দেশে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় এসব ঘটনাকে ‘জাতীয় জরুরি ইস্যু’ হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়েছে নারী ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা ১৫৬টি সংগঠন ও প্ল্যাটফর্ম।
একই সঙ্গে ধর্ষণ ও নারী–শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রে ‘শূন্য সহনশীলতা নীতি’ গ্রহণ করে তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের আহ্বানও জানানো হয়েছে। আজ শনিবার দুপুরে রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি তুলে ধরা হয়। দেশের ৬৪ জেলার নারী ও শিশু অধিকারভিত্তিক ১৫৬টি সংগঠন ও প্ল্যাটফর্ম যৌথভাবে এ আয়োজন করে, যার মধ্যে রয়েছে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন এবং আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোটসহ বিভিন্ন সংগঠন।
সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে শিশু ধর্ষণ ও হত্যাসহ একাধিক ঘটনায় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে। একই সঙ্গে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবমুক্ত রাখার ওপরও জোর দেওয়া হয়।
লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোটের প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হক। তিনি বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতে হবে। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের কার্যকারিতা বাড়িয়ে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মামলা ১৮০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা বাস্তবে নিশ্চিত করতে হবে। বিচার চলাকালে নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশু এবং তাদের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সব প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন, স্বাধীন অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থা চালু এবং নিয়মিত মনিটরিংয়ের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে ২০০৯ সালের হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী যৌন হয়রানি প্রতিরোধে আইন প্রণয়ন ও তার কার্যকর বাস্তবায়নের আহ্বান জানান জিনাত আরা হক।
এ ছাড়া সাইবার সহিংসতা, অনলাইন ব্ল্যাকমেইল ও ডিজিটাল যৌন হয়রানি রোধে বিশেষ সাইবার মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি থানা পর্যায়ে নারী ও শিশু–বান্ধব ডেস্ক আরও কার্যকর করা এবং অভিযোগ গ্রহণে হয়রানি বন্ধের আহ্বানও জানানো হয়।
সংগঠনগুলোর মতে, নারী ও শিশু নির্যাতন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি সামাজিক নিরাপত্তা, বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির গভীর সংকটের প্রতিফলন। এ কারণে স্থানীয় সরকার, শিক্ষক, নারী সংগঠন, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে যুক্ত করে জাতীয় পর্যায়ে সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়।
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, নির্যাতনের তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও প্রকাশের জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় তথ্যভান্ডার গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত ও দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের ট্র্যাকিং ডেটাবেজ তৈরির দাবি জানানো হয়।
সংগঠনগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে ১৫টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনায় ১৭৮ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৫০টি ছিল দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৪ জনকে। একই সময়ে শিশুদের বিরুদ্ধে ১৯৯টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়, যার মধ্যে ১২৬টিতে মামলা হয়েছে। শিশু ধর্ষণের ঘটনা ছিল ১১৮টি এবং ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ৪৬টি।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে বক্তব্য দেন নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে কাজ করা ১০১টি সহযোগী সংগঠন এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম। তিনি বলেন, দেশে শিশু ধর্ষণ ও সহিংসতা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বিচারহীনতা ও সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে এসব অপরাধ বাড়ছে। তাঁর মতে, অপরাধীরা শাস্তি এড়াতে পারবে বলেই এ ধরনের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।
তিনি শিশু নির্যাতনের ঘটনায় সরকারের প্রতি ‘শূন্য সহনশীলতা নীতি’ কার্যকরের আহ্বান জানান। পাশাপাশি কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে এমন দৃষ্টান্ত স্থাপনের দাবি জানান, যাতে কোনো ধর্ষক পার পেয়ে যেতে না পারে।
শাহীন আনাম সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, শুধু গ্রেপ্তারের খবর নয়, মামলার অগ্রগতি ও বিচারপ্রক্রিয়ার পরিণতিও নিয়মিতভাবে সামনে আনা প্রয়োজন। তিনি সামাজিক দায়বদ্ধতা বাড়ানো এবং পাড়া–মহল্লাভিত্তিক শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদারের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন সেন্টার ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন স্টাডিজের অধ্যাপক ইশরাত শামীম, প্রগ্রেসরের নির্বাহী পরিচালক ফওজিয়া খন্দকার এবং বিএনপিএসের পরিচালক শাহনাজ সুমি। এছাড়া কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় একটি মাদ্রাসায় নির্যাতনের শিকার এক শিশুর বাবা উপস্থিত হয়ে দ্রুত বিচার নিশ্চিতের দাবি জানান।

