২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট শিগগিরই ঘোষণা হতে যাচ্ছে। প্রাথমিক হিসেবে এ বাজেটের আকার দাঁড়াতে পারে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। যা চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বা ১৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেশি। ফলে এবারও একটি সম্প্রসারণমূলক বাজেটের ইঙ্গিত মিলছে।
তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়ে ধীরগতি এবং বাজেট বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে অর্থনীতিবিদদের একাংশ একটি তুলনামূলক কৃচ্ছ্রসাধনমূলক বাজেটের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন। তাদের মতে, বাজেটের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সুশাসন প্রতিষ্ঠা, সামাজিক বৈষম্য কমানো, নিম্ন আয়ের মানুষের চাপ লাঘব এবং অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ।
এছাড়া কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে উৎপাদনশীল খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এখন সময়ের দাবি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎপাদন বাড়ানোই আগামী বাজেটের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত বলেও মত বিশ্লেষকদের। একই সঙ্গে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে ব্যয়ের গুণগত মান বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও তারা তুলে ধরছেন।
দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার পূর্বাভাস এর চেয়ে অনেক কম।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী এ হার হতে পারে ৩ দশমিক ১ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের পূর্বাভাস ৪ শতাংশ। রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যনীতি, বিনিয়োগ হ্রাস, জ্বালানি সংকট, বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং উৎপাদন স্থবিরতা—সব মিলিয়ে প্রবৃদ্ধির চাপ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
এছাড়া অর্থবছরের শেষ দিকে হাওরের ভয়াবহ বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে বোরো ধানের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সময়ে কর্মসংস্থানও কমেছে। ফলে আয় কমার পাশাপাশি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে স্থিতিশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে। তা সম্ভব হলে প্রবৃদ্ধি ৬ থেকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত ওঠার সম্ভাবনাও রয়েছে।
অন্যদিকে প্রবৃদ্ধি মাঝারি হলেও সাধারণ মানুষের স্বস্তি অনেকাংশে নির্ভর করছে মূল্যস্ফীতির ওপর। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেশের অর্থনীতিতে বড় চাপ তৈরি করছে, বিশেষ করে নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ওপর। গত কয়েক বছর ধরেই মূল্যস্ফীতি ৯ থেকে ১০ শতাংশের ঘরে ঘুরপাক খাচ্ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ০৩ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এটি আরও বেড়ে ১০ দশমিক ০৩ শতাংশে পৌঁছায়। চলতি সময়ে তা কিছুটা কমে প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি নেমেছে।
বর্তমান বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে গত ১০ মাসের গড় অর্জন প্রায় ৯ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পূর্বাভাস ৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো খাদ্য মূল্যস্ফীতি। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে এটি ছিল ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ, নভেম্বরে ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ। পরে তা কমে ২০২৬ সালের এপ্রিলে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশে। তবুও এখনো বাংলাদেশ এশিয়ার মধ্যে উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতির তালিকায় রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তানের খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের তুলনায় অনেক নিচে। ভারত, মিয়ানমার ও নেপালে এই হার প্রায় অর্ধেক। বিশ্বব্যাংকের খাদ্যনিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতি সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বাংলাদেশ চার বছর ধরে ঝুঁকির লাল তালিকায় রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি এবং কঠোর রাজস্বনীতির সমন্বয় করে উৎপাদন বাড়াতে পারলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। একই সঙ্গে রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের মধ্যে শৃঙ্খলা আনাও জরুরি। একটি নিম্ন আয়ের দেশের জন্য সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৪ শতাংশের নিচে এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ২ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনা প্রয়োজন বলে মত বিশ্লেষকদের।
খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমানোর অন্যতম প্রধান শর্ত হলো কৃষি খাতে উৎপাদন বৃদ্ধি। তবে বাস্তব চিত্র বলছে, উৎপাদন বাড়লেও তার গতি খুবই ধীর। ফলে কৃষি খাতের প্রকৃত প্রবৃদ্ধি এখন ন্যূনতম পর্যায়ে নেমে এসেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৯-১০ অর্থবছরে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৪২ শতাংশে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ হার ছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ, যা আগের তুলনায় অনেক কম। অর্থাৎ দীর্ঘ সময় ধরে কৃষি প্রবৃদ্ধি ক্রমাগত নিম্নমুখী। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করতে হলে ২০৩০ সালের মধ্যে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি খাতে অন্তত ৪ থেকে ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে সে লক্ষ্যের সঙ্গে বড় ব্যবধান রয়ে গেছে।
কৃষি খাতে বাজেট ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির হারও প্রত্যাশার তুলনায় কম। ২০১১-১২ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট বাজেট বেড়েছে প্রায় ৪ দশমিক ৮৩ গুণ। একই সময়ে কৃষি বাজেট বেড়েছে ৩ দশমিক ৬৯ গুণ। ফলে মোট বাজেটে কৃষির অংশীদারিত্ব কমে এসেছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে মোট বাজেটে কৃষি খাতের হিস্যা ছিল ১০ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশে। একইভাবে কৃষি ভর্তুকির অংশও ৬ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ২ দশমিক ১৮ শতাংশে।
চলতি অর্থবছরে কৃষি-সম্পর্কিত পাঁচটি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ৪৬ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে শস্য খাতে বরাদ্দ ছিল ২৭ হাজার ২২৪ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের মাত্র ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ। মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, বন, পরিবেশ, ভূমি ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়গুলো পেয়েছে মোট বরাদ্দের ২ দশমিক ৩৭ শতাংশ, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এছাড়া ফসল কৃষি খাতে বরাদ্দ আগের বছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ১৮ দশমিক ২১ শতাংশ কমানো হয়েছিল। কৃষি ভর্তুকির ক্ষেত্রেও সংকোচন দেখা গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভর্তুকি ছিল ১৭ হাজার ২৬১ কোটি টাকা, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কমে দাঁড়ায় ১৭ হাজার ২৪১ কোটি টাকায়।
আগামী বাজেটে কৃষি খাতে মোট বাজেটের অন্তত ১০ শতাংশ বরাদ্দ থাকা উচিত। একইভাবে কৃষি ভর্তুকিও মোট কৃষি উৎপাদন মূল্যের ১০ শতাংশের সমান হওয়া প্রয়োজন। সে হিসাবে কৃষি খাতে বরাদ্দ দাঁড়ানো উচিত প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকা এবং ভর্তুকি কমপক্ষে ৪০ হাজার কোটি টাকা।
কৃষি গবেষণায় ব্যয়ের চিত্রও উদ্বেগজনক। বর্তমানে কৃষি জিডিপির মাত্র ০ দশমিক ৪ শতাংশ গবেষণায় ব্যয় করা হচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। আন্তর্জাতিকভাবে চীন, ভিয়েতনাম, জাপানসহ অনেক দেশ কৃষি গবেষণায় ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় করে।
কৃষি বিজ্ঞানীদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা কম হওয়ায় অনেকেই বিদেশে চলে যাচ্ছেন বা গবেষণা ছেড়ে অন্য পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। ফলে মেধাবী গবেষক সংকটও তৈরি হচ্ছে। এছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠানে পেনশন সুবিধা না থাকা, পদোন্নতির জটিলতা এবং প্রণোদনার ঘাটতিও কৃষি গবেষণাকে দুর্বল করছে। এ পরিস্থিতিতে গবেষণা কাঠামোতে বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে বলে মত বিশ্লেষকদের।
নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও কৃষি খাতের নির্দিষ্ট প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় না বলেও সমালোচনা রয়েছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় কৃষি খাতে ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছিল, কিন্তু অর্জন হয়েছে মাত্র ৩ শতাংশ। কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি অন্তত ৪ শতাংশে উন্নীত না করা গেলে সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের কৃষিতে এখন একটি কাঠামোগত পরিবর্তন স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শস্য খাতের ওপর নির্ভরতা কমে প্রাণিসম্পদ, মৎস্য ও বনজ খাতের গুরুত্ব বাড়ছে। তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে নীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি সমন্বিত হয়নি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে কৃষি জিডিপিতে শস্য খাতের অংশ ছিল ৭৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ। সে সময় প্রাণী, মৎস্য ও বনজসম্পদের অংশ ছিল যথাক্রমে ৭ দশমিক ৬৬, ১০ দশমিক ৪৮ এবং ৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই চিত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে। শস্য খাতের অংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৪৬ দশমিক ২২ শতাংশে। বিপরীতে প্রাণিসম্পদ বেড়ে ১৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ, মৎস্য খাত ২১ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং বনজসম্পদ ১৫ দশমিক ৭৭ শতাংশে পৌঁছেছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে মূল কারণ হিসেবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং মানুষের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনকে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ এখন তুলনামূলকভাবে বেশি পুষ্টিকর খাদ্য যেমন দুধ, ডিম, মাংস ও মাছের দিকে ঝুঁকছে। ফলে এসব খাতের উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে। আগামী বাজেটেও এই বাস্তবতার প্রতিফলন থাকা উচিত। পাশাপাশি উপখাতভিত্তিক বরাদ্দ ও ভর্তুকি নীতিতে ন্যায্যতা নিশ্চিত করা জরুরি।
তবে বাস্তবতায় প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতে উৎপাদন বাড়লেও দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে উৎপাদন ব্যয়ের উচ্চতা উল্লেখ করা হচ্ছে, বিশেষ করে পশুখাদ্যের দাম অত্যধিক বেড়ে যাওয়া। অন্যদিকে মৎস্য খাতে সাম্প্রতিক সময়ে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত হারে না বাড়া এবং প্রতি বছর প্রায় ১ শতাংশ প্রাকৃতিক জলাশয় দখল বা দূষণে হারিয়ে যাওয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
এসব জলাশয় সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার না করলে ভবিষ্যতে মৎস্য উৎপাদন আরও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। পাশাপাশি সমুদ্র সম্পদ থেকে মাছ আহরণের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।
কৃষি খাতে আরেকটি বড় সংকট হলো ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি। কৃষকদের অভিযোগ, বাজার নিয়ন্ত্রণের বড় অংশই অসাধু ব্যবসায়ীদের হাতে। ফলে একদিকে কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, অন্যদিকে ভোক্তারা উচ্চমূল্যে পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকারি হস্তক্ষেপ বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা। বিশেষ করে বিপণন খরচ ও মধ্যস্বত্বভোগীদের মুনাফা নিয়ন্ত্রণকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ধান ও চাল সংগ্রহের ক্ষেত্রেও মূল্য নির্ধারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এবারের বোরো মৌসুমে উপকরণ সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং হাওরের অকাল বন্যায় প্রায় ২৫ শতাংশ ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলেও সরকারি সংগ্রহমূল্য গত বছরের সমানই রাখা হয়েছে। উৎপাদন খরচের ওপর অন্তত ২০ শতাংশ মুনাফা যুক্ত করে সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করা উচিত।
অন্যদিকে আলু ও পেঁয়াজের মতো ফসলের উৎপাদন বাড়লেও বাজারদর দ্রুত কমে গেছে। একই চিত্র টমেটো ও মুলার ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে, যেখানে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারি ক্রয় কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, অন্তত ১০ শতাংশ উৎপাদিত ফসল সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কিনে গুদাম বা হিমাগারে সংরক্ষণ করা উচিত। পরে বাজারে দাম বেড়ে গেলে এসব মজুত পণ্য খোলা বাজারে বিক্রি করে মূল্য নিয়ন্ত্রণে আনা যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতির চাপ এখন সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে প্রান্তিক কৃষক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনে। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় তাদের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় ভর্তুকি ও সরকারি সহায়তা বাড়ানোর পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো সম্প্রসারণের ওপর জোর দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, গ্রাম ও শহর—উভয় ক্ষেত্রেই কর্মসংস্থানমুখী শিল্পায়ন এবং কৃষি বিনিয়োগে বাজেটে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ থাকা জরুরি। পাশাপাশি মৌসুমি কর্মহীনতার সময় একটি কর্মসংস্থান গ্যারান্টি স্কিম চালুর প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হচ্ছে।
সরকার ইতোমধ্যে কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, দেশব্যাপী এই সুবিধা পৌঁছাতে প্রায় পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে। ফলে এক অঞ্চলের মানুষ সুবিধা পেলেও অন্য অঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠী পিছিয়ে থাকবে, যা বৈষম্য তৈরি করতে পারে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি বিকল্প প্রস্তাবও এসেছে। বঞ্চিত এলাকার দরিদ্র মানুষের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রকেই কৃষক কার্ড বা ফ্যামিলি কার্ড হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হচ্ছে, যাতে সহায়তা দ্রুত ও সমভাবে বিতরণ করা যায়।
কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পেও এখনো বড় অগ্রগতি হয়নি। অথচ এই খাতে বিনিয়োগের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ একসঙ্গে কাজ করলে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজন বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। মৌসুমি ফল, শাকসবজি ও পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ধান ও চাল সংরক্ষণের জন্য অন্তত ৬০ লাখ টন ধারণক্ষমতার গুদাম নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে দেশে বিদ্যমান গুদামগুলোর মোট ধারণক্ষমতা মাত্র ২২ লাখ টন।
কৃষি রফতানি খাতেও সুযোগ থাকলেও যথাযথ উৎসাহ কমে গেছে। একসময় কৃষিপণ্যের রফতানিতে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ সহায়তা দেওয়া হতো। বর্তমানে তা ১০ শতাংশের বেশি নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সহায়তা পুনর্বিবেচনা করে ক্ষেত্রবিশেষে বাড়ানো যেতে পারে।
অন্যদিকে কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণের ঘাটতি এখনো বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বেশি এবং দক্ষতা তুলনামূলক কম। চার বছর আগে যান্ত্রিকীকরণ উৎসাহিত করতে ভর্তুকি মূল্যে কৃষিযন্ত্র সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরে তা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে নতুন কাঠামোয় এই উদ্যোগ পুনরায় চালুর দাবি উঠেছে।
বাংলাদেশের কৃষি খাতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। ঘন ঘন বন্যা, অতিবৃষ্টি ও অন্যান্য দুর্যোগ উৎপাদন ব্যাহত করছে এবং কৃষকদের ক্ষতির মুখে ফেলছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় অভিযোজন ও প্রশমন কর্মসূচির জন্য আলাদা বাজেট বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে দুর্যোগ মোকাবিলায় একটি আলাদা তহবিল গঠন করা হলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে।
সব মিলিয়ে আসন্ন বাজেটকে কৃষকবান্ধব ও খাদ্য নিরাপত্তা কেন্দ্রিক করার প্রত্যাশা বাড়ছে। নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো—কৃষক সুরক্ষা, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বাজার স্থিতিশীলতাকে একসঙ্গে সমন্বয় করা।
ড. জাহাঙ্গীর আলম: একুশে পদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ। সাবেক উপাচার্য, ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ (ইউজিভি); সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)

