বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানা আবার চালু করা এবং অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশাল পুনঃঅর্থায়ন ও সহায়তা তহবিল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দাবি, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ২৫ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।
আজ শনিবার (২৩ মে) রাজধানীর মতিঝিলস্থ বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।
তিনি জানান, গত তিন বছরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমেছে। আগে যেখানে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ, পরে তা নেমে আসে ৪ দশমিক ২ শতাংশে। বর্তমানে এটি ৩ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সময়ে গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, স্টিল, সিরামিক, তথ্যপ্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতে বড় ধাক্কা লাগে।
গভর্নর বলেন, ব্যাংক খাতে চাপ বেড়েছে, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে, অর্থপাচারের ঘটনা ঘটেছে এবং আমানতকারীদের আস্থা কমে গেছে। উচ্চ সুদের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারাও ব্যবসা সম্প্রসারণে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। এ অবস্থায় অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে এই বিশেষ সহায়তা কাঠামো নেওয়া হয়েছে।
কোন খাতে কত বরাদ্দ:
ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজের মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় দেওয়া হবে। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে বিতরণ করা হবে।
পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের মধ্যে রয়েছে বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতে ২০ হাজার কোটি টাকা। কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা। কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে ১০ হাজার কোটি টাকা। রপ্তানি বহুমুখীকরণে ৩ হাজার কোটি টাকা। এবং উত্তরবঙ্গকে কৃষি হাব হিসেবে গড়ে তুলতে ৩ হাজার কোটি টাকা।
এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব সহায়তা তহবিলে প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট পুনঃঅর্থায়নে ৫ হাজার কোটি টাকা। কুটির, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে ২ হাজার কোটি টাকা। বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানে ১ হাজার কোটি টাকা। গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ১ হাজার কোটি টাকা। হিমায়িত মাছ ও মাছ রপ্তানিতে ২ হাজার কোটি টাকা। পরিবেশবান্ধব বা সবুজ বিনিয়োগে ১ হাজার কোটি টাকা। বিদেশে কর্মসংস্থানে ১ হাজার কোটি টাকা। স্টার্টআপে ৫০০ কোটি টাকা এবং সৃজনশীল অর্থনীতি খাতে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
গভর্নর জানান, সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য বরাদ্দ ৫০০ কোটি টাকা করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল থেকে অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে, যা ঋণ নয়।
২৫ লাখের বেশি কর্মসংস্থান:
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এই তহবিল কার্যকর হলে ২৫ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে বন্ধ শিল্পকারখানা চালু, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে। বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য বরাদ্দ ১ হাজার কোটি টাকা থেকে প্রায় এক লাখ মানুষের চাকরির সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
বেকার যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ করা হবে। পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ঋণ দেওয়া হবে আনসার ও ভিডিপি ব্যাংকের মাধ্যমে। এতে সংগঠনের লাখো সদস্য উপকৃত হবেন বলে জানানো হয়।
সুদের হার:
গভর্নর জানান, পুনঃঅর্থায়ন স্কিমে বাংলাদেশ ব্যাংক ৪ শতাংশ সুদে অর্থ দেবে। ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত সুদ নিতে পারবে। ফলে বড় ঋণগ্রহীতারা সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে ক্ষুদ্র ঋণের ক্ষেত্রে পরিচালন ব্যয় বেশি হওয়ায় সুদের হার কিছুটা বেশি হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আশা, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু হবে, রপ্তানি ও রেমিট্যান্স বাড়বে, গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা হবে এবং সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি ফিরবে।

