২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্যদের পদত্যাগের যে ঢল নেমেছিল, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আবারও সেই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটছে। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্যরা পদত্যাগে বাধ্য হন।
তবে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতি আবার বদলাতে শুরু করে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া উপাচার্যরা এখন একে একে পদত্যাগ করছেন এবং অনেককে অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে। পদত্যাগ ও অব্যাহতি পাওয়া অনেক উপাচার্যই তাদের পূর্বের কর্মস্থলে ও মূল পদে ফিরে গেছেন। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান নিয়োগ পেয়েছেন ড. ইউনূসের বেসরকারি গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর দেশের ৫৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। ওই সময় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে জনতার চাপ ও পরিস্থিতির কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের উপাচার্য পদত্যাগ করেন।
সরকার পতনের পরপরই অন্তত ১৩ জন উপাচার্য পদত্যাগ করেন, যার মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামালও ছিলেন। পরে অন্তর্বর্তী সরকার ৫৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব শূন্য পদে নতুন নিয়োগ দেয়।
পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর ১৭ মার্চ বিএনপি সরকার গঠনের পর আবারও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে পরিবর্তনের ধারা শুরু হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পদত্যাগ করেন। নির্বাচিত সরকার গঠনের মাত্র ১২ দিনের মধ্যেই তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন। পরে তিনি ড. ইউনূসের বেসরকারি গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ে পরামর্শক হিসেবে যোগ দেন।
এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ গত ১৪ মে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ১১টি পাবলিক ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে অব্যাহতি দেয়। একই সঙ্গে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয় এবং অব্যাহতি পাওয়া ব্যক্তিদের নিজ নিজ মূল পদে ফেরার অনুমতিও দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু বোরহান মোহাম্মদ বদরুজ্জামানকে অব্যাহতি দিয়ে পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে ফিরতে বলা হয়েছে। ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীনকে তার আগের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক পদে যোগ দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহকে অব্যাহতি দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক পদে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. হায়দার আলীকে তার আগের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক পদে ফিরতে বলা হয়েছে।
রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মো. আতিয়ার রহমানকে অব্যাহতি দিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি ও মলিকুলার বায়োলজি বিভাগে যোগদানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইসমাইলকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রি ও কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল আজীম আখন্দকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োটেকনোলজি বিভাগে যোগদানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রোকনুজ্জামানকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগে ফিরতে বলা হয়েছে।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলমকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এস এম আব্দুল আওয়াল গত ১৬ মার্চ পদত্যাগ করেন। তিনি আগের পদে না ফিরে বর্তমানে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক হিসেবে নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন।

