দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে চালুর দ্বারপ্রান্তে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল। পরিচালনা সংক্রান্ত প্রায় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। এখন শুধু বাকি পরিচালনা চুক্তি সই। সংশ্লিষ্টদের আশা, আগামী ১৬ জুলাই এই চুক্তি সম্পন্ন হতে পারে। আর সরকারের লক্ষ্য, ১৬ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে টার্মিনাল উদ্বোধন করা।
বেবিচকের সদস্য (অপারেশন) এয়ার কমডোর আবু সাঈদ মেহবুব খান জানিয়েছেন, পুরো প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। তিনি বলেন, গত ১৭ মে জাপানি কনসোর্টিয়ামের কাছে প্রস্তাব আহ্বানপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী ৪২ দিনের মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার কথা। সেই হিসাবে জুনের মধ্যেই প্রক্রিয়া শেষ করার সুযোগ রয়েছে।
তিনি আরও জানান, সবকিছু ঠিকভাবে এগোলে ১৬ জুলাই চুক্তি সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারের নির্ধারিত ১৬ ডিসেম্বর উদ্বোধনের লক্ষ্য অনুযায়ী প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নানা জটিলতা ও একাধিক দফা দরকষাকষির পর থার্ড টার্মিনালের পরিচালনা কাঠামো প্রায় চূড়ান্ত। বহুল আলোচিত এই প্রকল্পে রাজস্ব ভাগাভাগিতে বড় অংশ পাচ্ছে জাপানি কনসোর্টিয়াম। প্রস্তাবিত সমঝোতা অনুযায়ী, চারটি প্রধান খাত থেকে অর্জিত আয়ের ৭৩ শতাংশ পাবে জাপানি পক্ষ, আর বাংলাদেশ পাবে ২৭ শতাংশ।
সূত্র আরও জানায়, টার্মিনালের অবকাঠামো নির্মাণকাজ প্রায় দুই বছর আগেই শেষ হলেও পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, আয় বণ্টন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে এটি চালু করা সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি জাপানি পক্ষের প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার পাওনা পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়ার পর আলোচনায় গতি আসে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত কাজের বিল পরিশোধও চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এরপর ধারাবাহিক বৈঠকে দুই পক্ষ পরিচালনা কাঠামো, সেবার মান, আন্তর্জাতিক পরিচালনা ব্যবস্থা, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং রাজস্ব বণ্টন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে সমঝোতায় পৌঁছায়।
চূড়ান্ত পরিকল্পনা অনুযায়ী, থার্ড টার্মিনালের চারটি প্রধান খাত—যাত্রী প্রস্থান ফি, দোকান ও লাউঞ্জ ভাড়া, কার্গো ব্যবস্থাপনা চার্জ এবং পার্কিং ভাড়া থেকে আয় সংগ্রহের দায়িত্ব থাকবে জাপানি কনসোর্টিয়ামের হাতে। এই খাতগুলো থেকে অর্জিত আয়ের ৭৩ শতাংশ যাবে জাপানি পক্ষের কাছে এবং ২৭ শতাংশ পাবে বাংলাদেশ।
তবে বিমানবন্দরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাত সরাসরি বেবিচকের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এর মধ্যে রয়েছে আকাশপথ ব্যবহার ফি এবং বিমান অবতরণ ফি। পাশাপাশি কাস্টমস, নিরাপত্তা ও ইমিগ্রেশন কার্যক্রম বাংলাদেশের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। ফলে কৌশলগত ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি সরকারের হাতেই থাকছে।
সরকারের ভেতরেও এ বিষয়ে একাধিক দফা আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে দেশের আর্থিক স্বার্থ, জাইকার ঋণ পরিশোধ, পরিচালন ব্যয় এবং কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ—সব দিক বিবেচনায় নীতিনির্ধারকরা সতর্ক অবস্থান নেন। দীর্ঘ আলোচনার পরই বর্তমান কাঠামোয় দুই পক্ষ একমত হয় বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আরও জানান, জাপানি পক্ষ তাদের প্রস্তাবে যাত্রীসেবা, কার্গো ব্যবস্থাপনা, প্রস্থান ফি, অগ্রিম অর্থ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার পূর্ণাঙ্গ কাঠামো উপস্থাপন করেছে। তাদের দাবি, এই মডেল বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে স্থিতিশীল রাজস্ব প্রবাহ নিশ্চিত হবে। পাশাপাশি জাইকার ঋণ পরিশোধের চাপও কমবে।
এছাড়া দ্রুত পরিচালনা শুরু, বিশ্বমানের ব্যবস্থাপনা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালু, কার্গো সম্প্রসারণ এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে বলেও তারা মনে করছেন।
এর আগে বিভিন্ন বৈঠকে জাপানি প্রতিনিধিরা টোকিওর হানেদা ও নারিতা বিমানবন্দর পরিচালনার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তাদের দাবি, সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আগামী ১৫ বছরের মধ্যে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যাত্রী ও কার্গো সক্ষমতা দ্বিগুণ করা সম্ভব। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান অগ্রগতি অব্যাহত থাকলে আগামী ডিসেম্বরেই থার্ড টার্মিনাল চালুর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
চালু হলে দেশের বিমান পরিবহন খাতে বড় পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যাত্রীসেবা হবে আরও আধুনিক ও গতিশীল। বাড়বে ধারণক্ষমতা। আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সগুলোর ফ্লাইট পরিচালনাও সহজ হবে। একই সঙ্গে কার্গো পরিবহন ব্যবস্থায় গতি আসবে, যা দেশের রফতানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

