দেশের ব্যাংক খাতে অনিয়ম, ঋণ কেলেঙ্কারি ও দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। খেলাপি ঋণে ডুবেও কিছু ব্যাংকমালিকের বিলাসী জীবনযাপন নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানিয়ে তিনি বলেছেন, দেশের মানুষ যখন আর্থিক সংকটে, তখন বিপর্যস্ত ব্যাংকের মালিকদের জীবনধারা সাধারণ মানুষের কাছে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুক্রবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত অর্থনীতি ও বাজেটবিষয়ক এক নীতি সংলাপে বক্তব্য দিতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের আর্থিক খাতে যা ঘটেছে, তার দায় শুধু সরকারের নয়; বেসরকারি খাতকেও সামনে এসে সত্য কথা বলতে হবে। কোন খাতে কী ধরনের অনিয়ম হয়েছে এবং কেন হয়েছে, তা প্রকাশ করা এখন সময়ের দাবি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
একটি সংকটে থাকা ব্যাংকের উদাহরণ তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, কয়েকজন ব্যাংকমালিক সরকারের কাছে হাজার হাজার কোটি টাকার সহায়তা চেয়েছেন। তাঁদের দাবি ছিল, বিপুল পরিমাণ মূলধন না পেলে ব্যাংক চালানো সম্ভব হবে না। এ সময় তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, একটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৯৬ শতাংশ থেকে ৫৬ শতাংশে নামানো হয়েছে বলে মালিকপক্ষ গর্বের সঙ্গে উপস্থাপন করেছে, যা দেশের ব্যাংক খাতের ভয়াবহ বাস্তবতাই তুলে ধরে।
তিনি বলেন, দেশের ভেতরে ও বিদেশে ব্যাংকমালিকদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে সরকার অবগত রয়েছে। অথচ একই সময়ে ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের আস্থা সংকটে ফেলছে এবং মূলধন ঘাটতিতে ভুগছে। এই বৈপরীত্য নিয়ে জনমনে ক্ষোভ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
ব্যাংক খাতের দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের পেছনে দুর্বল আর্থিক প্রতিবেদন এবং নিরীক্ষা ব্যবস্থাকে বড় কারণ হিসেবে দেখেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর মতে, প্রকৃত আর্থিক অবস্থা গোপন রাখার সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক খাতকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল নিরীক্ষা ও প্রশ্নবিদ্ধ হিসাব ব্যবস্থার সুযোগে ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ বেরিয়ে গেছে।
এ সময় পুঁজিবাজার ও ব্যাংক খাতে বড় ধরনের সংস্কারের কথাও জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, আগামী দুই মাসের মধ্যে পুঁজিবাজার ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা হবে। সেখানে রাজনৈতিক বিবেচনার বদলে পেশাদারদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা ও বিদেশি বিনিয়োগ ব্যাংকগুলোকে সম্পৃক্ত করে দেশের ব্যাংকিং খাতকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
তথ্যপ্রযুক্তি খাত নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, গত কয়েক বছরে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। তবে নতুন করে প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসূচি হাতে নেওয়া হচ্ছে, যাতে এই খাতকে অর্থনীতির কার্যকর চালিকাশক্তিতে পরিণত করা যায়।
গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে টেকসই অর্থনীতি গড়া সম্ভব নয়। আগামী বাজেটে অর্থনীতির গণতান্ত্রিকীকরণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে কৌশলগত মজুত গঠনের পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা বা সরবরাহব্যবস্থায় ধাক্কা এলে যাতে দেশের বাজারে বড় সংকট তৈরি না হয়, সে জন্য সরকার চাল, ডাল, তেলসহ গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের মজুত সক্ষমতা বাড়াতে চায়।
বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, দেশে এখনো কার্যকর কৌশলগত রিজার্ভ না থাকায় বাজার সহজেই অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। মাত্র কয়েক দিনের সরবরাহ সংকটেই দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। ভবিষ্যতে টিসিবির মাধ্যমে বাজারে দ্রুত হস্তক্ষেপের সক্ষমতা গড়ে তোলার কথাও জানান তিনি।
সরবরাহব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তাঁর মতে, পণ্য আমদানি থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটাল নজরদারিতে আনা গেলে বাজার কারসাজি ও কৃত্রিম সংকট কমানো সম্ভব হবে।
কৃষিপণ্যের দাম বাড়ার পেছনে মধ্যস্বত্বভোগী ও উচ্চ পরিবহন ব্যয়কে দায়ী করে তিনি বলেন, উৎপাদক ও ভোক্তার দামের মধ্যে অস্বাভাবিক ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এই ব্যবধান কমাতে সরকার অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করবে।
একই অনুষ্ঠানে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, দীর্ঘদিন গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমে অবহেলার কারণে এখন দেশকে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে। গভীর সমুদ্রে নতুন করে গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
জ্বালানিমন্ত্রী আরও বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন পুরোপুরি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেশের জন্য চাপ তৈরি করেছে। অনেক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন না করেও চুক্তি অনুযায়ী অর্থ নিচ্ছে, যা সরকারের জন্য বড় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি জানান, বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া পরিশোধে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে জুনের মধ্যে নতুন সৌরবিদ্যুৎ নীতিমালা আনার কথাও জানান তিনি।

