বাংলাদেশে ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল বা ইভি আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান শুল্ক-কর কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বর্তমানে মোটরের সক্ষমতা বা কিলোওয়াটের ভিত্তিতে কর নির্ধারণ করা হলেও আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যভিত্তিক নতুন কর ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।
নতুন প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে ইভির কর আর মোটরের ক্ষমতা দেখে নির্ধারণ করা হবে না। বরং গাড়ির আমদানি মূল্য বা বাজারদামের ওপর ভিত্তি করে শুল্ক-কর আরোপ করা হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, গাড়ির মূল্য অনুযায়ী অন্তত তিনটি ধাপে কর নির্ধারণের চিন্তা চলছে। এতে কম দামের সাধারণ ইভিতে তুলনামূলক কম কর থাকলেও উচ্চমূল্যের বিলাসবহুল গাড়িতে করভার অনেক বেড়ে যেতে পারে। প্রাথমিকভাবে সর্বনিম্ন প্রায় ৯০ থেকে ১০০ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ ২০০ থেকে ২৫০ শতাংশ পর্যন্ত মোট কর নির্ধারণের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
বর্তমানে দেশে ইলেকট্রিক গাড়ির ওপর কর নির্ধারণ করা হয় মোটরের ক্ষমতা অনুযায়ী। ১০০ কিলোওয়াট পর্যন্ত মোটর ক্ষমতার গাড়িতে করভার প্রায় ৯০ শতাংশের কাছাকাছি। অন্যদিকে ২০০ কিলোওয়াট বা তার বেশি সক্ষমতার বিলাসবহুল ইভিতে করভার দাঁড়ায় প্রায় ১২৫ থেকে ১২৮ শতাংশ। কিন্তু এনবিআরের কর্মকর্তাদের মতে, একই মোটর ক্ষমতার আওতায় থাকা বিভিন্ন গাড়ির বাজারমূল্যের মধ্যে বিশাল পার্থক্য থাকলেও বিদ্যমান ব্যবস্থায় তারা প্রায় একই ধরনের কর সুবিধা পাচ্ছে। এতে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে এবং কর কাঠামোয় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে।
এনবিআরের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আধুনিক ইলেকট্রিক গাড়ির মূল্য শুধু মোটরের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না। ব্যাটারি প্রযুক্তি, সফটওয়্যার, স্বয়ংক্রিয় ফিচার, ব্র্যান্ড ভ্যালু এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার কারণে একই কিলোওয়াটের দুটি গাড়ির দামের পার্থক্য কয়েক গুণ হতে পারে। কিন্তু বর্তমান নিয়মে সেই পার্থক্যের প্রতিফলন কর ব্যবস্থায় দেখা যায় না।
কর্মকর্তারা বলছেন, মূল্যভিত্তিক নতুন কাঠামো চালু হলে আন্ডার-ইনভয়েসিং বা প্রকৃত মূল্য কম দেখিয়ে কর ফাঁকির সুযোগ অনেকটাই কমে আসবে। বর্তমানে অনেক আমদানিকারক গাড়ির ব্যাটারি, সফটওয়্যার বা অতিরিক্ত ফিচারের মূল্য আলাদাভাবে কম দেখিয়ে কার্যকর করভার কমানোর সুযোগ পাচ্ছেন। নতুন ব্যবস্থায় বিলাসবহুল গাড়ির প্রকৃত মূল্য বিবেচনায় আনা সহজ হবে।
উদাহরণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চীনের তৈরি একটি সাধারণ ১০০ কিলোওয়াট ইভি এবং ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রের প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডের একই সক্ষমতার গাড়ি বর্তমানে প্রায় একই কর কাঠামোর আওতায় পড়ে। অথচ বাস্তবে তাদের বাজারমূল্যের ব্যবধান কয়েক গুণ। ফলে উচ্চমূল্যের গাড়িও তুলনামূলক কম কর দিয়ে দেশে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে।
এনবিআরের কর্মকর্তাদের মতে, পরিবেশবান্ধব যানবাহনকে উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি বিলাসবহুল আমদানির ক্ষেত্রেও বাস্তবসম্মত করনীতি প্রয়োজন। নতুন কাঠামোতে কম দামের সাধারণ ইভি তুলনামূলক সুরক্ষা পাবে। অন্যদিকে উচ্চমূল্যের প্রিমিয়াম গাড়িতে বাড়তি কর আরোপ করা হবে। এতে একদিকে রাজস্ব আদায় বাড়বে, অন্যদিকে কর ব্যবস্থায় ভারসাম্যও আসবে।
বর্তমানে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি বড় আকার ধারণ করেছে। এ কারণে উচ্চমূল্যের আমদানিপণ্যে কর বাড়িয়ে দ্রুত রাজস্ব বাড়ানোর পথ খুঁজছে এনবিআর। একই সময়ে দেশে ইলেকট্রিক গাড়ির বাজারও ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিশেষ করে উচ্চবিত্ত ক্রেতাদের মধ্যে টেসলা, বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজসহ বিভিন্ন প্রিমিয়াম ইভির চাহিদা বাড়ছে। ফলে সরকার এই খাতকে সম্ভাবনাময় নতুন রাজস্ব উৎস হিসেবেও বিবেচনা করছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, নতুন কর কাঠামো কার্যকর হলে ছোট ও মাঝারি দামের ইভির বাজার বড় ধাক্কায় পড়বে না। বরং বিলাসবহুল গাড়ির ওপর করের চাপ বাড়বে। একই সঙ্গে ঘোষণামূল্য কম দেখানো বা আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের প্রবণতাও কমে আসতে পারে।
তবে এদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নতুন আমদানি নীতির খসড়ায় ১০ বছর পুরোনো ইলেকট্রিক গাড়ি আমদানির সুযোগ রাখার প্রস্তাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। খসড়ায় বলা হয়েছে, সাধারণ গাড়ির ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের বেশি পুরোনো যানবাহন আমদানির অনুমতি না থাকলেও ইলেকট্রিক গাড়ির ক্ষেত্রে ১০ বছর পর্যন্ত পুরোনো যান আমদানির সুযোগ রাখা হতে পারে।
এই প্রস্তাব নিয়ে বিশ্লেষক ও খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, এটি কার্যকর হলে বাংলাদেশ পুরোনো ব্যাটারি ও নিম্নমানের প্রযুক্তির ‘ডাম্পিং গ্রাউন্ডে’ পরিণত হতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় ইভি শিল্প ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য এটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
এনবিআর যখন বিলাসবহুল ইভিতে কর ফাঁকি ঠেকাতে কঠোর অবস্থান নিতে যাচ্ছে, তখন পুরোনো ইভি আমদানির সুযোগ বাজারে উল্টো প্রভাব ফেলতে পারে বলেও মত দিয়েছেন অনেকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যবহৃত ইলেকট্রিক গাড়ির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ব্যাটারির কার্যক্ষমতা। দীর্ঘদিন ব্যবহৃত ব্যাটারি দ্রুত নষ্ট হলে তা পরিবেশগত ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুল হক জানিয়েছেন, ১০ বছরের পুরোনো ইভি আমদানির বিষয়টি এখনও খসড়া পর্যায়ে রয়েছে এবং এ নিয়ে তাদেরও আপত্তি আছে। তিনি বলেন, সংগঠনটি মূলত পাঁচ বছরের রিকন্ডিশন গাড়ি আমদানির সুযোগ চেয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের গাড়ির বাজার দীর্ঘদিন ধরে ধাপে ধাপে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। ফসিল ফুয়েলচালিত গাড়ি থেকে হাইব্রিড প্রযুক্তিতে রূপান্তরে দেশ কিছুটা প্রস্তুত হয়েছে। বর্তমানে দেশে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ গাড়ি হাইব্রিড প্রযুক্তিনির্ভর। কিন্তু পুরোপুরি ইলেকট্রিক গাড়ির জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, চার্জিং সুবিধা, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা এখনও গড়ে ওঠেনি।
তার মতে, হঠাৎ পুরোপুরি ইভিনির্ভর বাজারে যাওয়ার পরিবর্তে ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়া উচিত। প্রথমে হাইব্রিড ও প্লাগ-ইন হাইব্রিড প্রযুক্তিকে আরও বিস্তৃত করে পরে পূর্ণাঙ্গ ইভি ব্যবস্থার দিকে যাওয়া বাস্তবসম্মত হবে। উন্নত দেশগুলোও একই পথ অনুসরণ করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আমদানি নীতির খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, নির্ধারিত বয়সসীমা ও শর্ত ভঙ্গ করে কোনো যানবাহন আমদানি করা হলে তা সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা হবে। পরে সেই যানবাহন স্ক্র্যাপ হিসেবে নিলামে বিক্রি করা হবে এবং এ ক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমতি নিতে হবে।
সব মিলিয়ে, সরকার একদিকে পরিবেশবান্ধব যানবাহনকে উৎসাহ দিতে চাইলেও অন্যদিকে রাজস্ব সুরক্ষা এবং বিলাসবহুল আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ আনতে নতুন কর কাঠামোর পথে হাঁটছে। তবে করনীতির এই পরিবর্তন এবং পুরোনো ইভি আমদানির প্রস্তাব— দুই সিদ্ধান্তের মধ্যে সামঞ্জস্য কীভাবে আনা হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

