্রত্যাশা করছেন যেখানে উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতির বদলে বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা অগ্রাধিকার পাবে। তার মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে করহার স্থিতিশীল রাখা, ভ্যাট ও কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করা এবং অপ্রয়োজনীয় মূল্যবৃদ্ধি ও নিয়ন্ত্রক জটিলতা কমানো জরুরি। এতে উদ্যোক্তারা আরও স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রয়োজন। সেই পরিকল্পনায় রপ্তানি খাতের বহুমুখীকরণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য সহজ ঋণ সুবিধা এবং উৎপাদন খাতে প্রণোদনা থাকতে হবে। একইসঙ্গে অবকাঠামো উন্নয়ন ও লজিস্টিক ব্যয় কমানোর উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।
ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরানোর বিষয়েও গুরুত্ব দিয়েছেন ডিসিসিআই সভাপতি। তার ভাষায়, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠনের মাধ্যমে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বড় ছাড় নয়, স্থিতিশীল নীতিই এখন প্রত্যাশা:
আসন্ন জাতীয় বাজেটকে ঘিরে ব্যবসায়ী মহলে বড় ধরনের সুবিধা বা চমকের প্রত্যাশা নেই। বরং বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ব্যবসাবান্ধব স্থিতিশীল নীতি এবং ব্যয় কমানোর উদ্যোগকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন তারা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ-এর সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, নতুন সরকারের বয়স এখনো খুব বেশি হয়নি। এর মধ্যেই আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংকট ও বৈশ্বিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তাই এবারের বাজেটে বড় কোনো নতুনত্ব বা চমক আসবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয় বলেই মনে করেন তিনি।
তার মতে, ব্যবসায়ীদের প্রধান চাওয়া হলো নতুন করে করের চাপ না বাড়িয়ে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া। তিনি বলেন, করজাল সম্প্রসারণ না হওয়ায় একই করদাতাদের ওপর বারবার বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। এতে নিয়মিত কর প্রদানকারীরাই বেশি সমস্যায় পড়ছেন। এজন্য করহার বাড়ানোর পরিবর্তে নতুন করদাতাদের আওতায় আনার কার্যকর উদ্যোগ দেখতে চান ব্যবসায়ীরা।
তিনি আরও বলেন, সাধারণ মানুষ এখন নিত্যপণ্যের দাম কমার প্রত্যাশা করছে। পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা নজর রাখছেন ব্যবসার পরিবেশ কতটা অনুকূলে যাচ্ছে তার ওপর। বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তা, জ্বালানির মূল্য, পরিবহন ও লজিস্টিক ব্যয় এবং ব্যাংকঋণের সুদের হার এখন ব্যবসার জন্য বড় উদ্বেগের কারণ।
বিসিআই সভাপতি মনে করেন, বর্তমানে উচ্চ সুদহার ও বাড়তি পরিচালন ব্যয় বিনিয়োগে চাপ তৈরি করছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার যদি অতিরিক্তভাবে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাত প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হতে পারে। তাই সরকার কীভাবে বিকল্প উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করবে, সে বিষয়ে বাজেটে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

